এটা তার বোকামি নয়, বুদ্ধি। প্রতীপ সস্নেহে সেই অজ্ঞাতকুলশীলা রমণীকে পুত্রবধূর মর্যাদা দিয়েছেন এবং ঘরে এসে যৌবনপ্রাপ্ত কুমার শান্তনুকে বলেছেন–শান্তনু! একটি পরম সুন্দরী রমণী যদি কোনওদিন তোমার কাছে প্রণয়প্রার্থিনী হয়ে তোমাকে কামনা করে, ত্বমিব্রজে যদি রহঃ সা পুত্র বরবর্ণিনী– তবে তুমি যেন তাকে প্রত্যাখ্যান কোরো না। তাকে যেন তুমি জিজ্ঞাসা কোরো না তুমি কে, কার মেয়ে ইত্যাদি। আমার আদেশে তুমি সেই অনুরক্তা রমণীর ইচ্ছাপূরণ কোরো সে যা করতে চায়, বাধা দিও না তাকে। মহারাজ প্রতীপ তাকে এই কথা বলে শান্তনুকে নিজের রাজ্যে অভিষিক্ত করে বনে চলে গেলেন স্বেচ রাজ্যেভিষিচ্যৈনং বনং রাজা বিবেশ হ।
মহাভারতের কবি ভারতবর্ষের প্রাণপ্রদায়িণী গঙ্গাকে ভরতবংশের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য নানা কাহিনীর নিবেশ ঘটিয়ে আমাদের কী বিপদেই না ফেলেছেন। বস্তুত মহারাজ শান্তনুর রাজা হওয়ার মধ্যেও একটা বড় ঘটনা আছে। অপরিচিতা রমণীকে গঙ্গার মাহাত্ম্য দান এতে গিয়ে কবি সে কথা এখনও বলতেই পারেননি। তাঁকে সে ঘটনা উল্লেখ করতে হয়েছে মহাভারতের উদ্যোগ পর্বে গিয়ে। আমরা সেটা বলে নিয়ে আবারও গঙ্গার কথায় আসব। মহারাজ প্রতীপের তিন পুত্র প্রথম পুত্রের নাম দেবাপি, দ্বিতীয় শান্তনু, তৃতীয় হলেন বাহ্লীক। নিয়ম অনুসারে জ্যেষ্ঠ পুত্র দেবাপিরই রাজা হওয়ার কথা। কিন্তু রাজা হওয়া তার হল না। মহাভারতের উদ্যোগ পর্বে যখন পাণ্ডব-কৌরবের যুদ্ধোদ্যোগ শুরু হয়েছে, তখন কৃষ্ণ শান্তির বাণী বহন করে কৌরব-সভায় এলেন। সেখানে ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর, গান্ধারী– সবাই মিলে দুর্যোধনকে বোঝনোর চেষ্টা করলেন যে, তার পিতা ধৃতরাষ্ট্র রাজ্য পাননি অঙ্গহীনতার জন্য। সেই কারণে কনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও পাণ্ডুর রাজ্যের উত্তরাধিকার ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রে বর্তায় না। সবার কথা শেষ হলে স্বয়ং ধৃতরাষ্ট্র নিজেই নিজের অধিকার খর্ব করে দুর্যোধনকে বেঝালেন। আর ঠিক এই সময়েই প্রতীপের জ্যেষ্ঠ পুত্র দেবাপির কথা এল।
মহাভারতের আদিপর্বে যেখানে আমরা কুরুবংশের পরম্পরা, দেখেছি, সেখানে দেবাপি সবার বড় ছেলে, শান্তনু মেজ ছেলে এবং বাকি সবার ছোট। কিন্তু মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের বয়ানে দেখছি– দেবাপি ঠিক আছেন, কিন্তু বাহ্রীক মেজ এবং শান্তনু সবার ছোট। ধৃতরাষ্ট্র দুর্যোধনকে বুঝিয়ে বললেন-আমার পিতার পিতামহ যিনি, সেই মহারাজ প্রতীপ কি কম বড় মানুষ ছিলেন নাকি। অর্থশাস্ত্র, রাজনীতি শাস্ত্র সব তার জানা। রাজা হিসেবে নাম-ডাকও তার কম ছিল না–প্রতীপঃ পৃথিবীপাল-স্ত্রিযুলোকে বিশ্রুতঃ। তার তিন পুত্র- দেবাপি, বাহ্লীক এবং শান্তনু–যিনি আমার পিতামহ- তৃতীয় শান্তনুস্তাত ধৃতিমান্ মে পিতামহঃ। ধৃতরাষ্ট্র প্রতীপের পুত্রদের কথা বলে বিশেষভাবে দেবাপির পরিচয় দিচ্ছেন– আমার জ্যেষ্ঠ পিতামহ দেবাপি ছিলেন মহাশক্তিধর পুরুষ এবং রাজা হবার পক্ষে সত্তম ব্যক্তি। কিন্তু তার দেহে চর্মরোগ ছিল, ত্বকের দোষ তাঁর সমস্ত শরীরে বড় বেশি প্রকট হয়ে উঠেছিল–দেবাপি মহাতেজা ত্বদোষী রাজসত্তমঃ।
ধৃতরাষ্ট্রর তথ্য বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে- হস্তিনাপুরের জনপদবাসীরা দেবাপিকে বেশ পছন্দই করতেন, ত্বকের দোষ থাকা সত্ত্বেও পুরবাসীরা তাকে যথেষ্ট আদর-যত্নও করতেন পৌর-জানপদানাঞ্চ সম্মতঃ সাধুসকৃতঃ। মানুষ হিসেবে দেবাপি ছিলেন অতি চমৎকার ধার্মিক, সত্যবাদী, পিতার সমস্ত ইচ্ছাপূরণে আগ্রহী একটি পুত্র। রাজ্যের ঘোট ঘোট বাচ্চা থেকে বুড়ো মানুষটি পর্যন্ত তাকে খুব পছন্দ করতেন। সমস্ত মানুষের প্রতি দেবাপিরও বড় দয়া। সবার যাতে ভাল হয় সে জন্য তার চেষ্টার অন্ত ছিল না-বদান্যঃ সত্যসন্ধশ্চ সর্বভূতহিতে রতঃ। ছোট ভাই বাহ্লীক এবং শান্তনুর সঙ্গেও তার কোনও বিরোধ নেই। তারাও দেবাপিকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন– সৌভ্রাত্ৰঞ্চ পরং তেষাং সহিতানাং মহাত্মনাম।
সকলের পছন্দসই এই জ্যেষ্ঠ পুত্রকেই মহারাজ প্রতীপ রাজ্য দিয়ে যাবেন বলে ঠিক করলেন। তিনি বুড়ো হয়েছেন, আজ আছেন কাল নেই-কালস্য পর্যায়ে বৃদ্ধো নৃপতিসত্তমঃ- অতএব জ্যেষ্ঠ পুত্র দেবাপির রাজ-অভিষেকের জন্য শুভ সময় দেখে তিনি শাস্ত্র অনুযায়ী সমস্ত উপকরণ এবং অভিষেক-সম্ভার যোগাড় করতে বললেন রাজ কর্মচারীদের-সম্ভারা অভিষেকাৰ্থং কারয়ামাস যতুতঃ। শুভ দিনে দেবাপির অভিষেকের মঙ্গলকাও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ঠিক এই সময়ে রাজ্যের ব্রাহ্মণ-সজ্জনেরা, বৃদ্ধরা, পুর-জনপদবাসীদের সঙ্গে নিয়ে মহারাজ প্রতীপকে দেবাপির পুণ্য-অভিষেক-কার্য থেকে বিরত হতে বললেন–সর্বে নিবারয়ামাসুদেবাপেরভিষেচন। কারণ সেই ত্বকের দোষ, চর্মরোগ। অবালবৃদ্ধ জনসাধারণ সবাই দেবাপিকে ভালোবাসলেও দেবাপির চর্মদোষ যে তার রাজকার্য পরিচালনার অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে–এই যুক্তিতেই সকলে মহারাজ প্রতীপকে দেবাপির অভিষেককার্য সম্পন্ন করতে নিষেধ করলেন।
দেবাপির তৃগদোষ হয়তো খুব সাধারণ নয়। তবে তা যে প্রাচীন ভয়ঙ্কর সেই কুষ্ঠরোগও নয়, তা আমরা হলফ করে বলতে পারি। কারণ কুষ্ঠ-রোগ মহাভারতের কালেও খুব অস্পৃশ্য এবং ঘৃণ্য ছিল। ঠিক ওরকমটি হলে দেবাপি আবালবৃদ্ধ সকলের তত প্রিয় হতেন না– সর্বেষাং বালবৃদ্ধানাং দেবাপি-হর্দয়ঙ্গমঃ। কিন্তু কুষ্ঠ না হলেও ব্রাহ্মণ এবং বৃদ্ধরা নানা সন্দেহে দেবাপিকে নিজেদের রাজা হিসেবে চাইলেন না। কারণ রাজা যদি প্রথম দর্শনেই পৌর-জনপদের কাছে ঘৃণ্য হয়ে ওঠেন, তবে সে রাজা প্রজাসাধারণের গ্রহণীয় হন না। আর রাজার কাছে প্রজারাই তার দেবতা। তারা পছন্দ না করলে সে রাজার মূল্য কী– হীনাঙ্গং পৃথিবীপালং নাভিনন্দতি দেবতাঃ।
