সূর্যদেব সানন্দে নিজের কন্যা তপতাঁকে বশিষ্ঠের হাতে তুলে দিলেন। মহর্ষি তপতাঁকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হলেন সেই পর্বতের সানুদেশে, যেখানে সম্বরণ তপস্যা করছিলেন তপতাঁকে পাবার জন্য। বশিষ্ঠের সঙ্গে তপতাঁকে আসতে দেখে রাজার মনে হল যেন–বিদ্যুতের ঝলক নেমে এল চারিদিক উদ্ভাসিত করে। ঋষি বশিষ্ঠের সাহায্যে সম্বরণ শেষ পর্যন্ত তপতাঁকে স্ত্রী হিসেবে পেলেন। রাজার সাধের সাধনা যেন আজ মূর্তি ধরে, নেমে এল। তাঁর আকুল বক্ষে, বাহুর ডোরে।
.
৪৯.
মহর্ষি বশিষ্ঠের করুণায় মহারাজ সম্বরণ তপতাঁকে লাভ করলেন বটে, কিন্তু নবলব্ধ দাম্পত্য প্রেমে মোহিত হয়ে সম্বরণ কিন্তু হস্তিনাপুরের রাজধানীতে আর ফিরে গেলেন না। তপতাঁকে সম্বরণ লাভ করেছিলেন সবুজ পার্বত্যভূমির ঘন বনাঞ্চলে। পর্বতের সানুপ্রদেশের শোভা এবং সঙ্গে হিরন্ময়ী প্রতিমা তপতী। মহারাজ রাজধানীতে তখনই ফিরে যেতে চাইলেন না। পুরোহিত বশিষ্ঠ মুনির কাছে সম্বরণ অনুমতি চাইলেন সেই পার্বত্য ভূমিতেই আরও কিছুদিন থেকে যাবার জন্য। বশিষ্ঠের অনুমতি পেয়েই রাজা বৃদ্ধ মন্ত্রীকে আদেশ দিলেন হস্তিনাপুরের রাজ্যপাট সামলানোর জন্য–আদিদেশ মহীপালস্তমেব সচিবং তদা।
বশিষ্ঠ রাজাকে পার্বত্যপ্রদেশের মধ্যে মধুচন্দ্রিমা যাপনের অনুমতি দিয়েছিলেন, তিনি আর কি জানতেন–তপতীর সঙ্গলাভে মহারাজ সম্বরণের কোনও জ্ঞান থাকবে না। বৃদ্ধ মন্ত্রীকে রাজা রাজ্যপাট সামলানোর আদেশ দিয়েছিলেন, তিনি ধারণাও করতে পারেননি–রাজা সমস্ত সীমা অতিক্রম করে ভোগে লিপ্ত থাকবেন। মহাভারতের কবি বলেছেন–বশিষ্ঠ চলে গেলে মহারাজ সম্বরণ দেবতার মতো বিহার করতে থাকলেন–বিজহারামরো যথা। এক দিন নয়, এক মাস নয়, এক বছরও নয়, সম্পূর্ণ বারো বছর ধরে দেবতার মতো উপভোগ বিহার-কাননে, বনে, পার্বত্যভূমিতে–ততো দ্বাদশ বর্ষাণি কাননেযু বনেষু চ–রাজার রাজ্যপাট চুলোয় গেল।
কবি লিখেছেন–রাজার শাসন নেই, সম্বরণের রাজ্যে ইন্দ্রদেব বৃষ্টি দিলেন না। বারো বচ্ছরের অনাবৃষ্টিতে খাঁ-খা করতে লাগল কর্ষণভূমি। একটি হিমবিন্দুও পতিত হল না, শস্য হল না একটুও। ক্ষুধার অন্ন জুটল না প্রজাদের। রোগ-শোক মহামারীতে হস্তিনাপুরীর শাসন-ব্যবস্থা ভেঙে পড়ল। মানুষ স্ত্রী-পুত্র পরিত্যাগ করে বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরতে লাগল। পুরু-দুষ্যন্ত-ভরতের রাজপুরী প্রেতপুরীতে পরিণত হল–অভবৎ প্রেতরাজস্য পুরং প্ৰেতৈরিবাবৃত।
মহাভারত-রামায়ণ এবং পুরাণগুলি পড়লেই দেখতে পাবেন–অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, মহামারী এবং রোগ-শোকের বর্ণনা তখনই শোনা যায় যখন কোনও রাজার শাসন-ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। দেশের রাজা যদি রাজধর্মে প্রতিষ্ঠিত না থাকেন, যদি তাঁর ব্যক্তিগত ভোগ-সুখ আর বিলাস-ব্যসনে প্রজাদের দুঃখ উপস্থিত হয়, পুরাণ-ইতিহাসে তখনই উপরিউক্ত নিয়মে কনভেনশনালি’ একটা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বর্ণনা করা হয়। সোজা কথা হলহস্তিনাপুরের রাজা সম্বরণ বার বছর রাজ্যে উপস্থিত নেই। তিনি ভোগ-বিলাসে, স্ত্রীবিলাসে কাল কাটাচ্ছেন রাজ্যের বাইরে–রেমে তস্মিন্ গিরৌ রাজা তয়ৈব সব ভার্যয়। আমাদের ধারণা–হস্তিনাপুরে সম্বরণ রাজার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে তার পার্শ্বরাষ্ট্রের শত্রুরা প্রবল হয়ে উঠেছিলেন এবং সেই পার্শ্বরাষ্ট্র হল পাঞ্চাল। হয়তো পাঞ্চালের রাজা তখন সুদাস।
মহাভারতের বর্ণনায় দেখতে পাচ্ছি–পাঞ্চালের রাজা শতশত সৈন্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। রাজা সম্বরণ হয়তো শেষ মুহূর্তে খবর পেয়ে পাঞ্চালদের সঙ্গে যুদ্ধ লড়তে এসেছিলেন। কিন্তু পাঞ্চালরা তাকে এমনভাবেই যুদ্ধে জয় করেন যে, সম্বরণকে স্ত্রী-পুত্র, অমাত্য-পরিজন নিয়ে পালিয়ে যেতে হয় দূরে–রাজ্য সম্বরণস্তসমাৎ পলায়ত মহাভয়াৎ। পণ্ডিতেরা মনে করেন–পাঞ্চালরাজ সুদাসই মহারাজ সম্বরণকে পরাজিত করেন এবং এই যুদ্ধ হয়েছিল যমুনা নদীর তীরে-Sudas drove the Paurava King Samvarana of Hastinapura out, defeating him on The Jamuna.
পরাজিত সম্বরণ তার রাজ্যের খুব কাছাকাছি থাকতে পারলেন না। তাঁকে পালিয়ে যেতে হল সিন্ধুনদের অববাহিকা অঞ্চলে– সিন্ধোর্নদস্য বিষয়ে নিকুঞ্জে ন্যবসত্তা। সঙ্গে বিশ্বস্ত মন্ত্রী-পরিজন আর স্ত্রী তপতী। কখনও পর্বতের কন্দরে, কখনও সিন্ধুনদের তটবর্তী জঙ্গলে, কখনও বা সিন্ধুনদের তীর ধরে আরও এগিয়ে গিয়ে সম্বরণ পালিয়ে বেড়াতে লাগলেন– নদীবিষয়পর্যন্ত পর্বতস্য সমীপতঃ। মহাভারতের বক্তব্য থেকে পরিষ্কার ধারণা করা যায় যে, পাঞ্চালরা সম্বরণকে হারিয়ে দিয়ে ক্ষান্ত হয়নি, সম্বরণকে তারা খুঁজে বেড়াচ্ছিল। যার জন্য সিন্ধুনদের তীরবর্তী অঞ্চলে যেখানেই সম্বরণকে থাকতে হয়েছে, তাকে যথেষ্ট সুরক্ষা নিয়েই থাকতে হয়েছে। মহাভারত বলেছে–নদ-নদী, জঙ্গল কিংবা পর্বতে অথবা যেখানেই সম্বরণ বাস করেছেন, সেখানেই তাকে থাকতে হয়েছে দুর্গের সুরক্ষা নিয়ে এবং থাকতেও হয়েছে বহু বছর-তত্রাবস বহু কালান্ ভারতা দুর্গমাশ্রিতাঃ। দুর্গ বলতে এখানে ‘ফোর্ট’ বোঝাচ্ছে না, দুর্গ মানে এখানে–অন্যের পক্ষে দুর্গম জায়গা।
যাই হোক, অনেক কাল বাইরে বাইরে কাটানোর পর মহর্ষি বশিষ্ঠের সঙ্গে আবার তার দেখা হল। মহারাজ সম্বরণ তাকে পুরোহিত নিযুক্ত করলেন। বশিষ্ঠের এই পৌরোহিত্য অবশ্য চাল-কলার পৌরোহিত্য নয়, রাজার যাগ-যজ্ঞ সম্পাদনও নয়, এই পৌরোহিত্যের অর্থ রাজার প্রধান রাজনৈতিক উপদেষ্টার ভূমিকা। কারণ, সম্বরণ তাকে পাদ্য-অর্ঘ্য দিয়ে বলেছিলেন আপনি আমার পৌরোহিত্য স্বীকার করুন এবং আমরা একসঙ্গে হৃত রাজ্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করি–পুরোহিতো ভবান্নোত্ত রাজ্যায় প্রযতেমহি। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সঙ্গে চাণক্যের যে সম্পর্ক–আমরা ধারণা করি বশিষ্ঠের সঙ্গেও সম্বরণের সেই সম্পর্ক স্থাপিত হল।
