রাজ্যলাভের পর সম্বরণ কিছু কিছু যাগ-যজ্ঞ সম্পাদন করার সঙ্গে সঙ্গেই তার রাজ্যের প্রজাদের মধ্যে প্রবল প্রতাপান্বিত কুরুর সম্বন্ধে অনুকূল আলোচনার পরিমণ্ডল তৈরি হতে থাকে। তারা বৃদ্ধ সম্বরণের পরিবর্তে কুরুকেই সিংহাসনের অধিকারী দেখতে চান। সম্বরণ প্রজাদের এই উৎসাহ দমিত করেননি। প্রজাদের ইচ্ছাতেই শেষ পর্যন্ত কুরু হস্তিনাপুরের রাজা হলেন–রাজত্বে তং প্রজাঃ সর্বা ধর্মজ্ঞ ইতি বব্রিরে। প্রসিদ্ধ ভরতবংশের গৌরব রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে মহারাজ কুরু প্রথমেই রাজত্ব বিস্তারে মন দিলেন। তিনি তার নিজের নামে একটি বসতি প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার নাম হয় কুরুজাঙ্গল’–তস্য নাম্নভিবিখ্যাতং পৃথিব্যাং কুরুজাঙ্গল।
‘জাঙ্গল’ শব্দটা শুনলে পরে মনে হয় যেন জায়গায় খুব জঙ্গল আছে। এমনকি হেমচন্দ্রের মতো প্রৌঢ়গৌড় ঐতিহাসিক লিখেছেন-Kurujangala, as its name implies, was probably the wild region of the Kuru realm that stretched from the Kamyaka forest on the banks of the Sarasvati to Khandava near (samipatah) the Jumna. তবে আমাদের ধারণা–কুরুজাঙ্গল-প্রদেশে জঙ্গল নিশ্চয় ছিল, এবং wild region বলতেও আমাদের তেমন কোনও আপত্তি নেই, কিন্তু জাঙ্গল’ শব্দটা যেহেতু একটা পারিভাষিক অর্থ আছে, তাই কুরুজাঙ্গলকে আমরা সেই অর্থেই ধরতে চাই। জাঙ্গল’ শব্দের। অর্থ যে জায়গায় জল বেশি দাঁড়ায় না, আবার ভীষণ সবুজ কোনও তৃণভূমিও সেটা নয়, যেখানে প্রচুর হাওয়া এবং রোদও প্রচুর–স্বল্পোদকতৃণো যস্তু প্ৰবাতঃ প্রচুরাতপঃ। স জ্ঞেয়য়া জাঙ্গলো দেশঃ…।
এই পারিভাষিক অর্থ থেকে বুঝতে পারি, মহারাজ কুরু নিজের নামে অতিসুন্দর একটি দেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে প্রচুর হাওয়া এবং রোদ থাকায় একটি বিশাল বসতির পক্ষেও সে জায়গা খুব উপযুক্ত ছিল। মহাভারতে কুরুজাঙ্গল দেশটার সঙ্গে কুরুক্ষেত্র দেশটাও কুরুরই নামাঙ্কিত হয়ে আছে এবং কুরুক্ষেত্র বোধহয় কুরুজাঙ্গল থেকে আলাদা। কেন না, মহাভারতে বলা হচ্ছে–মহারাজ কুরু অনেক তপস্যা করে বিশাল একটা জায়গাকে কুরুক্ষেত্র বলে পরিচিতি দেন-কুরুক্ষেত্রং স তপসা পুণ্যং চক্রে মহাতপাঃ। তৈত্তিরীয় আরণ্যকে কুরুক্ষেত্রের সীমানাগুলির উল্লেখ পাওয়া যায় এবং তা এইরকম–কুরুক্ষেত্রের দক্ষিণে খাণ্ডব বন, উত্তরদিকে তুর্ক্সবন আর পশ্চিমে পরীণ নদী (সিন্ধুনদের শাখা নদী)।
মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের বর্ণনা এত কাঠ-কাঠ নয়। সেখানে এক মুনি বলল–কুরুক্ষেত্রে যে বাস করতে পায়, সে মনে করে আমি স্বর্গে আছি–যে বসন্তি কুরুক্ষেত্রে তে বসন্তি ত্রিবিষ্ঠপে। জায়গাটা কোথায়? সরস্বতী নদীর দক্ষিণে আর দৃষদ্বতী নদীর উত্তরে–এই হল কুরুক্ষেত্র। কুরুক্ষেত্রের আরেক নাম সমন্তপঞ্চক। হেমচন্দ্র রায়চৌধুরীর মতে, কুরুক্ষেত্রের পুরো জায়গাটা জুড়ে আছে এখনকার থানেশ্বর, দিল্লি এবং গঙ্গার ঊর্ধ্বসীমার দোয়াব অঞ্চল। কুরুক্ষেত্রের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে যে ক্ষুদ্র নদীগুলি, সেগুলোর নাম হল অরুণা (পেহেয়ার কাছে সরস্বতী নদীর সঙ্গে মিলেছে) অংশুমতী, হিরতী, কৌশিকী (রক্ষীর শাখা নদী) ইত্যাদি।
মহারাজ কুরু নিজের নামে দুটি দেশ সৃষ্টি করেও কিন্তু পৈতৃক রাজধানী ছেড়ে যাননি। তিনি হস্তিনাপুরেই থাকতেন। লক্ষণীয় ঘটনা হল, মহারাজ ভরতের আমলে হস্তিনাপুরের। রাজা হিসেবে তিনি যে সার্বভৌমত্বের স্বাদ পেয়েছিলেন, সে স্বাদ সম্বরণপুত্র কুরুরও অপ্রাপ্য রইল না। ওদিকে সরস্বতী দৃদ্বতীর মধ্যস্থান থেকে এদিকে প্রায় প্রয়াগ পর্যন্ত এক বিশাল দেশের অধিপতি হয়ে মহারাজ কুরু শুধু তার পূর্ববংশীয়দের মর্যাদাই রক্ষা করেননি, তার সময় থেকে তার রাজত্বাধীন সমগ্র দেশটার নাম হয়ে গেল কুরুরাষ্ট্র, এবং তার বংশের সবার নাম হয়ে গেল কৌরব এবং এই নাম আমরা মহাভারতের শেষ পর্ব পর্যন্ত শুনব।
মহারাজ কুরু অনেক গৌরবের কাজ করলেন, অনেক কিছুই খুব ভাল হল বটে, কিন্তু পিতার সঙ্গে একাধারে পাঞ্চাল আক্রমণ করার সূত্র ধরে সেই যে একটা শত্রুতা তৈরি হল সে শত্রুতা কোনওদিন মেটেনি। কুরুরাজ খুব সম্ভবত উত্তর পাঞ্চাল অধিকার করে নিয়েছিলেন বলেই মনে হয় এবং সেই থেকে কৌরবদের সঙ্গে পাঞ্চালদের শক্রতা এতটাই গভীরে চলে যায় যে–মহাভারতের মধ্যে এ কথা সদা-সর্বদা এই মর্মে উচ্চারিত হতে থাকে। কুরু আর পাঞ্চালদের কথা উঠলেই লোকে স্মরণ করে বলত-ওরে বাবা! ওদের তো আবার বিরাট ঝগড়া-বিবদমান দুই জাতি-গোষ্ঠীর নামই তো কৌরব আর পাঞ্চালরা-কুরূণাং সৃজয়ানাঞ্চ জিগীষুণাং পরম্পর।
আগেই বলেছিলাম–পিতার সঙ্গে কুরুরাজ যখন পাঞ্চালদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন, তখন সৃঞ্জয়, সুদাস–এই সব বিখ্যাত পাঞ্চাল রাজার কীর্তি লুপ্ত হয়ে গেছে এবং সুদাসের নাতি সাহদেবি সোমক পাঞ্চালদের রাজা হয়ে কোনওমতে হয়তো রাজ্যের একাংশমাত্র টিকিয়ে রেখেছিলেন। সম্বরণের মতো তাকে পুরো রাজ্য হারিয়ে পালিয়ে যেতে হয়নি, এই যা। সোমক যে খুব বড় রাজা ছিলেন তা নয়, তবে পাঞ্চালদের জন্য তার ভাবনা ছিল যথেষ্ট। পাঞ্চালদের অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও তিনি পাঞ্চালদের জোয়াল কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। বলেই সোমকের কথা প্রসঙ্গত বলতে গেলেই পৌরাণিকরা বলেন–পাঞ্চাল বংশের ক্ষীণ বা দুর্বল অবস্থায় সোমকের জন্ম–ক্ষীণে বংশে তু সোমকঃ।
