পাঞ্চালরাজ সোমক বড় অসহায় বোধ করছিলেন। একমাত্র পুত্র সামান্য পিঁপড়ের কামড় খেলেই যদি তার একশ জননী মরণ-চিৎকার করে ওঠেন, তবে ক্ষত্রিয়ের ছেলে বড় হবে কী করে? অনেক অনুনয়-বিনয় করে ঋত্বি-পুরোহিতকে সোমক বললেন–আপনি এমন একটা ব্যবস্থা করুন যাতে আমার একটি পুত্র হয়। ভাল কাজ, মন্দ কাজ, এমন কি সে কাজ অসাধ্য হলেও আমি করব–মহতা লঘুনা বাপি কর্মণা দুস্করণে,বা। ঋত্বিক বললেন–উপায় যে একটা নেই, তা নয়। তবে তুমি কি সেটা পারবে? সোমক বললেন-কার্য হোক, অকার্য হোক, আপনি বলুন, আমি নিশ্চয় পারব। আপনি ধরে নিন–সে কাজ হয়েই গেছে–কৃতমেবেতি তদ্বিদ্ধি ভগবন্ প্রব্রবীতু মে!
রাজার আগ্রহ দেখে ঋত্বিক বললেন–যেভাবে আমরা পশুমেধ যজ্ঞ করি, সেইভাবে আপনার ওই একমাত্র পুত্রকেই যজ্ঞের পশু হিসেবে আমরা ব্যবহার করব। পুত্রটিকে বলি দিয়ে তার মেদ-পা যজ্ঞে আহুতি দিতে হবে। তখন প্রজ্জ্বলিত হোমাগ্নি থেকে ধোঁয়া উঠতে থাকবে। একশ রানী সেই ধুমগন্ধ আঘ্রাণ করে শতপুত্রের অধিকারী হবেন-বপায়াং হয়ামানাং ধূমমাঘ্রায় মাতরঃ। ঋত্বিকরা বলে দিলেন-আপনার যে পুত্রটি আছে, সেই পুত্রই শত পুত্র হয়ে জন্মাবে। রাজা সম্মত হয়ে বললেন–আপনারা যজ্ঞ আরম্ভ করুন, আমি প্রস্তুত।
যজ্ঞ আরম্ভ হল। রানীরা তো কেউ সেই পুত্রকে ছাড়বেন না। তারা যদি পুত্রের ডান হাত ধরে টানেন, তো ঋত্বিকরা ছেলের বাঁ হাত ধরে টানেন যজ্ঞস্থলের দিকে–
রুদন্ত্যঃ করুশং চাপি গৃহীত্ব দক্ষিণে করে।
সব্যে পাণৌ গৃহীত্বা তু যাজকোপি স্ম কৰ্ষতি।
রানীমাদের করুণ কান্না তুচ্ছ করেও ঋত্বিক-যাজকরা রাজার একমাত্র পুত্রকে বলি দিয়ে যজ্ঞে আহুতি দিলেন। যজ্ঞের উৰ্গীৰ্ণ ধূম আঘ্রাণ করে মুহূর্তের মধ্যে তারা অজ্ঞান হয়ে পড়লেন এবং তাদের প্রত্যেকের গর্ভসঞ্চার হল। গর্ভের কাল সম্পূর্ণ হলে তাদের প্রত্যেকের একটি করে পুত্র হল, যদিও পূর্বের সেই রাজপুত্র তাঁরই জননীর গর্ভে পুনরায় জন্ম নিলেন এবং তার নাম হল জন্তু। একশ রানীমা তাদের নিজের কোলে পুত্র লাভ করলেও জন্তুর ওপর তাদের আগের ভালবাসাই ছিল, সেই ছেলেটি তাদের নিজেদের ছেলের থেকেও প্রিয়তর–স তাসামিষ্ট এবাসীৎ ন তথা তে নিজাঃ সুতাঃ।
মহাভারতে দেখছি–সোমকের যখন একটি পুত্র ছিল তখনও তার নাম ছিল জন্তু। আমাদের তা মনে হয় না। সোমকের একমাত্র পুত্রকে পশুর মতো বলি দিয়ে পুত্র লাভ করেছিলেন বলেই পরে তার নাম হয় জন্তু। ঋত্বিক পূর্বে বলেছিলেন–যজস্ব জন্তুনা রাজংস্কং ময়া বিততে ক্ৰতৌ। নীলকণ্ঠ লিখেছেন–জনা পশুভূতেন–অর্থাৎ ছেলেটিকে জন্তুর মতো বলি দিতে হবে। আমাদের ধারণা–ছেলেটির সঙ্গে যজ্ঞীয় পশুর মতো ব্যবহার করা হয়েছিল বলেই রাজার ওই পুত্রের নাম অন্তু। আমরা অবশ্য অতিলৌকিকতার মধ্যে না গিয়ে বলতে চাই–পুত্রহীন মায়েরা যা করেন, সেইভাবেই একটি জন্তুর সঙ্গেই রানীমায়েরা পুত্র ব্যবহার করতেন। নইলে একটি রাজপুত্রের নাম ‘জন্তু’ হওয়া স্বাভাবিক নয়। যজ্ঞ করার জন্য হয়তো পুত্রস্নেহে পালিত সেই জন্তুটিকে বলি দেওয়া হয়েছিল। প্রথম যে রানী সেই জন্তুটিকে লালন-পালন করেছিলেন, তার পুত্রটি হয়তো জন্তু নামে পরিচিত হন এবং তিনি সব রানীর প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন।
আমাদের ধারণা–সোমক বৃদ্ধ বয়সে অনেক যাগ-যজ্ঞ এবং পশুমেধ যজ্ঞ করে শেষ পর্যন্ত অনেক পুত্র লাভ করেন। ক্ষীণ পাঞ্চাল বংশে এত পুত্রের জনক হয়েই সোমক রাজা বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। তবে এতক্ষণ জন্তুর সম্বন্ধে যা বললাম, তা সবই মহাভারতের বৃত্তান্ত অনুসারে। বস্তুত পুরাণগুলির মধ্যে জন্তুকে নিয়ে এত আদিখ্যেতা নেই। বায়ু, মৎস্য অথবা খিল-হরিবংশে কোথাও আমরা এমন খবর পাইনি যে সোমক রাজার পুত্র জন্তুকে বলি দিয়ে তার একশ ছেলে হয়েছিল। যা পাই, তা হল–সোমকের একটি পুত্র এবং তার নাম জন্তু। জন্তু মারা গেলে সোমকের একশটি পুত্র হয়–সোমকত্স্য সুতো জন্তু হতে তস্মিন্ শতং বভৌ। এই ঘটনা থেকে স্বাভাবিকভাবে মনে হয়–সোমকের একটিই পুত্র ছিল, এবং যেভাবেই হোক সে পুত্রটি মারা গেলে সোমক তাঁর একপুত্রতার জন্য মনে মনে অসম্ভব পীড়িত হন। তিনি ঘটনার প্রতিকার করেন বহুবিবাহের মাধ্যমে এবং বৃদ্ধ বয়সে অনেক সন্তানের জনক হন।
হরিবংশ অবশ্য এই পাঠ গ্রহণ করেনি। সেখানে দেখা যাচ্ছে সোমকের পুত্রের নাম জন্তু এবং জন্তুরই একশটি পুত্র হয়-সোমক’স্য সুতো জন্তু যস্য পুত্রশতং বভৌ। আমরা অবশ্য মহাভারতে জন্তুর সম্বন্ধে বিশদ বৃত্তান্তটি বিবেচনা করে বায়ু-মৎস্যের নীরস তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে চাই। অর্থাৎ সোমকের একমাত্র পুত্রসন্তান জন্তু অল্প বয়সেই স্বর্গত হন। ক্ষীণ পাঞ্চাল বংশের অসহায় অবস্থার কথা চিন্তা করে সোমক একেবারেই ভেঙে পড়েন এবং ঋত্বিক-পুরোহিতের কাছে তিনি নিজের বৃদ্ধ বয়সের কথা বলে সুপরামর্শ চান। ঋত্বিকরা যাগ-যজ্ঞ করেন এবং সেই যাগ-যজ্ঞ সদ্যোমৃত জন্তুর মেদবপার দ্বারাও সম্পন্ন হয়ে থাকতে পারে। এর পরের সম্ভাব্য ঘটনা হল–সোমক অনেক বিবাহ করে অনেক পুত্র লাভ করেন।
আশ্চর্য ঘটনা হল–এই শত পুত্রের কনিষ্ঠ পুত্রটি যিনি, তিনি হলেন আমাদের অতিপরিচিত পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের পিতা, যার নাম পৃষত–তেষাং যবীয়ান পৃষতো দ্রুপদস্য পিতা প্রভুঃ। পরিষ্কার কথা হল–জন্তু সোমকের সবার বড় ছেলে আর পৃষত সর্বকনিষ্ঠ। এই যে হঠাৎ করে একশ ছেলের একটি তালিকা দেখিয়ে পৃষতকে নিয়ে আসা হল–এর মধ্যে একটু গরমিল আছে বই কি। এত শীঘ্র দ্রুপদের পিতা পৃষতকে পেয়ে গেলে ওদিকে কুরুবংশের পুত্র-পরম্পরার সঙ্গে মিলবে না। পণ্ডিতেরা তাই সন্দেহ করেন–সোমকের পরেই পাঞ্চাল বংশ ক্ষীণ হয়ে যায় এবং there was also a long gap between Jantu and Prisata, during which Panchala was dominated by Hastinapura.
