এটা তো আমরা আগেই দেখেছি যে, সম্বরণ রাজা পুত্রের সঙ্গে হস্তিনাপুর পুনরুদ্ধার করার সময়েই পঞ্চাল অধিকার করে ফেলেছিলেন। বৌদ্ধগ্রন্থ সোমনস জাতকেও উত্তর-পাঞ্চল নগরকে কুরুরাষ্ট্রের (কুরুঠি) মধ্যেই গণ্য করা হয়েছে। হয়তো পাঞ্চাল রাজ্যে কুরুদের এই অধিকার চলেছিল জন্তু থেকে আরম্ভ করে কনিষ্ঠ সেই পৃষত পর্যন্ত। পৃষত এই জন্যই কনিষ্ঠ, যেহেতু তিনিই হয়তো পাঞ্চাল রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং তাও হয়তো কুরুবংশের অখ্যাত রাজাদের আমলে।
পাঞ্চালবংশে জন্তু থেকে পৃষত পর্যন্ত যেমন একটা শূন্যতা আছে একইভাবে কুরুবংশেও মহারাজ কুরুর পরে কতগুলি অখ্যাত রাজা আছেন। সেইসব রাজার সংখ্যা পুরাণ এবং মহাভারতের তালিকা অনুযায়ী অন্তত দশ থেকে পনেরজন। কুরুবংশের এই অখ্যাত রাজাদের নাম এখানে আমরা স্মরণ করছি না, কিন্তু সঙ্গে এটাও আমাদের বলতে হবে যে, এঁদের আমলে হস্তিনাপুর, কুরুজাঙ্গল বা কুরুক্ষেত্র– কোনটাই হাতছাড়া হয়ে যায়নি। কিন্তু এই বংশে আর বিশিষ্ট কোনও রাজা না জন্মানোর ফলে কুরুর নামে এই বংশধারা চলছিল। কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধ শেষ হবার পরে পরীক্ষিৎ, জনমেজয়–এইসব রাজার নাম আপনারা শুনতে পাবেন। কিন্তু মনে রাখবেন– সমনামের আরও কয়েকজন রাজা মহারাজ কুরুর পর হস্তিনাপুর শাসন করে গেছেন। এদের মধ্যে একজন–ভীমসেনও আছেন। লক্ষণীয়, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর অভিমন্যুর পুত্র পরীক্ষিতের নামকরণ করা হয়েছিল ক্ষীণ বা পরিক্ষীণ বংশের উত্তরাধিকারী রক্ষার অর্থ-কল্পনায়। আমাদের জিজ্ঞাসা-মহারাজ কুরুর অব্যবহিত পরেই যে পরীক্ষিৎকে আমরা পাই, তিনি কি ভরত অথবা কুরু মহারাজের সুনাম বজায় রাখতে পারেননি বলেই পরীক্ষিৎ নামে অভিহিত হয়েছিলেন? যাই হোক, কুরুর পর পারীক্ষিৎ-জনমেজয়, সার্বভৌম-মহাভৌম, দেবাতিথি-দিলীপদের মতো অখ্যাত কুরুবংশীয়দের একটা ধারা শেষ হবার পরেই আমরা যাকে পাচ্ছি, তিনি হলেন মহারাজ প্রতীপ–যিনি মহামতি ভীষ্মের পিতামহ।
পাঞ্চালরাজ্যে মহারাজ জন্তুর অন্তত দশ-বার পুরুষ পরে আমরা দ্রুপদপিতা পৃষতকে অধিষ্ঠিত দেখেছি। সমান্তরালভাবে কুরুরাজ্যের রাজধানী হস্তিনাপুরে মহারাজ প্রতীপকেও আমরা অধিষ্ঠিত দেখলাম। কিন্তু এবারে আমাদের একটু মথুরায় যেতে হয়। আমরা যাদব-হৈয়েদের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছি। মহারাজ যযাতির কনিষ্ঠ পুত্র পুরুর গৌরবে এতক্ষণ ধরে শুধু পৌরববংশের মূল ধারায় দুষ্যন্ত, ভরত, সম্বরণ, কুরু–এঁদেরই ইতিহাস কীর্তন করলাম। কিন্তু যাদবদের কথা আর বলাই হয়নি। যাদবদের কথা বলতে গিয়ে তাদের মধ্যে বিক্রত-কীর্তি শশবিন্দু অথবা কার্তবীর্য-অর্জুনের কথা বলেছি, তালজ অথবা বীতিহোত্র (বীতহব্য) কথাও বলেছি। কিন্তু খুব সংক্ষেপে বললেও আরও দু-চারজনের কথা না বললে কুরু-পাঞ্চালদের সঙ্গে তাদের ‘ইন্টার্যাকশন’ দেখাতে পারব না–এটা একটা কথা। দ্বিতীয় কথা, যাদবরা দু-চারটে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিজেদের নামে বা পুত্রের নামে-সেগুলো ঐতিহাসিক দিক দিয়ে ভীষণ মূল্যবান।
আমরা এর আগে যাদবদের সাধারণ আবাসস্থান মথুরার নাম করেছি, শূরসেনের নামও করেছি। কার্তবীর্য-অর্জুনের দুটি পুত্রের নাম শূর এবং শূরসেন হওয়ায় আমরা অনুমান করেছিলাম যে, তাঁর নাম থেকেই হয়ত শূরসেন নামে জায়গাটার উৎপত্তি এবং মেগাস্থিনিস হয়তো শূরসেনাই’ বলতে ওই জায়গাটাই বুঝিয়েছেন। এখন কিন্তু আমরা একটা বিকল্প সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করব–যাতে মথুরা এবং শূরসেনের নামকরণের নতুন ইতিহাস জানা যেতে পারে। তবে মথুরার সঙ্গে সঙ্গে আরও দুটো দেশের জন্মকথা আমাদের বলে নিতে হবে কেন না ওই দেশ দুটিও পরবর্তীকালে রাজনৈতিক দিক দিয়ে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আমরা আবার সেই যযাতিপুত্র যদু থেকে আরম্ভ করছি না। শুধু এইটুকু বলি–যদুর পুত্র ক্রোঙ্গুর বংশে শশবিন্দু যেমন জন্মেছিলেন, তেমনই বহু পরবর্তীকালে সেই বংশে ভগবান বলে চিহ্নিত নামক বিখ্যাত পুরুষটিও জন্মেছিলেন। আমরা এই বংশের মাঝামাঝি একটা জায়গায় জ্যামঘ বলে এক রাজার নাম পাব। জ্যামঘ ছিলেন পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে মধ্যম। তার দুই দাদার প্রথমজন রাজা হয়ে তাকে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দেন। জ্যামঘ বনে চলে যেতে বাধ্য হন এবং একটি আশ্রমে বাস করতে আরম্ভ করেন–তাভ্যাং ব্রাজিতো রাজ্যাজ-জ্যামঘো’বসদাশ্রমে। বনবাসী ব্রাহ্মণেরা জ্যামঘকে নানা পৌরুষের কার্যে উৎসাহ দিতে থাকেন। নিজের শক্তিতে বিশ্বস্ত হয়ে জ্যামঘ একটি নতুন রাজ্য জয় করেন নর্মদা নদী পেরিয়ে এই রাজ্য। তার নাম মৃত্তিকাবতী–নর্মদাকুলমেকাকী নগরীং মৃত্তিকাবতীম।
নর্মদার পাড়ে মৃত্তিকাবতী নগরীর মধ্যে আবার একটা রাজপুরী তৈরি করলেন জ্যামঘ। তার নাম দিলেন শুক্তিমতী। ভালই চলছিল। জ্যামঘের স্ত্রীর নাম ছিল শৈব্যা, কোনও পুরাণ-মতে চিত্রা। এই শৈব্যার গায়ে যেমন শক্তি ছিল, তেমনই ছিল তার ব্যক্তিত্ব। আর বয়সও বোধ হয় তার জ্যামঘের থেকে বেশি ছিল–শৈব্যা বলবতী ভূশম্শৈব্যা পরিণতা সতী। পত্নীর ভয়ে জ্যামঘ সেকালের স্বর্ণযুগেও দ্বিতীয় একটি বিবাহ করতে পারেননি; এমন কি তার একটিও পুত্র ছিল না, কিন্তু সেই বাহানাতেও রাজা দ্বিতীয়বার বিবাহ করতে পারেননি–অপুত্রোপি স বৈ রাজা ভার্যামন্যাং ন বিন্দতি।
