নিজের জীবিত অবস্থায় নিজবংশের হীনবীর্য অবস্থা দেখে পাঞ্চাল সোমকের দুর্ভাবনার অন্ত ছিল না। সেকালের দিনে যা হত–বংশের প্রায় বিলুপ্তি অথবা ক্ষীণ অবস্থায় সংসারের পিতৃপুরুষেরা ভাবতেন–বাড়িতে যদি অনেক পুত্র জন্মায়, তবে কেউ না কেউ পুনরায় নিজের প্রযত্নে পূর্ব রাজমর্যাদা সমুদ্ধার করে বংশেরও পূর্বগৌরব ফিরিয়ে আনবে। পাঞ্চাল-মহারাজ সোমকও বোধহয় সেই ভাবনাতেই ছিলেন। লুপ্ত-গৌরব ফিরিয়ে আনার উপায় অবশ্য তার ঘরের মধ্যেই ছিল। প্রথম কথা হল–এক রাজ্যের রাজা হলেও সোমকের রাণী ছিল একশটি–তস্য ভার্যাশতং রাজন্ সদৃশীনামভূদা। পৌরাণিকের অতিবাদে তার স্ত্রীর সংখ্যা একশ নাই হোক, অন্তত বহু তো বটেই এবং তারা সকলে ছিলেন সৃঞ্জয়-পাঞ্চাল বংশের উপযুক্ত বধু।
সোমকের একশ রানী থাকা সত্ত্বেও তার কোনও পুত্র ছিল না। দেখতে দেখতে রাজার বয়সও হয়ে গেল অনেক, তবু ঘরে তার বংশধর কোনও পুত্র নেই। শেষ পর্যন্ত অনেক সাধ্য-সাধনা করে, অনেক ব্ৰত-হোম করে রাজার ঘরে-কদাচিৎ তস্য বৃদ্ধস্য ঘটমানস্য যতুতঃ-রানীদের কোল আলোকরা একটি পুত্রের জন্ম হল। তার নাম রাখা হল জন্তু। এই নাম অবশ্য আগেই দেওয়া হয়েছিল বলে মনে হয় না, তার কারণ পরে জানাচ্ছি।
এতদিন পর রাজার ঘরে পুত্র জন্মাল বটে, কিন্তু সে আরেক জ্বালা হল। একশ রানীর কোলে এক ছেলে। ব্যক্তিগত বাৎসল্যের নিম্নগামিনী ধারা, যা সব সময় স্বকীয় সন্তানের মধ্যেই বিশ্রান্তি লাভ করে, তার কোনও পুষ্টি হল না ব্যক্তিগতভাবে। একটি মাত্র ছেলে পেয়ে একশ রানীর প্রত্যেকেই তাকে নিয়ে থাকতে চান। ছেলে যদি এক জায়গায় বসে থাকে তো একশ রানী তাকে ঘিরে বসে থাকেন–তং জাতং মাতরঃ সর্বাঃ পরিবাৰ্য সমাসতে। একশ রানীর সব আদর একজনের ওপর গিয়ে পড়ার ফলে, সেই শিশুর খাওয়া-দাওয়া, আহ্লাদ আর খেলার সরঞ্জাম নিয়ে একশ রানীই তার পিছনে ঘোড়াফেরা করেন সব সময়-সততং পৃষ্ঠতঃ কৃত্বা কামড়োগা বিশাম্পতে।
একটি শিশুকে যদি একশ রানীর উষ্ণ ক্রোড়ের মধ্যে রেখে সততই তাকে খাওয়ানো আর খেলানোর চেষ্টা করা হয়, তবে তারও জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। আসলে একটি শিশুর ভাল লাগা-না-লাগা নিয়ে একশ রানীর কোনও মাথাব্যথা নেই, তাদের চিন্তা শুধু নিজেদের ভাললাগা নিয়েই। সাধে কি আর উপনিষদে বলেছেন বা অরে পুত্রস্য কামায় পুত্রঃ প্রিয়য়া ভবতি, আত্মনস্তু কামায় পুত্রঃ প্রিয়ো ভবতি। একপুত্রকে ঘিরে শতরানীর আশা-আকাঙ্ক্ষা যখন আবর্তিত হচ্ছে, তখনই এক উটকো বিপদ ঘটল। শিশুপুত্র একদিন মাটিতে বসে আছে হঠাৎই একটি পিঁপড়ে কামড়ে দিল তাকে। পিঁপড়ের কামড় খেয়েই আদুরে ছেলে তো চিৎকার করে কেঁদে উঠল, এবং সেটা বিচিত্র নয় কিছু। কচি চামড়ায় পিঁপড়ের কামড় তো শিশুর কাছে অসহ্যই বটে। কিন্তু তার চেয়েও অসহ্য হয়ে দাঁড়াল শিশুর কান্না ছাপিয়ে একশ রানীর চিৎকার–ততস্তা মাতরঃ সর্বাঃ প্রাক্ৰোশন্ ভূশদুঃখিতা। তারা শিশুপুত্রকে ঘিরে এমন ভাবে কাঁদতে থাকলেন যেন শিশুটির এমন-সেমন কিছু হয়ে গেছে।
একশ মায়ের আর্তনাদ এমন উচ্চগ্রামে পৌঁছল যে, সে শব্দ রাজবাড়ির অন্দরমহল অতিক্রম করে রাজসভায় রাজাসনে উপবিষ্ট, অমাত্য পরিষদ-পরিবৃত রাজা সোমকের কানে গিয়ে পৌঁছল–তমার্তনাদং সহসা শুশ্রাব স মহীপতিঃ। তিনি তাড়াতাড়ি সভা ভঙ্গ করে দিয়ে অন্দরমহলে এসে উপস্থিত হলেন–কী হল, কী হল–এই কথা বলতে বলতেকিমেতদিতি পার্থিবঃ। অন্দরমহলের রুক্ষশুষ্ক দৌবারিক রাজাকে জানাল–মহারাজ! আপনার প্রিয় পুত্রকে পিঁপড়ে কামড়েছে, তাই রানীমায়েরা সব আর্তনাদ করছেন। রাজা অন্দরমহলে প্রবেশ করে শিশুপুত্রকে কোলে তুলে নিয়ে শান্ত করলেন। শান্ত, ছেলেকে রানীদের কোলে দিয়ে রাজা তাড়াতাড়ি ফিরে এলেন সভাগৃহে।
রাজসভায় তখন মন্ত্রী-অমাত্যেরা উদ্বিগ্ন হয়ে বসে আছেন, বসে আছেন পাঞ্চালদের প্রধান পুরোহিত যিনি অন্যতম মন্ত্রীও বটে। ছেলেকে একটি পিঁপড়ে কামড়েছে বলে এই আর্তনাদ-খবরটা এরকম করে সভার মধ্যে বলতে তার সংকোচই লাগল। ক্ষত্রিয়ের ঘরের ছেলে, তাকে কত সুখদুঃখের মধ্য দিয়ে চলতে হয়। তাকে কিনা একটি পিঁপড়ে কামড়েছে বলে তার ক্ষত্রিয়াণী রানীরা সব মরণ-চিৎকার করছেন। প্রখর বাস্তববোধে প্রবীণ রাজা অমাত্য-পুরোহিত মহতী সভা আহ্বান করে বললেন–ধিকার দিচ্ছি মশাই! আমাকেই শত ধিক। এর থেকে আমার পুত্র না হওয়াও ভাল ছিল–ধিগস্ত একপুত্রত্ব অপুত্রত্বং বরং ভবেৎ–আমার এই এক ছেলে হওয়ার থেকে ছেলে না হওয়াও ভাল ছিল। পুত্র-লাভের জন্য দেখে দেখে কত পরীক্ষা করে আমি একটা বিয়ে করে এনেছি। অথচ তাদের কোলে একটিও ছেলে পেলাম না আমি। যদি বা ভাগ্যবলে একটি ছেলে হল আমার, তত একশ রানী সবাই মিলে এমন আদর-যত্ন করছে তাকে যে, আমারই পাগল হওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে যতমনাসু সর্বাসু কিছু দুঃখমতঃ পর।
রাজা এবার দুঃখিত হয়ে অমাত্য-পুরোহিতকে উদ্দেশ করে বললেন–এদিকে আমার তো বয়স পেরিয়ে গেছে আর ওই একটি মাত্র ছেলে-সে যেন একশ রানীর প্রাণ। আপনারা এমন একটা ব্যবস্থা করুন যাতে এই এক পুত্রের দুঃখ ঘুচিয়ে আমি একশ ছেলে পেতে পারি। ক্ষীণ পাঞ্চাল বংশের উত্তরাধিকারী সোমক একটি পিঁপড়ের কামড় থেকে উপলব্ধি করলেন– পিঁপড়ের কামড়েই এই। যদি এমন-তেমন কিছু হয়, তবে তো পাঞ্চালরাজ্যের কোনও উত্তরাধিকারীই থাকবে না। পূর্বের গৌরব উদ্ধার করা তো দূরের কথা। একটি মাত্র পুত্র হলে এক ছেলের আদর বাবা-মাকে কোন সুখস্বর্গে নিয়ে যায়–তা এই আধুনিক জগতে আমরা প্রতিপলেই উপলব্ধি করছি। পাঞ্চালরাজ সোমক একপুত্রের আদরে ধৈর্য হারিয়ে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের কথার মাত্রা এক করে দিয়ে অমাত্য-পুরোহিতকে বলেছেন–এক ছেলে কোন পুণ্য নয়, সে শুধু শোকেরই কারণ–শোক এবৈকপুত্ৰতা–one child is sin.
০৫০. পাঞ্চালরাজ সোমক
৫০.
