শান্তনু দেখলেন–গঙ্গার জল অল্প। কী ব্যাপার, এমন তো হবার কথা নয়। নদীশ্রেষ্ঠা গঙ্গার জলপ্রবাহ শীর্ণ হল কী করে, এমন তো আগে ছিল না–স্যন্দতে কিং ত্বিয়ং নাদ্য সরিচ্ছ্রেষ্ঠা যথা পুরা? কারণ অনুসন্ধান করার জন্য শান্তনু গঙ্গার তীর ধরে এগোতে লাগলেন। খানিক দূর গিয়েই তিনি দেখলেন–অপূর্বদর্শন এক কৈশোরগন্ধী বালক। অতি দীর্ঘ তার শরীর। মহাবলবান, মহাতেজস্বী। শান্তনু দেখলেন–বালক একটার পর একটা বাণ ছুঁড়ে গঙ্গার স্রোত যেন আটকে রেখে দিয়েছে–কৃৎস্রাং গঙ্গাং সমাবৃত্য শরৈস্তীরৈবস্থিত। গঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে প্রবাহিনী গঙ্গার এই রুদ্ধগতি শরাচ্ছন্ন অবস্থা দেখে মহারাজ শান্তনু একেবারে অবাক হয়ে গেলেন। বালককে তিনি চিনতে পারলেন না, কিন্তু বালকের অলৌকিক অস্ত্রবীর্য লক্ষ্য করে তিনি অভিভূত হলেন। আশ্চর্য ঘটনা হল, বালকটি কিন্তু মহারাজ শান্তনুকে দেখে বেশ খুশি হল এবং তাকে বেশ কাছের লোক বলেই মনে করল।
বালক বেশিক্ষণ দাঁড়াল না। শান্তনুকে দেখে তার ভাল লেগেছে এবং তাকে দেখে কী যেন ভাবল আচম্বিতে এবং মুহূর্তের মধ্যে সেখান থেকে উধাও হয়ে গেল। শান্তনুর বোধহয় মনে পড়ল–সেই শিশু পুত্রটির কথা। যাকে তিনি কোনও কালে মায়ের সঙ্গে চলে যেতে দেখেছেন। এই কিশোরমুখ বলবান বালকটিকে দেখে তার বুঝি সেই শিশু পুত্রটির কথা মনে পড়ল। শান্তনু গঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে তার পুরাতনী প্রণয়িনীকে একবার ডাকলেন–গঙ্গা! গঙ্গা! আমার সেই ছেলেটিকে একবার দেখাবে?
শান্তনুর ডাকার দরকার ছিল না। শান্তনু সবিস্ময়ে দেখলেন–শ্বেতশুভ্র বসন পরা সালংকারা এক রমণী ডান হাতে সেই বালকটিকে ধরে শান্তনুর সামনে উপস্থিত হয়েছেন। শান্তনু একটু আগেই এই বালকটিকে বাণ ছুঁড়ে নদীর স্রোতধারা রুদ্ধ করতে দেখেছেন। আমাদের ধারণা–শান্তনুকে দেখামাত্রই বালকটি তার মাকে ডাকতে গেছে। মায়ের কাছে রাজার বর্ণনা সে বহুবার শুনেছে হয়তো। ফলে রাজাকে পিতা বলে চিনতে বালকের একটুও অসুবিধে হয়নি। বস্তুত শান্তনুকে পিতা বলে চিনতে পেরেই মুগ্ধ-নয়নে তার দিকে তাকিয়ে ছিল বালক। আর তারপরেই মোহাবিষ্টের মতো ছুটে গিয়েছিল মায়ের কাছে–সংমোহ্য তু ততঃ ক্ষিপ্রং তত্রৈবান্তরধীয়ত। যার জন্য শান্তনু ‘গঙ্গা’ বলে ডাকার পর একটুও তাকে অপেক্ষা করতে হয়নি। গঙ্গা সপুত্ৰক এসে দাঁড়িয়েছেন রাজার কাছে। শান্তনু এতদিন পরে গঙ্গাকে দেখে ঠিকমত চিনতেও পারেননি ভাল করে–দৃষ্টপূর্বামপি স তাং নাভ্যজানত শান্তনুঃ। এই কথা থেকেই বুঝি গঙ্গা কোন অলৌকিকী দেবী নন। তার চেহারার পরিবর্তন হয়েছে বলেই শান্তনু তাকে চিনতে পারেননি। গঙ্গা বললেন-মহারাজ! এই তোমার সেই পুত্র, আমার অষ্টম গর্ভে যার জন্ম হয়েছিল।
শান্তনু অপলক-নয়নে চেয়ে রইলেন দীর্ঘদেহী পুত্রের দিকে। গঙ্গা বললেন–তোমার এই পুত্র এখন সমস্ত অস্ত্রবীরদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠেছে। আমি একে মানুষ করেছি, বড় করেছি। এখন তুমি একে নিজের ঘরে নিয়ে যাও-গৃহাশেমং মহারাজ ময়া সংবর্ধিত সুত। এখানে। এই ‘বড় করেছি–সংবর্ধিতং’ শব্দটির থেকেই গঙ্গার মুখে পূর্বে বলা বিবৃদ্ধঃ পুনরেষ্যতি’ বড় হয়ে আবার তোমার কাছে ফিরে আসবে’–এই কথাগুলি যথার্থ হয়ে যায়। পুরাকালে আশ্রমবাসিনী শকুন্তলা যেমন ভরতকে দুষ্যন্তের কাছে নিয়ে এসে বলেছিলেন–তোমার সন্তান আমি মানুষ করেছি, এখন তুমি একে গ্রহণ করো। এখানে গঙ্গার মুখেও সেই একই কথা। উচ্চারিত হল। গঙ্গা এবার মায়ের ঘরে মানুষ হওয়া পুত্রের শিক্ষা-দীক্ষার খবর জানাচ্ছেন স্বামীকে।
গঙ্গা বললেন–একটু বড় হতেই আমি তোমার পুত্রকে মহর্ষি বশিষ্ঠের কাছে শিক্ষা নিতে পাঠিয়েছি। সেখানে বেদ-বেদাঙ্গ সবই অধ্যয়ন করেছে সে। আর অস্ত্রশিক্ষার কথা যদি বল, তবে বলতে হবে যুদ্ধে তোমার এই পুত্র এখন দেবরাজ ইন্দ্রের সমকক্ষ–দেবরাজসমো যুধি। গঙ্গা অবশ্য জানেন–ক্ষত্রিয়ের ছেলেকে শুধু অস্ত্রবিদ্যা শিখলেই চলে না, তাকে রাজনীতি, অর্থনীতি সব শিখতে হয়। আর রাজনীতি অর্থনীতি মানেই সেকালের দিনে অসুরগুরু শুক্রাচার্যের রচিত পুস্তক অথবা দেবগুরু বৃহস্পতি রচিত শাস্ত্র। যারা রাজনীতির পাঠ নিতেন তারা নিজেদের পছন্দমত এক পক্ষকে মেনে নিতেন, অর্থাৎ কেউ শুক্ৰনীতি অনুসরণ করতেন, কেউ বা বৃহস্পতিনীতি।
গঙ্গা বললেন-তোমার এই পুত্র দেবতা এবং অসুর–সবারই বড় প্রিয়পাত্র। তুমি জেনো-স্বয়ং শুক্রাচার্য রাজনীতির যত বিষয় জানেন, তোমার এই পুত্রও তা জানে–উশনা বেদ যচ্ছাস্ত্রময়ং তদ্বেদ সর্বশঃ। আবার দেবগুরু বৃহস্পতি রাজনীতি এবং অর্থনীতির সম্পর্কে যত বিধান দিয়েছেন, তা সবই এই বালকের অধিগত-কৃৎমস্মিন্ প্রতিষ্ঠিত। সব কথার শেষে গঙ্গা এবার তার পুত্রের অস্ত্রবিশক্ষার বিস্তারিত বিবরণ দিলেন। সেকালের দিনে অস্ত্রশিক্ষার সর্বশ্রেষ্ট গুরু ছিলেন পরশুরাম জামদগ্ন্য। রামায়ণে পরশুরামের ক্ষমতার কথা আমরা শুনেছি এবং পরশুরামের দ্বারা পৃথিবী নিঃক্ষত্রিয় করার ঘটনাও আমাদের কানে এসেছে। ইনি সেই মূল পরশুরাম নাও হতে পারেন, কিন্তু অস্ত্রশিক্ষা দানের ক্ষেত্রে পরশুরামের একটি ‘ইনস্টিটিউশন’ নিশ্চয়ই ছিল। সেখানে যিনি অস্ত্রগুরু হতেন তিনিই হয়ত পরশুরামের নামে খ্যাতি করতেন। গঙ্গা সগর্বে জানালেন–মহাবীর পরশুরাম অস্ত্রবিদ্যার যে গুঢ়তত্ত্ব জ্ঞাত আছেন, তোমার এই ছেলেও সে সব বিদ্যা অধিকার করেছে–যদস্ত্রং বেদ রামশ্চ তদপ্যস্মিন প্রতিষ্ঠিত।
