প্রজাদের দিক থেকে ব্যাপারটা নিশ্চয়ই বোঝা গেল। কিন্তু হঠাৎ এই সর্বত্র উচ্চাৰ্য্যমান অভিষেক-কার্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্যেষ্ঠ পুত্র দেবাপির মনের অবস্থা হল শোচনীয়। মহারাজ প্রতীপের চোখে নেমে এল অর ধারা। প্রাণপ্রিয় পুত্র রাজ্য লাভ করল না দেখে প্রতীপ অত্যন্ত শোকগ্রস্ত হলেন। নিজের অসহায় অবস্থা বুঝে শোকক্লিষ্ট পিতাকে তিনি মুক্তি দিলেন নিজে ত্যাগ স্বীকার করে। দেবাপি রাজভবন ছেড়ে মুনিবৃত্তি গ্রহণ করে বনে চলে গেলেন। ত্বগদোষের জন্য রাজ্য না পেলেও মুনি হিসেবে দেবাপির সফলতার অন্ত নেই। মহাভারতে দেখছি– যখন তিনি বনে প্রস্থান করেন তখন তাঁর বয়স খুবই কম- দেবাপিঃ খলু বাল এবারণ্যং বিবেশ। কিন্তু প্রায় বালক বয়সে বনে গিয়েও দেবাপি ঋষি-মুনির তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করেন। তপস্যার। বীর্যে তিনি শেষ পর্যন্ত দেবতাদের আচার্য নিযুক্ত হন–উপাধ্যায়স্তু দেবানাং দেবাপিরভন্মুনিঃ।
বৈদিক গ্রন্থ বৃহদ্দেবতা এবং নিরুক্তে বলা হয়েছে- দেবাপিকে প্রায় অবৈধভাবে অতিক্রম করে শান্তনু যে রাজা হয়েছিলেন, তাতে একভাবে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছিল শান্তনুকে। শান্তনুর রাজ্যে বার বছর বৃষ্টি না হওয়ায় তাঁর রাজ্য ধ্বংসোন্মুখ হয়। ঘটনাটা সবিস্তারে বলা হয়েছে বিষ্ণুপুরাণে। অনাবৃষ্টির প্রকোপ অত্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় মহারাজ শান্তনু শেষ পর্যন্ত। মন্ত্রিসভা ডেকে ব্রাহ্মণদের জিজ্ঞাসা করলেন মহাশয়েরা! আমার রাজ্যে বৃষ্টি হচ্ছে না কেন? এখানে আমার অপরাধটা কী? ব্রাহ্মণরা বললেন– মহারাজ! এ রাজ্য আপনার বড় ভাইয়ের প্রাপ্য ছিল। তাঁর রাজ্য আপনি ভোগ করছেন। এ তো অনেকটা বিবাহবিধির মত বড় ভাইয়ের বিয়ে হল না, ছোট ভাই আগেই বিয়ে করে বসল- এ তো সেইরকম– অগ্রজস্য তেহেঁয় অবনিয়া ভুজ্যতে, পরিবেত্তা ত্বম্।
ব্রাহ্মণদের এই বাক্য থেকে বোঝা যায়- দেবাপির চর্মদোষ যাই থাক, তা অন্তত কুষ্ঠরোগ ছিল না। রাজার কাছে পৃথিবীও অনেকটা ভোগ্যা স্ত্রীর মতো। বড় ভাইয়ের বিয়ে হওয়ার আগেই কনিষ্ঠের বিয়ে হলে একটা বড় অন্যায় হয় বলে ধর্মশাস্ত্রকারেরা বলেছেন। যে ক্ষেত্রে কনষ্ঠের এই দোষ হয় না, তা হল- বড় ভাই যদি জন্মান্ধ বধির বা মূক হন জাতান্ধে বধিরে মূকে ন দোষঃ পরিবেদনে। শামুজ্যেষ্ঠ দেবাপি অন্ধ, বধির কিংবা মূক নন। অথচ তিনি রাজ্য পাননি। আরও আশ্চর্য, চর্মদোষের জন্য জর আসন্ন অভিষেক নিবারিত হয়েছে ব্রাহ্মণদের দ্বারাই, এখন সেই ব্রাহ্মণরই আবার বলছেন–এটা তোমার অন্যায়। বড় ভাইয়ের রাজা তুমি ভোগ করছ।
বিষ্ণুপুরাণের কাহিনী থেকে ধারণা হয়–দেবাপির আসন্ন অভিষেক নিবারণ করার ব্যাপারে শান্তনুর কোনও হাত ছিল না তো? পূর্বতন ব্রাহ্মণদের তিনিই উত্তেজিত করেননি তো? এখন শান্তনু বিপদে পড়েছেন, এখন রাজসভার মন্ত্রণালয়ে দেবাপির পক্ষপাতী ব্রাহ্মণ মন্ত্রীরাও মুখ খুলেছেন। শান্তনু জিজ্ঞাসা করলেন– তাহলে এখন কী করা যায়? আমার কর্তব্য কী? ব্রাহ্মণরা বললেন- যতক্ষণ না দেবাপির পাতিত্য-দোষ ঘটছে, ততক্ষণ এ রাজ্য তার। অতএব আপনি আপনার রাজাধিকার ত্যাগ করুন। দেবাপিকে বন থেকে ডেকে এনে এই রাজ্য তাকেই দিয়ে দিন- ত অলমেতেন। তস্য অর্হং রাজ্যং… তস্মৈ দীয়তা।
পাতিত্য-দোষ মানে পতিত হওয়া। সে যেমন অন্ধ, বধিরতা বা মূকতার জন্যও একজন রাজার পাতিত্য ঘটতে পারে, তেমনই তিনি যদি ব্রাহ্মণ সমাজের সদাচার ছেড়ে বেদবিরুদ্ধ মত পোষণ করেন, তবে সে রাজা অবশ্যই পতিত হবেন। বিষ্ণুপুরাণে দেখা যাচ্ছে-মন্ত্রিসভার আলোচনা শ্রবণমাত্রেই রাজার প্রধানমন্ত্রী-অসারী তার নাম। তিনি কত বেদচার-সদাচার বিরোধী মানুষকে দেবাপির কাছে পাঠিয়ে দিলেন। তাদের কাজ হল–বেদোক্ত যজ্ঞ-দান, ত্যাগ-বৈরাগ্যের বিরুদ্ধ কথা বলে দেবাপিকে প্রায় নাস্তিকের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া মন্ত্রিপ্রবরেণ অশ্মসারিণা তারণ্যে তপস্বিনে বেদবাদবিরোধ-বক্তারঃ প্রযোজিতাঃ। এই লোকগুলি নাকি সরলমতি দেবাপিকে নানাভাবে বুঝিয়ে বেদবিরোধী করে তুলল।
এদিকে মহারাজ শান্তনু ব্রাহ্মণদের তিরস্কারে দুঃখিত হয়ে সেই ব্রাহ্মণদের নিয়েই বনের পথে চললেন দেবাপির কাছে। জ্যেষ্ঠ দেবাপিকে তিনি পৈতৃক রাজ্য গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানাবেন। দেবাপির কাছে পৌঁছে ব্রাহ্মণেরা তাকে অগ্রজের অধিকার স্বীকার করতে বললেন। উত্তরে দেবাপি নাকি বেদাচারবিরুদ্ধ নানা কথায় উত্তেজিত করে তুললেন সমাগত ব্রাহ্মণ মন্ত্রীদের। ব্রাহ্মণেরা তখন শান্তনুকেই বললেন– অনেক হয়েছে, মহারাজ! একে আর বেশি কিছু বলে লাভ নেই- আগচ্ছ ভো রাজ! অলমত্রাতিনির্বন্ধন। এ লোকটা একেবারে পতিত হয়ে গেছে। শান্তনু রাজ্যে ফিরে এলেন এবং তার পূর্বোক্ত দোষমুক্তি ঘটায় রাজ্যে সুবৃষ্টি হল।
বিষ্ণুপুরাণে দেবাপির বিরুদ্ধে যেভাবে ষড়যন্ত্র ঘটিয়ে তাঁর পাতিত্য-দোষ ঘটানো হল– এর মধ্যে আর কিছু না হোক মহারাজ শান্তনুর কিছু দায় থেকে যায়। যে মানুষটি হস্তস্পৃষ্ট রাজমুকুট মাটিতে নামিয়ে রেখে তপস্যা করতে বনে চলে গেলেন, তিনি দু-পাটি বদ লোকের বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে বৈদিক বিধি লঙ্ঘন করবেন এ ঘটনা তত আদরণীয় নয়। বিষ্ণুপুরাণের ঘটনায় শুধু এইটুকু বলা যেতে পারে যে, জ্যেষ্ঠকে রাজ্য থেকে বিতাড়নের ব্যাপারে শান্তনুর কিছু হাত থাকতে পারে। উপরন্তু মেজভাই বাহ্লীকই বা কেন মাতুল রাজ্যে চলে যাবেন, দেবাপির পরে তারই তো রাজা হওয়ার কথা। আর তিনি কোনও এলেবেলে লোক ছিলেন না। ধৃতরাষ্ট্রের নিজের ভাষায়–বাপ-ভাই ছেড়ে তিনি মাতুল রাজ্যে চলে গেলেও রাজ্যশাসনে তিনি পরম ঋদ্ধি অর্জন করেছিলেন।
