রমণী সুন্দরী, অতএব স্বর্গীয়া তো বটেই। আর যেভাবে সে নাছোড়বান্দা হয়ে মহারাজ প্রতীপের দক্ষিণ উরুখানি স্পর্শ করে বসেছে, তাকে ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন। প্রতীপ তার গম্ভীরতা বজায় রেখেও একটু প্রশ্রয় দিয়ে বললেন- আমার ভাল লাগার জন্য যে কাজ তুমি করতে বলছ, ভাল লাগার সেই বয়স আমি পার করে এসেছি- মমাতিবৃত্তমেতন্তু যং চোদ্দয়সি প্রিয়ম। তোমার পথ এখন একরকম, আমার অন্যরকম। এখন যদি তোমাকে আমি বিয়ে করে বসি, সে বড় অধর্ম হবে। সে হয় না। মহারাজ প্রতীপ রমণীকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য একটু কৌশল করে বললেন- তুমি আমার কাছে এসেই আমার ডান উরুখানি জড়িয়ে ধরে বসেছ। এই ডান উরুটি কাদের বসার জায়গা জান? আত্মজ পুত্র আর পুত্রবধূদের আদর করে বসাতে হয় ডান উরুতে অপত্যানাং সুষাণাঞ্চ ভীরু বিদ্ধেত আসন। আর তুমি কিনা আমার কাছে এসেই বোকার মতো প্রেমিকার যোগ্য আমার বাম উরুটি বাদ দিয়ে বসলে গিয়ে আমার দক্ষিণ উরুতে। কাজেই এখন তো আর কোনও উপায় নেই। আমি আর তোমার সঙ্গে সকাম ব্যবহার করতে পারি না। সে বড় অধর্ম হবে।
আমরা আগেই বলেছিলাম- মহারাজ প্রতীপের বয়স হয়েছে। তিনি স্ত্ৰিআর যুবকটি নেই। তবু কিনা এই নির্জন গঙ্গার তীরে এক অসামান্যা রূপবতী রমণীকে সম্পূর্ণ নিরাশ করতে তার ইচ্ছে হল না। তিনি বুঝলেন- কুরুবংশের মহারাজকে রমণীর বড় পছন্দ হয়েছে, রাজার চটক রমণীকে মোহিত করেছে। প্রতীপ তাই প্রশ্রয় দিয়ে বললেন– তুমি যদি আমার পুত্রবধু হতে চাও, তবে আমি তোমাকে সেই সম্মান দিতে পারি। আমার দক্ষিণ উরুদেশে উপবেশন করে তুমি আমার পুত্রবধুর স্নেহ লাভ করেছ জেনো। অতএব আমার পুত্রের জন্য আমি তোমাকে বরণ করছি, কন্যে– সুষা মে ভব কল্যাণ পুত্ৰার্থং তাং বৃণোম্যহম্।
রমণী সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়েই বললেন– তবে তাই হোক, মহারাজ। আমি তোমার পুত্রের সঙ্গেই মিলিত হব। তোমাকে দেখেই আমি মনে মনে কেবলই ভেবেছি– আমি প্রখ্যাত ভরত-বংশের কুলবধু হব– ত্বভক্ত্যা তু ভজিষ্যামি প্রখ্যাতং ভরতং কুলম্। রমণীর কথা শুনে বোঝা যায় নির্জন গঙ্গার তীরে প্রৌঢ় মহারাজ প্রতীপের ভাব-গম্ভীর আচরণ দেখে তিনি শুধু মুগ্ধই হননি, তার ইচ্ছে শুধু ভরতবংশের কুলবধু হবার। রমণী এবার তুমি থেকে আপনি’তে চলে গেলেন। সোচ্চারে বললেন– পৃথিবীতে যত রাজা আছেন, আপনারা হলেন তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। আপনাদের গুণের কথা একশ বছর ধরে গান গাইলেও শেষ হবে না। পূর্বে যারা আপনাদের বংশজাত, তারা সব মহান ব্যক্তি। আপনি যখন আপনার পুত্রের হয়ে কথা দিলেন, আশা করি, তিনি তা ফেলবেন না, অন্য কোনও বিচারও করবেন না– তৎ সর্বমেব পূত্ৰস্তে ন মীমাংসেত কহিচিৎ। হয়তো এই মহান ভরত-বংশের গৌরবেই সমস্ত লজ্জা ত্যাগ করে এই অভাতকুলশীলা রমণী প্রায় বৃদ্ধ এক রাজার দক্ষিণ ঊরু জড়িয়ে ধরেছিলেন। আপাতত তার সংকট সৃষ্টি হল বটে, কিন্তু মহারাজ প্রতীপ ভরতবংশের বধূমর্যাদা প্রার্থিনীর কাছে পুত্রকে বাগদত্ত করে রাখলেন।
এই ঘটনার পর মহাভারতের কবির কাহিনী খানিকটা অবিশ্বাস্য মনে হয়। কবি বলেছেন–তারপরে মহারাজ, প্রতীপ পুত্রের জন্য সস্ত্রীক তপস্যা আরম্ভ করলেন এবং তার পুত্র জন্মাল– যার নাম শান্তনু। শান্তনু যখন বড় হয়ে যৌবনে পদার্পণ করলেন, তখন মহারাজ প্রতীপ তাকে সেই অপরিচিতা রমণীর কথা বলে তাঁকে বিয়ে করার কথা বললেন।
আমাদের কাছে এই উপাখ্যান তত বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। কেন, সে কথা খুলেই বলি। আপনারা জানেন– শান্তনু এবং গঙ্গার মিলনের পিছনে আরও একটা কাহিনী আছে। ইক্বাকুবংশীয় মহারাজ মহাভিষ নাকি এক সময় দেবতাদের সঙ্গে ব্রহ্মার কাছে উপস্থিত হয়েছিলেন, নদীশ্রেষ্ঠা গঙ্গাও সেখানে পৌঁছেছিলেন অন্য কোনও কারণে। ব্রহ্মার সঙ্গে কথোপকথনের সময় গঙ্গার আবরণ-বস্ত্রখানি হাওয়ায় উড়ে গেলে দেবতারা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করেন কিন্তু মহাভিষ রাজা– কী করবেন, মানুষের স্বভাব তো তিনি নাকি হাঁ করে তাকিয়ে ছিলেন অসংবৃতা গঙ্গার দিকে মহাভিষ আজষিরশঙ্কো দৃষ্টবান্ নদী। ব্রহ্ম তখন মহাভিষ রাজাকে অভিশাপ দেন যে, তিনি মর্ত্যলোকে জন্মাবেন। মহাভিষ রাজা অনেক চিন্তা করে কুরুবংশীয় মহারাজ প্রতীপের ছেলে হয়েই জন্মাবেন ঠিক করলেন। ওদিকে গঙ্গা মহাভিষ রাজার ধৈর্যচ্যুতি দেখে, তারই কথা চিন্তা করতে করতে স্বস্থানে ফিরে গেলেন– তমেব মনসা ধ্যায়পাবর্তং সরিরা।
আমরা কিন্তু অভিশপ্ত ঘটনার মধ্যেই মহারাজ শান্তনুর প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি। আমাদের কাছে অভিশপ্ত মহাভিষ রাজা বা পরবর্তীকালে গঙ্গার গর্ভজাত অষ্টবসুর সলিল-সমাধি, কোনওটাই খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। লক্ষণীয় ব্যাপার হল– তথাকথিত গঙ্গার সঙ্গে যখন শান্তনুর প্রথম দর্শন বা মিলন হয়, তখনও তিনি রাজা হননি বলেই মনে হয়। অন্যদিকে মহারাজ প্রতীপের সঙ্গে যখন গঙ্গার দেখা হয় তখনও শান্তনুর জন্ম হয়নি- এটাও ঘটনা নয়। আসল কথা হল– শান্তনু তখন অবশ্যই জন্মেছেন এবং সেই অজ্ঞাতকুলশীলা সেই রমণীর সঙ্গে তার দেখা হয়েছে। কোনও ব্রহ্মলোকে নয়, এই মর্ত্যলোকেই হয়তো দেখা হয়েছে। শান্তনু তখনও রাজা হননি। ইস্ফাকুবংশীয় অভিশপ্ত মহাভিষের সেই হাঁ করে তাকিয়ে থাকাটা সোজাসুজি শান্তনুরই কাজ। নির্জন গঙ্গার তীরে অজ্ঞাতকুলশীলা সেই রমণী ভরতবংশের এক প্রসিদ্ধ জাতককে এই ভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে তখনকার মতো লজ্জা পেয়েছিলেন। কিন্তু রমণী নিজেও শান্তনুর প্রতি আকৃষ্ট হওয়ায় একদিন লজ্জা ত্যাগ করে শান্তনুর পিতা মহারাজ প্রতীপের দক্ষিণ পাখানি জড়িয়ে ধরেছিলেন।
