যাই হোক, ভৃগুমুনি স্নান করতে গেছেন, আর এই অবসরে রাক্ষস পুলোমা ঢুকে পড়লেন ঠার আশ্রমে। তার বেশ-বাস বা চেহারার মধ্যে কোনও রাক্ষুসেপনা ছিল না। কেননা সুন্দরী পুলোমা তাকে দেখে ভয়ও পাননি, লজ্জাও পাননি। বরং সেকালের আতিথ্যের আদর্শে থালায় করে বেশ কিছু ফল-মূল খেতে দিয়ে ঘরে নেমন্তন্ন করলেন রাক্ষসকেন্যময়ত বন্যন ফল-মূলাদিনা তদা। বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও অন্তত রাক্ষস ততটাই ভদ্র যে, বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও পুলোমার মনে কিন্তু ভৃগুপত্নীকে পাবার জন্য কামনা ছিল হৃচ্ছয়েনাভিপীড়িত। রাক্ষস পুলোমা ভাবলেন–এই সুযোগ। বাড়িতে ভৃণ্ড-মুনি নেই। এই অসামান্যা রূপবতী ভৃগুপত্নীকে হরণ করে নিয়ে যাবেন তিনি। আজ থেকে ভৃগুপত্নীকে আপন বাহুর ডোরে পাবেন তিনি–এই চিন্তায় বড় খুশি হয়ে উঠলেন রাক্ষস পুলোমা–হৃষ্টমভূদ রাজন জিহীর্যুস্তাম্ অনিন্দিতাম্।
মনে মনে তার খুশি হওয়ার একটা কারণও ছিল। রাক্ষস পুলোমা দেবীকে আগেই চিনতেন। হয়তো সেই পুতুল-খেলার বয়স থেকে, হয়তো বা পৌগণ্ডের দিনশেষে যেদিন যৌবনের উদভেদ দেখা দিল পুলোমার শরীরে, সেদিনই জনান্তিকে রাক্ষস বরণ করেছিল এই অনুপমা সুন্দরীকে–সা হি পূর্বং বৃতা তেন পুলোম্না তু শুচিস্মিতা। সুন্দরী পুলোমা হয়তো সে কথা জানতেন। হয়তো বা জানতেন না। কিন্তু পুলোমার বাবা অন্তত জানতেন যে, রাক্ষস পুলোমা তার মেয়েকে বিয়ে করতে চান। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক তার মেয়ের সম্বন্ধে রাক্ষসের এই মনন-বরণ পুলোমার বাবা পছন্দ করেননি।
মহাভারতের বিখ্যাত টীকাকার নীলকণ্ঠ যেভাবে এই দুই যুবক-যুবতীর হৃদয় ব্যাখ্যা করেছেন, তাতে বেশ বুঝতে পারি–অতিরিক্ত বেদাভ্যাসের ফলে তার বুদ্ধি হয়তো খানিকটা কালিদাসীয় পদ্ধতিতে জড় হয়ে গিয়েছিল–বেদাভ্যাসজড়ঃ। নইলে ভাবুন একবার, নীলকণ্ঠ যখন মহাভারতের শ্লোকে দেখলেন–পুলোমা রাক্ষস ভৃগুর সঙ্গে বিয়ের আগেই সুন্দরী পুলোমাকে চেয়েছিলেন এবং পুলোমার বাবা সেটা জেনেও মেয়েকে তার হাতে দেননি, তখনই তিনি ব্যাখ্যা করলেন–ছোটবেলায় তার মেয়ে পুলোমা যখন কেঁদে কেঁদে একসা হত, তখন তার বাবা তাকে ভয় দেখিয়ে বলতেন—আর তো রাক্ষস। ধরে নিয়ে যা, এক্ষুনি ধরে নিয়ে যা এই মেয়েটাকে–বাল্য কিল রুদতীং কন্যাং রোদননিবৃত্ত্যর্থং ভীষয়িং পিত্রা উক্তং ‘রে রে রক্ষ! এনাং গৃহাণেতি। নীলকণ্ঠের ধারণা–এই রকম কোনও ভয় দেখানোর সময় পুলোমা রাক্ষস কথাগুলি শুনতে পায়-এক মেয়েটিকে মনে মনে বরণ করে।
বলা বাহুল্য, এ বিষয়ে আমার ভাবনা এতটা বাৎসল্যময়ী নয়। নির্দোষ তো নয়ই। আমি এই ঘটনার মধ্যে ক্রমে ক্রমে পরিচিত দুই মুগ্ধ হৃদয়ের স্পন্দন স্পষ্ট শুনতে পাই। সুন্দরী পুলোমার পিতা এই হৃৎস্পন্দন অস্বীকার করেছেন। তিনি এই যুবক-যুবতাঁকে মিলিত হতে দেননি। এবং তার কারণ দুটো হতে পারে। পুলোমা যদি রাক্ষস-ঘরের মেয়ে হন, তবে অধিকতর উৎকৃষ্ট পাত্রের জন্য তার পিতার অপেক্ষা থাকতে পারে। আর পুলোমা যদি আর্যগোষ্ঠীরই মেয়ে হয়ে থাকেন, তবে তথাকথিত অনার্য রাক্ষসের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়ায় তার আর্যজনোচিত শুদ্ধতায় আঘাত লাগতে পারে।
যাই হোক, রাক্ষস পুলোমা এত-শত বোঝেন না। তিনি জানেন–তার সঙ্গে বঞ্চনা করা হয়েছে। সুন্দরী পুলোমার বাবা লুকিয়ে ভৃগুর সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন মেয়ের। রাক্ষস তাতে বিরক্ত, ক্ষুব্ধ। এতদিন পরে তিনি তার পুরাতনী নায়িকাকে খুঁজে পেয়েছেন। রাক্ষসের ঘরে জন্মে এমন শুচিবাইও তার নেই, যাতে শুধু অন্যের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে বলে পূর্ব-পরিচিতা অথবা যৌবন-মুখর দিনের প্রথম চাওয়া রমণীটিকে ছেড়ে দেবেন তিনি। রাক্ষস ভৃগুপত্নীকে অপহরণ করার মতলব করল।
ভৃগু যখন স্নানে গেছেন, তখনও তার ঘরে পবিত্র হোমাগ্নি জ্বলছিল। নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের ঘরে যজ্ঞের আগুন কখনও নির্বাপিত হয় না। ঘরের মধ্যে প্রতিনিয়ত যে গার্হপত্য অগ্নি জ্বলছে, সেই আগুন থেকে আগুন নিয়েই ব্রাহ্মণের অন্য যজ্ঞ-প্রক্রিয়া চলে। ভৃগুপত্নীকে হরণ করার আগে সেই পবিত্র আগুনের দিকে রাক্ষসের চোখ পড়ল। আর্য-গোষ্ঠীর চরম বিশ্বাসের প্রতীক এই আগুনকেই সাক্ষী মানলে রাক্ষস। বললেন,-সত্যি করে বলো তো তুমি, এই সুন্দরী পুলোমা কার বউ?
রাক্ষস রীতিমতো বৈদিক পদ্ধতিতে অগ্নিকে স্তুতি করে বললন-তোমাকে না সবাই দেবতাদের মুখ বলে ডাকে? তা সেই মুখে সত্যি করে বলতো- পুলোমা আসলে কার বউ? আমিই তো তাকে প্রথম আমার স্ত্রীরূপে বরণ করেছিলাম–ময়া হীয়ং বৃতা পূর্বং ভার্যার্থে বরবর্ণিনী? কিন্তু তারপর? এই রমণীর পিতা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে আমাকে বঞ্চিত করে এঁকে ভৃগুর হাতে সম্প্রদান করেছেন। পুলোমা অগ্নিকে অনুনয় করে বললেন, আচ্ছা তুমিই বলো আগুন, কাজটা কি ঠিক হল? আচ্ছা, সে যদি বা লুকিয়ে চুরিয়ে কোনও চক্রান্তে ভৃগুর স্ত্রী হয়েও থাকে, সেয়ং যদি বরাবরাহা ভৃগোর্ভার্যা রহোগ, তথাপি ন্যায়ত সে আমারই স্ত্রী কি না–তুমিই সত্যি করে বল। সেই যেদিন থেকে এর বাবা অন্যের হাতে দিয়ে দিয়েছেন আমারই বরণ করা বধূকে, সেদিন থেকে মনে আমার আগুন জ্বলছে–প্ৰদহন্নিব তিষ্ঠতি।
