বৃহদ্দেবতা বা নিরুক্তের মতো প্রাচীন বৈদিক গ্রন্থে কিন্তু ব্যাপারটা অন্যরকম। এখানকার বক্তব্য শুনলে মনে হয় দেবাপির মুনিবৃত্তি, ত্যাগ-বৈরাগ্যে শান্তনু খানিকটা অনুতপ্ত হয়েই তাকে বন থেকে ফিরিয়ে আনতে যান। অনাবৃষ্টির অজুহাতটা অবশ্যই ছিল। দেবাপিকে বন থেকে নিয়ে এসে শান্তনু তাকে অনেক মান্যি করে নিজের রাজ্যটাই তাকে সমর্পণ করেন। দেবাপি অবশ্যই রাজ্য গ্রহণ করেননি, শুধু তিনি কনিষ্ঠ ভ্রাতার পৌরোহিত্য স্বীকার করেন। সবচেয়ে বড় ঘটনা- ঋগবেদের দশম মণ্ডলের একখানি সূক্ত (১০,৯৮) এই দেবাপির রচনা। খোদ ঋগবেদের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি– শান্তনুর পুরোহিত দেবাপি হোম করার জন্য উদ্যোগী হয়ে বৃষ্টি-উৎপাদনকারী দেবস্তব রচনা করেছিলেন ধ্যানের দ্বারা- যদ্ দেবাপিঃ শক্তনবে পুরোহিতো হোত্রায় বৃতঃ কৃপয়দীধেৎ।… বৃষ্টিনিং রবাণঃ…। লক্ষণীয় ঋগবেদের দশম মণ্ডলের সম্পূর্ণ একখানি সূক্তই দেবাপির রচনা (ঋগবেদ ১০.৯৮)। এমন একটি মানুষ বিষ্ণুপুরাণে বেদ-বিরুদ্ধ কথা বলছেন– অবিশ্বাস্য। কবিস্বভাব এই মানুষটিকে প্রজাদের অতি প্রিয় হওয়া সত্ত্বেও শুধু এক চর্মরোগের জন্য রাজ্য হারাতে হয়েছিল- প্রিয়ঃ প্ৰজানামপি স তৃগদোষেণ প্ৰদূষিতঃ- এবং সেটা হয়তো অন্যায়ভাবেই। এমনকি শান্তনুর সামান্য ষড়যন্ত্রেও সেটা ঘটে থাকতে পারে। অন্তত বিষ্ণুপুরাণ দেখলে তাই মনে হয়।
যাই হোক, মহাভারতে দেখতে পাচ্ছি, দেবাপি রাজ্য ছেড়ে চলে গেলে মেজ ভাই বাহ্লীকও পিতার রাজ্য স্বীকার করলেন না। সেটা অবশ্য বড় দাদার প্রতি কোনও সমব্যথায় নয়। তিনি তার মামার রাজ্য পেয়েছিলেন কোনও কারণে-বাহ্রীকো মাতুলকুলং ত্যক্তা রাজ্যং সমাশিতঃ। বাপ-ভাইদের ছেড়ে গেলেও তার অবশ্য সমৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয়নি। কনিষ্ঠ শান্তনুকে তিনি স্বেচ্ছায় রাজত্ব ছেড়ে দিয়েছেন এবং সমস্ত সময়েই ভাইয়ের রাজ্যের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। পিতা প্রতীপ স্বর্গত হলে মেজ দাদা বাহ্লীকের অনুমতি নিয়ে শান্তনু রাজা হয়ে বসলেন হস্তিনাপুরে বাহীকেন নুজ্ঞাতঃ শান্তনু লোকবিশ্রুতঃ।
শান্তনুর সম্বন্ধে তাঁরই সময়ে একটি প্রবাদ তৈরি হয়েছিল, যে প্রবাদ লোক-পরম্পরায় বাহিত হয়ে পৌরাণিক কালে একটি শ্লোকে পরিণত হয়েছিল। সেই প্রবাদের ভাষায়– শান্তনু যদি তার দুই হাত দিয়ে একটি বৃদ্ধ লোককেও স্পর্শ করতেন, তবে তার বৃদ্ধজনোচিত জরাজীর্ণ ভাবটি মুহূর্তের মধ্যে চলে যেত। তিনি যুবক হয়ে যেতেন এবং এই যৌবনের নবায়ন তার হস্তস্পর্শেই সংঘটিত হত বলে লোকে তাকে শান্তনু বলে ডাকত– পুনর্যবা চ ভবতি তস্মাত্তং শান্তনুং বিদুঃ। আসল কথা শাক্তনু বোধহয় একটি বুড়ো মানুষের মধ্যেও সেই উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারতেন যাতে করে একটি বৃদ্ধও যুবক-জনের মতো ব্যবহার করতেন।
.
৫২.
মহারাজ ভরতের বংশে, অথবা আরও আগে থেকে যদি বলি, তবে বলতে হবে মহারাজ যযাতির বংশে কনিষ্ঠের রাজ্য-প্রাপ্তি কিছু অসম্ভব ব্যাপার নয়। অপিচ রাজা হিসেবে শান্তনু যোগ্যতম ব্যক্তি ছিলেন। মহারাজ প্রতীপ শম-দম সাধন করে শান্তনুকে পুত্র হিসেবে লাভ করেছিলেন বলেই যেমন তার নাম শান্তনু-শান্তস্য জজ্ঞে সন্তানস্তস্মাদাসীৎ স শান্তনুঃ তেমনই বৃদ্ধ মানুষও যার স্পর্শে যুবকের উদ্দীপনা লাভ করতেন, সে শান্তনু রাজা হিসেবে যে যথেষ্ট সফল ছিলেন, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
জ্যেষ্ঠ দেবাপি বা মধ্যম বাহ্রীক রাজ্য না পাওয়ায় মহারাজ প্রতীপের অন্তরে যদি বা কোন দুঃখ থেকেও থাকে, মহাভারতের কবি সে কথা স্বকণ্ঠে উচ্চারণ করেননি। কিন্তু অজ্ঞাতকুলশীলা সেই রমণীকে প্রতীপ যে কথা দিয়েছিলেন, সে কথা আদেশের অক্ষরে লেখা ছিল শান্তনুর মনে। শান্তনুর মনে ছিল–পিতাঠাকুর তাকে বলেছিলেন–পরমা সুন্দরী এক রমণী তোমার কাছে বিবাহের যাচনা নিয়ে আসবে। তুমি তার পরিচয় জিজ্ঞাসা কোরো না, এমনকি সে যা করতে চায় তাতে বাধাও দিও না। আমার আদেশে তুমি সেই অনুরক্তা রমণীর ইচ্ছা পূরণ কোরোমন্নিযোগা ভজন্তীং তাং ভজেথা ইত্যুবাচ তম্।
আমাদের ধারণা, শান্তনু তখনও রাজা হননি অথবা হলেও সদ্যই রাজা হয়েছেন। শান্তনুর মৃগয়ার অভ্যাস ছিল ভালরকম। রাজ্যপ্রাপ্তিতে যদি কোনও শান্তি এসে থাকে মনে, তবে সেই শাস্তি উপভোগ করার জন্যই হয়তো তিনি মৃগয়ায় বেরলেন। মৃগয়া চলতে থাকল রাজার ইচ্ছামত। তারপর একদিন গঙ্গার তীর বেয়ে একাকী যেতে যেতে সেই অপূর্বদর্শন রমণীর সঙ্গে শান্তনুর দেখা হল। তার রূপে গঙ্গার তীর আলো হয়ে উঠেছে–জাজ্বল্যমানাং বপুষ। গা-ভর্তি গহনা, পরিধানের বস্ত্র কিছু সূক্ষ্ম, গায়ের রঙ পদ্মকোষের মতো গৌর।
শান্তনুর শরীর রোমাঞ্চিত হল। ভাবলেন বোধহয়– এমন রূপসীর জন্য পিতাঠাকুরের আদেশের প্রয়োজন ছিল না। আমাদের ধারণা–এমন কোনও আদেশ হয়তো ছিলও না। এক অপরিচিতা রমণীকে গঙ্গার মাহাত্মে গৌরবান্বিত করার জন্যই হয়তো ওই আদেশ এবং বসুদেবতার উপাখ্যান। রূপে মুগ্ধ হয়ে রমণীর দিকে এমনভাবে তাকিয়ে ছিলেন শান্তনু, যাতে। বলা যায়, তিনি চোখ দিয়ে পান করছিলেন রমণীর প্রত্যঙ্গ-রূপ-রাশি–পিবন্নিব চ নেত্রাভ্যাং নাতৃপ্যত নরাধিপঃ। অন্যদিকে লক্ষণীয়, সেই রমণীও কিছু কম মুগ্ধ ছিলেন না শান্তনুর রূপে। রাজাকে দেখে তারও অনুরাগ এতটাই উদ্বেল যে, বিলাসিনী রমণীর সপ্রণয় দৃষ্টিতে তিনিও হাঁ করে তাকিয়ে ছিলেন রাজার দিকে। শান্তনু আর দেরি না করে বললেন–তুমি দেবী না, দানবী? গন্ধর্বী না অপ্সরা? তুমি যে হও সে হও, তোমাকে আমি স্ত্রী হিসেবে চাই–যাচে ত্বং সুরগর্ভাভে ভার্যা মে ভব শোভনে।
