বশিষ্ঠের সুপরামর্শ ছাড়াও সম্বরণ হয়তো তার রাজ্যে অন্য পার্শ্ববর্তী রাজাদেরও সাহায্য পান। মথুরার যাদবরা, গান্ধারদেশবাসী দ্রুহ্যুবংশীয়রা, উশীনর শিবিরা (যাঁরা অনু-বংশীয় আনব নামে পরিচিত ছিলেন) এবং রেওয়া-সাতনা অঞ্চলের তুসুবংশীয়দের মিলিত সাহায্যেই হয়তো মহারাজ সম্বরণ সার্বভৌম ভরতের রাজধানী পুনরুদ্ধার করছিলেন। কারণ বশিষ্ঠ যখন সম্বরণের রাজ্যোদ্ধার করার জন্য স্বীকার বাক্য উচ্চারণ করলেন, তখন সেখানে শুধু সম্বরণই ছিলেন না, ছিলেন ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়া যদু-অনু–তবুসুরা–যাঁরা সকলে ‘ভারতাঃ’ নামে পরিচিত–তে সর্বে ভারতস্তা। ভারতা প্রত্যপদ্যত। লক্ষণীয়, রাজ্যে প্রতিষ্ঠার সময় সম্বরণকে তার বহু পূর্ব পরিচয়ে সম্বরণ পৌরব বলে ডাকা হচ্ছে অথাভ্যষিঞ্চৎ সাম্রাজ্যে সর্বক্ষত্রস্য পৌরবম্। আরও, একটা কথা, আমরা পূর্ব ভারতের রাজধানীর ঠিকানা দিতে পারিনি, কিন্তু সম্বরণকে যেহেতু ভরতের অনুপমা রাজধানীটিই পুনদখল করে নিতে দেখছি, তখনই বুঝতে পারি যে, হস্তিনাপুর অঞ্চলটাই ভরতেরও রাজধানী ছিল–ভরতাধষিতং পূর্বং–যার নামকরণ শুধু সম্বরণের পিতা হস্তীর কৃতিত্ব।
রাজ্য দখল করার সঙ্গে সঙ্গেই সম্বরণ বিভিন্ন জায়গায় বেশ কতগুলি যাগযজ্ঞ সম্পন্ন করে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করলেন। সামন্ত রাজারাও আবার সম্বরণের প্রভুত্ব মেনে তাকে কর দিতে আরম্ভ করলেন-পুনর্বলিভৃতশ্চৈব চক্রে সর্বমহীক্ষিতঃ। তবে একটা কথা এখানে মনে রাখতে হবে যে, সম্বরণ নিজের কৃতিত্বে অথবা সম্মিলিত রাজাদের কৃতিত্বেই যে নিজের রাজ্য দখল করতে পেরেছিলেন তা বোধহয় নয়। কারণ পাঞ্চালরাজ সুদাস নিজের রাজত্বের শেষদিকে রাজার কর্তব্য ভুলে, রাজনীতির শিক্ষা ভুলে প্রজাপীড়নে মত্ত হয়েছিলেন। মনু মহারাজ তার সংহিতাগ্রন্থে বেশ কয়েকজন নামী রাজার নাম করেছেন যারা নিজেদের ইন্দ্রিয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি এবং দুর্বিনীত স্বভাবের ফলে নিজেদের রাজ্য পর্যন্ত খুইয়েছেন। মনু মহারাজের সেই নামের লিস্টিতে পৈজবন সুদাসেরও নাম আছে–সুদা জৈবনশ্চৈব সুমুখো নিমিরেব চ।
আমরা ধারণা করি–কোনও ইন্দ্রিয় পরতন্ত্রতার ফলেই সুদাসের রাজ্যভ্রংশ ঘটেছিল, এবং সেই সুযোগে সম্বরণ আবার রাজ্য ফিরে পেয়েছিলেন। পণ্ডিতেরা বলেন–সুদাস নয়, হয়তো তার ছেলে সহদেব অথবা নাতি পাঞ্চাল সোমকের সময় মহারাজ সম্বরণ তার হৃত রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন। কারণ এরা সবাই ছিলেন দুর্বল রাজা। হতেও পারে। পুরাণগুলিতে দেখছি–সুদাসের পাঞ্চাল বংশ দুর্বল হয়ে যাওয়ার সময়েই সোমকের রাজত্ব চলছিল–কীণে বংশে তু সোমক। পাঞ্চালরা মহারাজ সম্বরণের সাধের হস্তিনাপুরী তচনচ করে দিয়ে যেভাবে তার ওপর অত্যাচার চালিয়েছিলেন, এতদিন পরে অজমী বংশের প্রধান সম্বরণ তার শোধ তুললেন। আর শোধ তোলার অর্থ কিন্তু নিজের রাজ্যটুকু উদ্ধার করেই ক্ষান্ত হওয়া নয়; সেকালের সাম্রাজ্যবাদী নীতিতে পাঞ্চালদের নিজ রাজ্যে পর্যদস্ত না করে সম্বরণের পক্ষে এই জয় লাভ করা সম্ভব হয়নি। ফলে সুদাসের উত্তর পাঞ্চাল তখনকার মতো হস্তিনাপুরের অধিকারেই চলে এল।
আরও একটা সম্ভাবনার কথা বলি–মহাভারতের তথ্য অনুযায়ী হস্তিনাপুর হারানোর পর সম্বরণকে পালিয়ে যেতে হয়েছিল স্ত্রী এবং পুত্রকেও নিয়ে–ততঃ সদারঃ সামাত্যঃ সপুত্রঃ সসুহৃজ্জনঃ। অনুমান করি, সম্বরণের এই পুত্রের জন্ম হয়েছিল বার বছরের সেই বিলাস-বিহারের কালেই, যখন তিনি হস্তিনাপুরীতে অনুপস্থিত ছিলেন। সম্বরণের এই পুত্রের কথা আমাদের সাড়ম্বরে জানাতে হবে, কারণ ইনি সেই সেই ভারতবিখ্যাত মহারাজ কুরু, যার নামে ততোধিক বিখ্যাত কৌরব বংশ। পণ্ডিতদের অনুমান–পাঞ্চালরাজ সুদাস যখন হস্তিনাপুর আক্রমণ করেন, তখন তিনি বয়সে প্রবীণ এবং সম্বরণ তখন যুবক বয়সের রমণীর আমোদে প্রমত্ত। সম্বরণকে বহুকাল স্ত্রী-পুত্র নিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে এবং হয়তো পাঞ্চালরাজ সুদাস পৈজবনের মৃত্যুর পর তার পুত্র-পৌত্রদের কাছ থেকে তিনি নিজ রাজ্যের সঙ্গে পাঞ্চালও অধিকার করেন। কিন্তু এই রাজ্যোদ্ধারের কৃতিত্ব বোধহয় তার একার নয়, এর মধ্যে তাঁর বীরপুত্র কুরুরাজের অবদান ছিল।
পাঞ্চালরাজ ‘সাহ দেব্য’ সোমক, যিনি সুদাসের নাতি ছিলেন তিনি একসময় যমুনার তীরে একটি যজ্ঞ সম্পন্ন করেন। পাণ্ডবরা যখন বনপর্বে তীর্থযাত্রা করেছেন, তখন যমুনা নদীর একান্তস্থিত একটি পুণ্যস্থান দেখিয়ে লোমশ মুনি যুধিষ্ঠিরকে বলেছেন-এই সেই যমুনা নদী, যেখানে যজ্ঞ সম্পাদন করেছিলেন সূর্যবংশীয় মান্ধাতা, যেখানে যজ্ঞ করেছিলেন সহদেবের পুত্র পাঞ্চালরাজ সোমক–সাহসেবি কৌন্তেয় সোমকো দদতাং বরঃ। সন্দেহ নেই, সোমক এই যজ্ঞ করার সুযোগ পেয়েছিলেন সম্বরণ এবং তাঁর পুত্র কুরু পাঞ্চালদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে। আমাদের ধারণা–সম্বরণ যে পুনরায় পাঞ্চালদের আক্রমণ করে পৈতৃক রাজ্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন, তা প্রধানত তার পুত্র কুরুর ভবসায়। তপতীর ঔরসজাত এই পুত্রটি যেমন বীর ছিলেন তেমনই উদ্যমী। হয়তো এই বীরপুত্রের উদ্যম লক্ষ্য করেই সম্বরণও নিজের প্রৌঢ় বয়সে পৈতৃক রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে উদ্যমী হন।
