ইক্ষবাকুবংশের পরম কীর্তিমান পুরুষ রামচন্দ্র যখন লীলা সম্বরণ করেন, তখন অযোধ্যার মূল রাজ্যভূমির উত্তরাধিকার পান তারই পুত্র কুশ। শত্রুঘ্নের দুই পুত্র সুবাহু এবং শূরসেন রাজ্য পান পিতার অধিকৃত মথুরায়–সুবাহুঃ শূরসেনশ্চ শত্রুঘুসাহিতাবুভৌ। পালয়ামাসতুঃ সুতৌ বৈদেহৌ মথুরাং পুরীম্। শত্রুয়ের পুত্র শূরসেনের নাম থেকেই হয়তো মথুরা অঞ্চলের নাম। হয় শূরসেন, মেগাস্থিনিসের ইন্ডিকায় যার পরিচয় শূরসেনাই।
পণ্ডিতেরা মধুপুরীতে শত্রুয়ের অধিকার লক্ষ্য করে যে অনুমানই করুন, আমরা ইতিহাস-পুরাণে কোথাও এমন খবর পাইনি যে, মধুরপুত্র সত্ত্বা একবারও তার রাজ্য হারিয়েছিলেন; অথবা কোনও সময়ে বা তাঁকে রাজ্য পুনরুদ্ধারও করতেও হয়েছে–সে খবরও আমরা পাইনি। পুনশ্চ যদুর্বংশীয় মধুর সঙ্গে যেহেতু একজন ইক্ষাকুবংশীয়ার পরিণয় ঘটেছিল; সেই হেতু তারই পুত্র সত্ত্বানের রাজ্য হারানোর কথাটা মোটেই অনুমানযোগ্য নয়, আদরণীয়ও নয়। আমরা তাই কার্তবীর্য অর্জুনের দুই পুত্র শূর এবং শূরসেনের নামেই শূরসেন অঞ্চলের প্রসিদ্ধি অনুমান করি এবং মধুর নাম থেকেই মধুরা বা মথুরা। শত্রুঘ্ন হয়তো মথুরার। নিকটবর্তী অঞ্চলে লবন নামে কোনও অনার্য গোষ্ঠীর নেতাকে পরাভূত করেছিলেন এবং বন কেটে তাকে নতুন বসতি গড়তে হয়েছিল। অন্যথায় উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে লবনকে কোনওভাবেই সত্ত্বা বলে প্রমাণ করা বড়ই কঠিন।
যাই হোক, মথুরাপুরীতে এই যে সত্ত্বা বা সত্ত্বত নামে যে যাদব রাজার নাম পেলাম, ইনি একদিক দিয়ে যযাতি বা অজমীঢ়ের মতোই বিখ্যাত। কারণ এরই পুত্র-পরম্পরায় পরবর্তীকালে মহামতি কৃষ্ণ, অক্রুর অথবা মহাভারত-খ্যাত কৃতবর্মা, সত্যভামা-এমন কি কংসও জন্মাবেন। কৃষ্ণকে ডাকা হবে সত্ত্বতবংশের স্বামী বা শ্রেষ্ঠ পুরুষ হিসেবে-ভগবান্ সাত্ত্বতাং পতিঃ।
সত্ত্বান বা সত্ত্বতের সঙ্গে কোশল দেশের এক রমণীর বিবাহ হয়, যার নাম আমরা জানি না। তাকে শুধু কৌশল্যা বলেই জানি। কৌশল্যার গর্ভে সত্ত্বতের সাত ছেলে–ভজিন, ভজমান, দিব্য, অন্ধক, দেবাবৃধ, মহাভোজ এবং বৃষ্ণি। এদের মধ্যে সবাই যে খুব গুরুত্বপূর্ণ, তা নয়। তবে আগেই আমরা জানিয়েছি যে, সত্ত্বতের দ্বিতীয় পুত্র ভজমানের সঙ্গে পাঞ্চাল-রাজ সৃঞ্জয়ের দুই মেয়ে বাহ্যকা এবং উপবাহ্যকার বিয়ে হয়। কিন্তু তাদের পুত্রেরা খুব একটা কেউ বিখ্যাত নন। সত্ত্বতের এই সাত ছেলের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেন অন্ধক এবং বৃষ্ণি। কৃষ্ণকে পরে অন্ধক এবং বৃষ্ণির উত্তরপুরুষরূপে কল্পনা করা হবে। সত্ত্বত, বৃষ্টি, অন্ধক–এঁরা সবাই কিন্তু সমভাবে ভোজ নামে পরিচিত।
পুরাণকারেরা অন্ধক-বৃষ্ণির সন্ধান পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই খুব তাড়াতাড়ি কৃষ্ণের পিতামহ, শ্বশুর এবং মাতামহের কাছাকাছি নামগুলিতে চলে এসেছেন কিন্তু অন্ধক-বৃষ্ণির বড় দাদা ভজমান পাঞ্চালরাজ সৃঞ্জয়ের সমসাময়িক হওয়ায় আমরা বুঝতে পারি–বৃষ্ণি-অন্ধকদের বংশতালিকায় মাঝে মাঝে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। সে যাই হোক, আমরা তো আর নতুন নাম সৃষ্টি করে সে তালিকা পূরণ করতে পারব না। তাই অন্ধক-বৃষ্ণিবংশের দু-চারজন বিখ্যাত পুরুষের নাম করেই আমরা সেই জায়গায় চলে আসব যেখানে সমান্তরালভাবে কুরুবংশের শান্তনুর পিতা মহারাজ প্রতীপকে পাব অথবা পাঞ্চালবংশে দ্রুপদপিতা মহারাজ পৃষতকে পাব।
সাত্ত্বতবংশে অন্ধকের বিখ্যাত পুত্রটির নাম হল কুকুর। ভগবান কৃষ্ণকে মহাভারতের মধ্যে সত্ত্বত-অন্ধকের সঙ্গে একযোগে কুকুর-বংশীয় বলেও ডাকা হয়েছে। এই কুকুর থেকে পৌরাণিক মতে আট-দশ পুরুষ পরে অথবা আধুনিক গবেষকের মতে অন্তত পনের/সোল পুরুষ পরে জন্মান অভিজিৎ বলে এক রাজা। অভিজিতের একটি কন্যা এবং একটি পুত্র। তাদের নাম আহুক আর আহকী। এই আছকই হলেন মথুরার অত্যাচারী রাজা কংসের পিতামহ। আমরা যেহেতু আহুকের নাম পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পূর্বোক্ত কুরু-পাঞ্চালবংশীয় প্রতীপ এবং পৃষতের সম-সময়ে পৌঁছলাম, তাই এরপর থেকে আমাদের নতুন পর্ব শুরু করতে হবে।
.
৫১.
যাঁরা দিন-রাত ব্যাকরণের কচকচি নিয়ে সময় কাটান, লোকে তাদের রুক্ষ-শুষ্ক মানুষ বলে ভাবেন। কিন্তু পাণিনি-ব্যাকরণের ওপর মহাভাষ্য রচনা করে খ্রিস্টপূর্ব দেড়শ শতাব্দীতে যিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন, সেই পতঞ্জলির রসবোধ নেই– এ কথা বোধ করি কেউ বলবেন না। অব্যয়ীভাব সমাসের একটা উদাহরণ দিতে গিয়ে পতঞ্জলি লিখলেন-অনুগল্পং হস্তিনাপুর। অর্থাৎ গঙ্গার তীরেই হস্তিনাপুর। ইতিহাসের রসবোধ যাদের আছে, তারা বুঝবেন যে, হস্তিনাপুর শহরটা গঙ্গা নদীর সঙ্গে এমনভাবেই জড়িত যে গঙ্গাকে বাদ দিয়ে হস্তিনাপুরের অস্তিত্বই যেন কল্পনা করা যায় না। আর ঠিক এই কারণেই গঙ্গাকে আমরা সুন্দরী এক রমণীর রূপ ধরে হস্তিনাপুরের রাজার কাছে সমাগত দেখতে পাচ্ছি।
মহাকাব্যের ইতিহাসে এমন উদাহরণ কিছু বিচিত্র নয়। জলবাহিনী নদী যে দেশের শোভা এবং শস্য বর্ধন করে সেই দেশের রাজার সঙ্গে তার প্রণয়-পরিণয়ের সম্পর্ক মহাকাব্যে খুব পরিচিত। মথুরা-বৃন্দাবনে যমুনার সঙ্গে কৃষ্ণের সম্পর্কও একই রকম। একটু আগে আমরা যদুবংশীয় সত্ত্বা রাজার কথা বলেছি। তারই এক পুত্র হলেন দেবাবৃধ। তিনি বোধহয় এখনকার রাজস্থানের দেওলি-সওয়াই-মধোপুর অঞ্চলে রাজত্ব করতেন। এইসব জায়গায় তখন যাদবদেরই বাস ছিল। দেবাবুধের রাজ্য ঠিক ঠিক পর্ণাশা নদীর ওপর। পর্ণাশা এখনকার বনসা। হরিবংশে দেখছি দেবাধ সর্বগুণসম্পন্ন একটি পুত্র কামনা করে তপস্যা আরম্ভ করলেন এবং তপস্যার সময় সারাক্ষণ তিনি পর্ণাশা নদীর জল স্পর্শ করে রইলেন- সংযুজ্যাত্মনমেবং তু পর্ণাশায়া জলং শৃশ।
