দেশের রাজার এমন একাগ্র মনের স্পর্শ সদোপম্পৃশতস্তস্য তরঙ্গ-ভঙ্গ-শোভিনী কোন নদী-রমণী সইতে পারে? রাজা দেবাবুধের সর্বগুণসম্পন্ন পুত্রের জন্ম দেবার জন্য পর্ণাশা নিজেই গর্ভধারণ করবেন বলে স্থির করলেন। কুমারীর বেশে সুন্দরী নদী-রমণী পর্ণাশা রাজার কাছে গিয়ে তাকে কামনা করলেন। রাজা দেবাবৃধও তাকে দেখে মোহিত হলেন-বরয়ামাস নৃপতিং তামিয়েষ চ প্রভুঃ।
পর্ণাশা গর্ভে ল্গযে মহান পুত্রের জন্ম হল- সেটা আমাদের কাছে বড় কথা নয়। বড় কথা হল- নদীর এই রমণীরূপ ধারণ। যদি অলৌকিকতায় বিশ্বাস করেন, তো ঠিক আছে। কিন্তু আপনি যদি আমারই মতো কুতার্কিক হন, তাহলে একটা কথা বলার আছে। আমাদের ধারণা পুরাণে-ইতিহাসে নদীর রমণীরূপ ধারণ করার মধ্যে একটা বিশেষ তাৎপর্য আছে। এইসব ক্ষেত্রে অজ্ঞাতকুলশীলা কোনও সুন্দরী রমণীই এই তাৎপর্যের বিষয়। নদীর জলস্পর্শ করে বসে থাকা অথবা নদীর ধারে বসে আছেন রাজা, আর ঠিক এই সময়ে সুন্দরী রমণীর রূপ পরিগ্রহ করে নদী এসে রাজার পাণি প্রার্থনা করছেন- এর একটাই মানে। এমনই এক সুন্দরীর সঙ্গে রাজার দেখা হয়েছে যার জাতি-কুল-মান জানা নেই অথচ রমণী সুন্দরী। মোহিত রাজার তাকে প্রত্যাখ্যান করার উপায় নেই। আর রমণীর নাম নদীর নামের সঙ্গে মিলিয়ে পর্ণাশা হতেই পারে অথবা হতেই পারে গঙ্গা।
হস্তিনাপুরের রাজা প্রতীপ। ভরত-কুরুবংশের শেষ জাতক। তিনি এই মুহূর্তে বসে আছেন গঙ্গাদ্বারে গঙ্গার ধারে। মন্ত্র জপ করছেন, মান-আহ্নিক করছেন আর গঙ্গার শোভা দেখছেন–নিষসাদ সমা বীৰ্গন্ধদ্বারগতো জপন। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে– মহারাজ প্রতীপ এখন রাজধানীতে নেই। তিনি গঙ্গার তীরবর্তী নির্জন কোন প্রদেশে এসে অস্থায়ী বাসা বেঁধেছেন এবং সেখানে আছেনও বহুকাল–সমা বহ্ববীঃ। এই সময়েই একদিন গঙ্গা নদীরূপিণী গঙ্গা রাজার রূপে-গুণে মুগ্ধ হয়ে মনোহরা রমণীর রূপ ধারণ করে উঠে এলেন নদীর মধ্য থেকে উত্তৰ্য্য সলিলাত্তস্মাল ফলাভনীয়তমাকৃতিঃ।
সংস্কৃত কাব্য এবং অলংকারগ্রন্থগুলিতে নদীর সঙ্গে রমণীদেহের তুলনা করে মহাকবিরা অতি উপভোগ্য রসসৃষ্টি করেছেন নানা বিভঙ্গে রমণীর চলা-হাসা এবং নৃত্যের সঙ্গে নদীর সাযুজ্য কল্পনা করে মহাকবিরা শেষ পর্যন্ত নদীর তরঙ্গকে রমণীর উচ্ছল চুম্বনদায়ী ওষ্ঠের সঙ্গেও তুলনা করেছেন। আর কালিদাস তো উপলব্যথিত গতি বেত্রবতীর নাভিদেশ পর্যন্ত আবিষ্কার করে মেঘদূতের পাঠককে এক কল্পনার জগতে পৌঁছে দিয়েছেন। কাজেই মনোহারিণী চঞ্চলা নদীর সঙ্গে উচ্ছল স্বভাবের রমণীর কোনও তফাত নেই। গঙ্গা তো এতই উচ্ছল যে, তিনি বিনাবাক্যে একটুও ভণিতা না করে মহারাজ প্রতীপের শালবৃক্ষসদৃশ দক্ষিণ উরুর ওপর এসে বসে পড়লেন–দক্ষিণং শালসঙ্কাশম্ উরুং ভেজে শুভাননা।
মহারাজ প্রতীপ একটু গম্ভীর হলেন। আমাদের ধারণা তাঁর একটু বয়সও হয়েছে। একটি যুবক পুরুষের মতো রমণীর স্পর্শে তিনি বিচলিত হলেন না। বললেন– কল্যাণী। (সম্বোধনটা খেয়াল করবেন) কী করতে পারি তোমার জন্য, কী তোমার ইচ্ছে, খুলে বলো দেখি- করোমি কিন্তু কল্যাণি প্রিয়ং যত্তেভিকাক্ষিত। রমণী নির্দ্বিধায় জবাব দিলেন তুমি কুরুবংশের শ্রেষ্ঠ পুরুষ। আমি তোমাকে আমার ঈপ্সিততম নায়ক হিসেবে পেতে চাই। আর তুমি তো জান কোনও রমণী যদি নিজেই মিলনেচ্ছা প্রকাশ করে, তাকে অবহেলা করাটা কত খারাপ কাজ। প্রতীপ বললেন- তোমাকে ভাল লাগছে বলেই আমি পরস্ত্রীর প্রতি আসক্ত হব, অসবর্ণা এক রমণীকে বিবাহ করে বসব– এ আমি করতে পারি না। তাতে অধর্ম হবে, কল্যাণী ন চাসবর্ণাং কল্যাণি ধৰ্মং তদ্ধি ব্রতং চ মে।
মাত্র দুটি শব্দ, মহারাজ প্রতীপের প্রত্যাখ্যানের মধ্যে মাত্র দুটি শব্দ ‘পরস্ত্রী’ এবং ‘অসবর্ণা’– এই শব্দ দুটো শুনলেই স্পষ্ট বোঝা যায় এই গঙ্গা কোনও নদীও নন, কোনও অলৌকিক দেবীও নন। রমণী সাধারণী, জাতি-কুলের মাত্রায় তার কিছু হীনতাও আছে যা হস্তিনাপুরের রাজা কুরুবংশের অলংকার মহারাজ প্রতীপকে মানায় না। তাছাড়া গৃহে তার স্ত্রী বর্তমান। পরম দয়ালু শিবি রাজা যে বংশে জন্মেছিলেন, সেই বংশের মেয়ে সুনন্দার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে কতকাল। আজকে তার এই প্রৌঢ় বয়সে অজ্ঞাতকুলশীলা এক নারী হঠাৎ করে তার দক্ষিণ উরু স্পর্শ করে বিবাহের প্রস্তাব করায় প্রতীপ একেবারে অপ্রতিভ হয়ে গেলেন। তার প্রত্যাখ্যানের উপায় এখানে ওই দুটি মাত্র শব্দ– ‘পরস্ত্রী’ এবং ‘অসবর্ণা’। পরস্ত্রী বলতে পরের বউ না বুঝিয়ে পরের মেয়েও বোঝাতে পারে–এমন কথা আমরা বৈষ্ণব রসশাস্ত্রে পড়েছি। কিন্তু এখানে পরস্ত্রী বলতে প্রতীপ যদি পরের মেয়েও বোঝেন, সেখানেও কার না কার মেয়ে’- এমন একটা তাচ্ছিল্য প্রকাশিত হয়েছে, আর সেটা খুব ভালই প্রমাণ হয়ে যায় অসবর্ণা কথাটার মধ্যেই।
রাজার মুখে এমন প্রত্যাখ্যান শুনেই রমণী সপ্রতিভভাবে জবাব দিলেন-কেন আমি কি দেখতে এতই খারাপ! কোনও দুর্লক্ষণও তো নেই আমার শরীরে–উঁচু কপাল, কী চুল নেই, কী গায়ের লোমগুলো পুরুষ মানুষের মতো এসব তো আমার কিছুই নেই। আর অসবর্ণা বলে আমি কি অগম্যা হলাম নাকি? অমন কথা বোলো না, রাজা- নাশ্রেয়স্যাস্মি নাগম্যান বক্তব্যা চ কহিচিৎ। জেনে রেখ– আমি রীতিমত স্বর্গীয়া এক রমণী, আর পরস্ত্রী কিসের, আমি রীতিমত কুমারী। সবচেয়ে বড় কথা—আমি তোমাকে চাইছি, অতএব তুমিও আমাকে চাইবে– ভজন্তীং ভজ মাং রাজন্ দিব্যাং কন্যাং বরষ্ক্রিয়ম্।
