যাই হোক, জ্যামঘ একবার নিজের রাজ্য ছেড়ে আরও দক্ষিণ দিকে রাজ্যবিস্তারে মন দিলেন। রাজ্য জয়ের পর শত্রু রাজ্যের একটি অতি সুন্দরী কন্যা তার হস্তগত হল। কন্যাটি যে আর্যগোষ্ঠীর কেউ নন, সেটা তার নাম থেকেই বোঝা যায়। কন্যার নাম উপদানবী। জ্যামঘ রাজ্যজয় করে সেই কন্যাকে রথে চড়িয়ে স্বদেশে ফিরলেন বটে, তবে স্ত্রী শৈব্যার সম্মুখীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার চটকা ভেঙে গেল। স্ত্রীর ভয়ে জ্যামঘ বললেন-দেখ, দেখ। তোমার ছেলের বউ নিয়ে এসেছি কেমন, দেখ।
মাথাই নেই তার মাথাব্যথা। রাজার কোনও ছেলেই নেই, তার ছেলের বউ! শৈব্যা বললেন-এই কন্যাটি কার ছেলের বউ, তোমার কি মাথা খারাপ হল–এতচ্ছুত্বাব্রবীদেবী কস্য চেয়ং সুষেতি বৈ। জ্যামঘ জোর দিয়ে বললেন-তোমার যে পুত্র হবে, এ কন্যা তারই বউ হবে। রাজার মনের জোর আর সেই উপদানবী কন্যার ভাগ্য–শেষ পর্যন্ত জ্যামঘর একটি ছেলে হল। রাজা পুত্রের নাম দিলেন বিদর্ভ। হয়তো নতুন যে রাজ্য জয় করেছিলেন জ্যামঘ, সেই রাজ্যের নামেই পুত্রের নাম রাখেন তিনি, নয়তো পুত্রের নামেই সেই নতুন রাজ্যের নাম দেন বিদর্ভ। বিদর্ভের থেকে বয়সে অনেক বড় সেই উপদানবীর সঙ্গেই কিন্তু বিদর্ভের বিয়ে হল এবং তাদের তিনটি পুত্র জন্মাল। তাদের নাম হল ক্ৰথ, কৌশিক এবং লোমপাদ।
আমরা আগেই বলেছি–বিদর্ভ দেশে যাদবদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই হল সেই প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। ভবিষ্যতে বিদর্ভ দেশটাকে আমাদের প্রয়োজন হবে–মহামতি কৃষ্ণ এই রাজ্যে বিবাহ করতে আসবেন, আমরা তাই নগরীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে রাখলাম। বিদর্ভের প্রথম পুত্ৰ ক্ৰথ বোধহয় স্বদেশে অর্থাৎ বিদর্ভেই রাজা হন এবং সেই কারণেই পুরাণাদিতে তাঁকে–কথো বিদর্ভপুত্রস্তু–বলে বিদর্ভেই তার অধিষ্ঠান নির্ণীত হয়েছে। কিন্তু বিদর্ভের দ্বিতীয় পুত্র কৌশিক কৈশিক) বোধহয় অন্য একটি রাজ্য জয় করেন এবং নিজ পুত্রের নামে সেই দেশের নাম রাখেন চিদি। এই চিদি রাজ্যে পরবর্তীকালে শিশুপাল জন্মাবেন এবং বিদর্ভনন্দিনী রুক্মিণীর পাণিগ্রহণ করার জন্য কৃষ্ণের সঙ্গে বিবাদে লিপ্ত হবেন। ক্ৰথ এবং কৌশিকের অনেক অনেক পুরুষ পরে কৃষ্ণের জন্ম হবে ঠিকই, কিন্তু এই দুই রাজা বিদর্ভ রাজ্য এবং চেদি রাজ্যের প্রতিষ্ঠার কারণেই এত বিখ্যাত হয়েছিলেন যে, চৈতন্যদেবের পরম পার্ষদ রূপ গোস্বামী তার ললিতমা নামক নাটকে রুক্মিনীর বিবাহের প্রসঙ্গে এই ক্ৰথ-কৌশিককে চরিত্র হিসাবে আমদানি করেছেন। ইতিহাসের ‘অ্যানাক্রনিজম’ দেশকালের কতটা বিপর্যয় ঘটাতে পারে, এটা তার একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
এই জ্যামঘর কথা বললাম, তার সাত-আট পুরুষ পরেই যদুবংশে মধু নামে এক রাজার উৎপত্তি ঘটে এবং এই মধু নামের রহস্য থেকেই মধুরা বা মথুরা নামের উৎপত্তি। পণ্ডিতেরা সন্দেহ করেন যে, ইক্ষাকু বংশের নরচন্দ্রমা রামচন্দ্র যখন অযযাধ্যায় রাজত্ব করছেন, তখন ভীম সাত রাজা হয়েছেন যাদবদের। রামায়ণ থেকে আরম্ভ করে অনেক পুরাণেই দেখা যাবে–রামচন্দ্রের ভাই শত্রুঘ্ন দিগবিজয় করার সময় মাধব লবণকে বধ করে মধুবনে গিয়ে মথুরা পুরী স্থাপন করেন-মাধবং লবণং হত্বা গত্বা মধুবনঞ্চ তৎ।
‘মাধব লবণ’ বলতে কেউ বলেছেন–মধুর ছেলে লবণ, আবার কোনও কোনও পুরাণ-কাহিনীতে, এমন কি রামায়ণেও লবণ একজন দানব অথবা দৈত্য। হরিবংশের বক্তব্য-যমুনার তীরে বহুজনপদযুক্তা মথুরা-নগরীর মধ্যেই মধুবন নামে এক ভীষণ বন ছিল এবং লবণ নামে এক দানব বাস করত সেই মহাবনে–ঘোরং মধুবনং নাম যত্রাসৌ ন্যবসৎ পুরা। সন্দেহ নেই–মহাবন হলেই সেখানে দৈত্য-দানবের অধিবাস, অথবা কেউ যদি দানব নামেই পরিচিত হন তবে তাকে বনেই থাকতে হবে–এই পুরা-কল্পনা থেকেই লবণ আর মধুবনের সৃষ্টি। তবে পণ্ডিতরা মনে করেন–অযোধ্যায় রামচন্দ্র যখন রাজত্ব করছেন, তখন মথুরা অঞ্চলে হয়তো তখনও মথুরার নাম মথুরা হয়নি-মথুরা অঞ্চলে রাজত্ব করছেন ভীম সাদ্ভূত, যাঁকে মধুবংশীয় মাধব বলা হত। মধু নামে একজন যাদব রাজা অবশ্যই ছিলেন এবং তিনি যদুবংশজাত সত্ত্বা রাজার উধ্ব-পুরুষ ছিলেন। হরিবংশ জানিয়েছে–মধু রাজা এতই ভাল মানুষ ছিলেন এবং তিনি এমনই মিষ্টি কথা বলতেন যে, পিতৃপরম্পরায় তার নাম দেবক্ষত্রি হওয়া সত্ত্বেও লোকে তাকে মধু বলেই ডাকত। হয়তো এত জনপ্রিয় ছিলেন বলেই তার নামে যাদবরা একসময় মাধব নামে পরিচিত হতে থাকবেন–মধুনাং বংশকৃ রাজা মধু-মধুরবাগপি–এবং পরবর্তীকালে এই বংশের অলংকার হিসেবেই কৃষ্ণের এক নাম হয়তো মাধব।
আমাদের ধারণা–জনপ্রিয়তার জন্য যদুবংশীয় দেবক্ষত্রির নাম যেমন মধু হয়ে গেল, তেমনই নিজের নামেই তিনি একটি অসাধারণ সুন্দর কাননভূমির নাম রেখেছিলেন মধুবন। রামায়ণে কিংবা অন্যান্য পুরাণে মাধব লবণ–অর্থাৎ মধুবংশীয় লবণ নামে যে তথাকথিত দানবের নাম পাচ্ছি-সে একটা কথার কথা। বাস্তবে মধুবংশীয়দের মধ্যে লবণ নামে কেউ ছিলেন না। লক্ষণীয় বিষয় হল–আমাদের পূর্বোক্ত মধু অযোধ্যার ইক্ষাকুবংশীয়া একটি রমণীকেই বিবাহ করেছিলেন এবং তার পুত্রের নাম সত্ত্বান্–ঐক্ষাকী চাভবদৃভার্যা সাংস্তস্যামজায়ত। সত্ত্বা এতই বিখ্যাত এবং এতই তিনি গুণবান যে তার নামেই যদুবংশের ধারা পুনর্গঠিক হয় সাত্ত্বত-বংশ নামে। পণ্ডিতেরা সন্দেহ করেন–মাধব লবণ নয়, মাধব অর্থাৎ মধুর পুত্র সত্ত্বাই কোনও সময় রামচন্দ্রের ছোটভাই শত্রুঘ্ন কর্তৃক পরাজিত হন এবং তিনিই মধুবন কাটিয়ে নতুন একটি নগরী প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছা করেন–ছিত্ত্বা বনং তৎ সৌমিত্রি নিবেশং সোভরোচয়ৎ। এই উচ্ছিন্ন বনভূমিতেই শেষ পর্যন্ত মথুরা নগরীর প্রতিষ্ঠা করেন রাম-কনিষ্ঠ শয়তস্মিন মধুবন-স্থানে মথুরা নাম সা পুরী। মথুরাপুরী পূর্বে ‘মধুরা’ নামেই বিখ্যাত ছিল কিন্তু লোকমুখের অপভ্রংশে মধুর স্মৃতি লুপ্ত হয়ে মধুরা মথুরায় পরিণত হয়।
