রমণী এক কথায় রাজি হলেন। কিন্তু একটা শর্তও দিলেন। রমণী বললেন–আমি তোমার বশবর্তিনী স্ত্রী হতেই পারি। কিন্তু মহারাজ আমি যা কিছুই করব তুমি বাধা দেবে না, কিংবা আমাকে কোনও কটু কথাও বলবে না। আমাকে বাধা দিলে বা কটু কথা বললে আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাব-বারিতা বিপ্রিয়ঞ্চোক্তা ত্যজেয়ং ত্বমসংশয়। শান্তনুও সঙ্গে সঙ্গে রাজি হলেন।
তৎকালীন দিনের সামাজিক অবস্থার নিরিখে এক রমণীর মুখে এ হেন শর্তের কথা শুনেই বোঝা যায়–রমণীই চালিকার আসনে বসেছিলেন, মহারাজ শান্তনু এই রূপসী জাদুকরীর হাতে পুত্তলিকামাত্র। রমণী নিজের পরিচয় দিলেন না, শান্তনুও সে পরিচয় জিজ্ঞাসা করেননি, তার পিতাঠাকুরও তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করতে বারণ করেছেন। আমাদের ধারণা হয়–পরিচয় দেবার মতো কোনও পরিচয় হয়তো তাঁর ছিলও না। আর রমণীর ভাব-ভঙ্গি দেখুন-রমণীকে দেখে শান্তনু তো মুগ্ধ হয়েইছিলেন কিন্তু শান্তনুকে দেখে রমণী যে ব্যবহার করেছিলেন, তা। মহাভারতের কবির ভাষায় ‘বিলাসিনী’র মতো। শান্তনুকে দেখে তারও আবেগ ধারণ করার ক্ষমতা ছিল না- নাতৃপ্যত বিলাসিনী।
আরও একটা ঘটনা লক্ষ করার মতো। মহারাজ শান্তনু এই রমণীকে হস্তিনাপুরের রাজধানীতে নিয়ে আসেননি। হস্তিনাপুরের রাজরানী বলে তার বধু-পরিচয় হয়নি একবারও। মহাভারতের কবি এই রমণীর ওপর দেবনদীর মাহাত্ম্য অর্পণ করে তার নাম দিয়েছেন গঙ্গা। কিন্তু ওই যে নীতিশাস্ত্র বলেছে–নদীনাঞ্চ নখিনাঞ্চ-নদী আর নখযুক্ত জন্তুর জন্মমূল খুঁজতে যেও না বাপু, ধন্দে পড়ে যাবে। মহাভারত সসম্মানে জানিয়েছে–স্বর্গের দেবী বা দেবনদী হওয়া সত্ত্বেও গঙ্গা শান্তনুর সঙ্গে কামব্যবহার করতেন শান্তনুর সৌভাগ্যে; কিন্তু তার পরের পংক্তিতেই বলা হয়েছে–শান্তনু যাতে গঙ্গার সঙ্গে রমণ-সুখ অনুভব করেন, তার জন্য গঙ্গার চেষ্টার অন্ত ছিল না। কখনও রমণপূর্বের শৃঙ্গার, কখনও সম্পূর্ণ সম্ভোগ, কখনও একটু নাচ, কখনও বা মনোহর ভাবভঙ্গি-সম্ভোগ-স্নেহ-চাতুর্যৈহাব-লাস্যমনোহরৈঃ–যখন যেটি প্রয়োজন, সেইরকম রমণ-নৈপুণ্য ব্যবহার করেই রাজাকে সন্তুষ্ট করতে লাগলেন গঙ্গা।
আমাদের জিজ্ঞাসা- এই কি দেবী অথবা দেবনদীর মতো ব্যবহার? মহাভারতের কবি উপাখ্যানের বহিরঙ্গে বসুদেবতা এবং গঙ্গার দেবীত্ব প্রকট করে অনেক কথার মাঝে একটি মাত্র কথা বলে বুঝিয়ে দিয়েছেন গঙ্গা ঠিক বিবাহিতা রমণীর মতো শান্তনুর সঙ্গে সম্ভোগ ব্যবহার করছিলেন বটে, তবে বাস্তবে কোনও পরিণীতা পত্নীর গৌরব গঙ্গার ছিল না। ঠিক বিবাহিতা নয়, বিবাহিতা স্ত্রীর মতো–ভাৰ্য্যেবোপস্থিতাবৎ। সামান্য এই মতো’ শব্দটির মধ্যেই গঙ্গার আসল পরিচয়টি লুক্কায়িত আছে বলে মনে করি। শান্তনু তাকে রাজবধুর মর্যাদায় হস্তিনাপুরে নিয়ে আসতে পারেননি, অথবা বলি–নিয়ে আসেননি। ভাবে বুঝি-গঙ্গা, তিনি দেবীরূপিণীই হোন, অথবা বিলাসিনী’–সেই দেবরূপের মধ্যে বিলাসিনী রমণীর আঙ্গিকটাই বড় হয়ে উঠেছে, দেবীর মাহাত্ম্য সেখানে উপাখ্যানমাত্র।
বছর বছর সন্তানের জন্ম দিয়ে তাকে জলে ভাসিয়ে দেবার মধ্যেও উপাখ্যানের আঙ্গিকটাই বড় কথা। বাস্তবে মহাত্মা ভীষ্মদেব যে অজ্ঞাতপরিচয় রমণীর গর্ভে জন্মাবেন, তাকে গৌরব প্রদান করার জন্যই গঙ্গা নাম্নী এক রমণীকে বসুজননী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক মনোরম উপাখ্যানেরও জননী হতে হয়েছে। অথবা এমন হতেও বা পারে যে, সেই রমণী তার প্রথমজাত পুত্রগুলিকে ভাসিয়েই দিয়েছিলেন নদীতে এবং শান্তনুও এই বিলাসিনী’ রমণীর কুরতায় বিপন্ন বোধ করেছিলেন কখনও। অথবা অষ্টম গর্ভের সন্তানের অন্য কোনও মাহাত্ম্য আছে কিনা, তাই বা কে জানে? নইলে অষ্টম গর্ভের কৃষ্ণ এবং অষ্টম গর্ভের দেবব্রত ভীষ্মের জন্মেই বা এত সাদৃশ্য কেন? আর কী আশ্চর্য, অষ্টম গর্ভে জন্মে যারা পরবর্তীকালে বিখ্যাত হবেন, তাদের পূর্বজন্মাদের মৃত্যু সব সময়েই কুরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। যেমন কৃষ্ণের অগ্রজম্ম অন্য পুত্রেরা কংসের হাতে আছাড় খেয়ে মরেছেন আর ভীষ্মের পূর্বজরা মায়ের ক্রুরতায় নদীর জলে শাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। এ
তবে সমস্ত এই অনুমানের ওপরেও আমাদের তর্কে এই রমণীর চেয়েও বড় ঘটনা হল ভীষ্মের জন্ম। ভীষ্ম জন্মাবেন বলেই তাঁর মাতৃদেবী গঙ্গার মাহাত্ম্য ভূষিত। ভীষ্ম জন্মাবেন বলেই অষ্টবসুর মর্ত্যে অবতরণের উপাখ্যান। যাই হোক, মহাভারতের কথামতো সাতটি সন্তানকে পরপর জলে ডুবিয়ে দেবার পর শান্তনুর ধৈর্য অতিক্রান্ত হল। তারপর অষ্টবসুর তেজে সমৃদ্ধ হয়ে গঙ্গার অষ্টম গর্ভের যে পুত্রটি জন্মান, গঙ্গা তাকে দেখে হেসে উঠলেন–অথ তামষ্টমে জাতে পুত্রে প্রহসতীমিব। মহারাজ শান্তনু প্রমাদ গণলেন–এই কি সেই ক্রুর হাসিটি যা অষ্টম বার তাকে পুত্ৰশোক দেবে। শান্তনু চেঁচিয়ে উঠলেন–আর নয়। কী রকম মেয়ে তুমি? কে তুমি? কার মেয়ে? কেনই বা এমন করে পুত্রহত্যা করছ-মা বধীঃ কাসি ক্যাসি কিঞ্চ হংসি সুতানিতি? স্বামীর মতো ব্যক্তিটিকে বেশি করে পাবার জন্যই কি গঙ্গার এই পুত্রহত্যা?
রমণী সহাস্যে বললেন–আর তোমার পুত্রবধ করব না। কিন্তু আজই তোমার সঙ্গে আমার শেষ প্রহরের বসবাস সমাপ্ত হন। তোমার সঙ্গে কথা ছিল–তুমি আমার কোনও কাজে বাধা দেবে না–জীর্ণোস্তু মম বাসোয়ং যথা স সময়ঃ কৃতঃ। গঙ্গা এবার আপন পরিচয় দিলেন শান্তনুর কাছে এবং তিনি যে দেবকার্য সিদ্ধ করার জন্যই শান্তনুর স্ত্রীত্ব বরণ করেছিলেন, সে কথাও জানালেন। কথায় কথায় বসুগণের প্রতি বশিষ্ঠের অভিশাপ সুব্যক্ত হল শান্তনুর কাছে। যথার্থ হয়ে উঠল গঙ্গার পুত্রবধের কাহিনী।
