আধুনিক গবেষকরা অবশ্য গঙ্গাকে সুরনদী গঙ্গা বলে মানেন না। তাঁরা বলেন–শান্তনুর সঙ্গে গঙ্গার প্রণয়-সম্পর্কের মতো ঘটনাগুলি মূলত সাময়িক প্রেমের উদাহরণ–Other in stances of Gandharva marriage, such as Ganga and Santanu… also present the free love union of some nymphs and dolphins, very probably women from some non-Aryan tribes.
মনুষ্যরূপিণী দেবনদীকে এক অনার্যজাতীয়া রমণী বলব কিনা সে সম্বন্ধে তর্কযুক্তির অবকাশ আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু এও তো ঘটনা যে, শান্তনু তাকে রাজধানীতে নিয়ে যেতে পারেননি। কোন ধরনের রমণীর পক্ষেই বা এক রাজপুরুষকে রাজধানীর বাইরে শুধু কামব্যবহারেই সন্তুষ্ট রাখা সম্ভব। এমনই সেই সন্তুষ্টির প্রক্রিয়া, যাতে শান্তনুর পক্ষে অন্যত্র মন দেওয়া সম্ভব ছিল না–রাজানাং রময়ামাস যথা রেমে তয়ৈব সঃ। সবচেয়ে বড় কথা হল–শান্তনুর আগ্রহে যে পুত্রটিকে গঙ্গা বাঁচিয়ে রাখলেন, সেই পুত্রটিকে রাজা রাজধানীতে নিয়ে যেতে পারলেন না সঙ্গে সঙ্গে। গঙ্গা সেই পুত্রকে নিজের সঙ্গে নিয়ে গেলেন–রাজার গৌরহানি না করে–আদায় চ কুমারং তং জগামাথ যথেতি।
মহাভারতের অনুবাদক পণ্ডিতেরা গঙ্গার মাহাত্ম রক্ষা করে এখানে অনুবাদ করেছেন, ‘বালকটিকে লইয়া সেইখানেই অন্তর্হিত হইলেন’। কিন্তু সংস্কৃত ‘জগাম’ ক্রিয়ার অর্থ সোজাসুজি ‘চলে গেলেন’ বলাটাই যথার্থ। আরও একটা কথা–চলে যাবার আগে গঙ্গা বলেছিলেন-এই যে তোমার ছেলেটি, সে বড় হলে তোমার কাছে আবার ফিরে আসবে– বিবৃদ্ধঃ পুনরেষ্যতি–আর তুমি ডাকলে আমিও তোমার কাছে আসব–অহষ্ণ তে ভবিষ্যামি আহ্বানোপগতা নৃপ। এই পরিষ্কার লৌকিক প্রতিজ্ঞার মধ্যে বালকটিকে লইয়া অলৌকিক অন্তর্ধানের কথাও আসে না, পুনরায় আবির্ভাবের কথাও আসে না। যে ছেলের মা স্বয়ং হস্তিনাপুরের রাজধানীতে প্রবেশ করতে পারেননি, তার শিশুপুত্রকে নিয়ে রাজধানীতে প্রবেশ করলে শান্তনুর যে স্বস্তি বিঘ্নিত হবে, সে কথা এই বিচক্ষণা রমণী বুঝেছেন। আর ‘বিবৃদ্ধঃ পুনরেষ্যতি’ কথাটার মানে সিদ্ধান্তবাগীশ যে কী করে আপনার পুত্র এই বালক অত্যন্ত বৃদ্ধ হইয়া পুনরায় স্বর্গে যাইবেন–এইরকম করলেন তা আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে কুলোয় না। কেননা ‘পুনরায়’ শব্দটাই এখানে ব্যর্থ হয়ে যায়, যদি না বলি–তোমার এই পুত্র বড় হয়ে আবার তোমার কাছে ফিরে আসবে–পুনরেষাতি।
মনে রাখবেন–ভবিষ্যতে ভীমপত্নী হিড়িম্বা, অর্জুনপত্নী উলুপী–এঁরাও ওই একই কথা বলবেন–তুমি ডাকলেই আসব। গঙ্গাও তাই বলেছেন–তুমি ডাকলেই তোমার কাছে ফিরে আসব–আহ্বানোপগত নৃপ। হিড়িম্বা-উলুপীদের পুত্রেরাও রাজধানীতে আসেননি, তারা মায়ের কাছেই ছিলেন। গঙ্গাকে যদি হিড়িম্বা, উলুপী অথবা চিত্রাঙ্গদার থেকে বেশি মাহাত্ম্য না দিই, তাহলেই কিন্তু মহাকাব্যের কবির আশয় আরও বেশি যুক্তিগ্রাহ্য হয়। আমাদের কাছে অলৌকিক চমকৃতির চেয়েও বাস্তবের যুক্তিগ্রাহ্যতা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গঙ্গা আপন পুত্রকে নিয়ে নিজের জায়গায় চলে গেলেন আর মহারাজ শান্তনু গঙ্গা এবং নিজপুত্রের বিচ্ছেদ-যন্ত্রণা হৃদয়ে বহন করে হস্তিনাপুরের রাজধানীতে ফিরে এলেন–শান্তনুশ্চাপি শোকার্তো জগাম স্বপুরং ততঃ।
দেখা যাচ্ছে, মহাভারতের কবি এক প্রণয়িনী রমণীর সঙ্গে শান্তনুর মিলন ঘটিয়ে, তারপর শান্তনুকে রাজধানীতে ফিরিয়ে এনেছেন। কিন্তু শান্তনুর অসাধারণ রাজগুণের বর্ণনা আরম্ভ হয়েছে তারও পরে। ফলত মহাভারতের গবেষকরা বলবেন–বসুগণের কাহিনী পরবর্তী সংযোজন। শান্তনুর কাহিনীর আরম্ভ এইখান থেকেই। আমরা বলি–অভিশপ্ত বসুগণের কাহিনী না হয় উড়িয়েই দিলেন, কিন্তু ওই লাস্যময়ী নদীর মতো বিলাসিনী রমণী আর তার গর্ভজাত পুত্রটিকে তো আর উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। বরঞ্চ বলা ভাল এই ঘটনা ঘটার পরে শান্তনুর রাজগুণ বর্ণিত হওয়ায় আমাদের কেবলই মনে হয়–শান্তনু রাজা হবার আগেই গঙ্গার সঙ্গে তার প্রণয়মিলন সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। দেবব্রতর জন্মও হয়ে গিয়েছিল আগেই। রাজা হবার পরে হয়তো তিনি সগৌরবে তার প্রথমজাত গূঢ় পুত্রটিকে হস্তিনাপুরে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন।
শান্তনুর রাজগুণের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তাতে বোঝা যায় একজন আদর্শ রাজার যে যে গুণ থাকলে রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি ঘটে, সে সবই তার মধ্যে ছিল। ধর্মনীতি এবং অর্থনীতির সম্যক বোধের সঙ্গে বুদ্ধি এবং বিনীত আচরণ একত্র যুক্ত হওয়ায় সামন্ত রাজারা আপনিই তার বশ্যতা স্বীকার করে শান্তনুকেই তাদের নেতা হিসেবে মনোনীত করেছিলেন–তং মহীপা মহীপালং রাজরাজ্যে’ভ্যষেচয়। শান্তনু সেইভাবেই রাজ্য পরিচালনা করছিলেন, যাতে তার রাজ্যে অন্যায়-অবিচার কিছু না ঘটে। বর্ণধর্ম এবং আশ্রমধর্ম তৎকালীন সামাজিক নীতি অনুসারেই পালিত হচ্ছিল। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র–সকলেই আপন বৃত্তিতে প্রতিষ্ঠিত থাকার ফলে শান্তনুর অশান্তির কোনও কারণ ছিল না এবং তার রাজ্য চলছিল তৎকালীন সমাজমুখ্য ব্রাহ্মণদের নীতি এবং আইন মেনেই–ব্রহ্মধর্মোত্তরে রাজ্যে শান্তনুনিয়াত্মবান্।
রাজ্য যখন ভালই চলছে, তখন রাজার মনে কিছু চপলতা ঘটেই। পথের নেশা, দূরের নেশা তাকে পেয়ে বসে। আর আগেই বলেছি–মৃগয়ার ব্যাপারে শান্তনুর কিছু দুর্বলতা ছিলই। শান্তনু একা বেরিয়ে পড়লেন মৃগয়ায়। একটি মৃগকে বাণবিদ্ধ করার পর সেই মৃগকে অনুসরণ করতে করতে তিনি গঙ্গার তীরে এসে উপস্থিত হলেন। মহাভারতের কবি শান্তনুকে যতই মৃগয়ার ছলে গঙ্গার তীরভূমিতে নিয়ে আসুন, আমরা মনে মনে জানি–শান্তনু ফিরে এসেছিলেন সেই রমণীর খোঁজে, যাকে তিনি বেশ কয়েক বছর আগে বিদায় দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। যদি তার সঙ্গে একবার দেখা হয়। আর সেই স্বাঙ্গজাত পুত্রটি–সে এখন কত বড় হয়েছে? শান্তনুর মনে এইসব জল্পনা নিশ্চয়ই ছিল। মৃগয়া অথবা এই শব্দের আক্ষরিক অর্থে যদি অন্বেষণ বুঝি তবে যে হরিণীটিকে তিনি অনেককাল আগে প্রেমবাণে বিদ্ধ করে ফিরে গিয়েছিলেন, তারই অনুসরণক্রমে তিনি উপস্থিত হলেন গঙ্গার তীরভূমিতে।
