অনেকক্ষণ চক্ষু সার্থক করে রাজা এবার রমণীকে জিজ্ঞাসা করলেন-তুমি কার মেয়ে, সুন্দরী? তুমি কারও স্ত্রী নও তো? কী জন্যই বা এই নির্জন অরণ্য দেশে একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছ–কথঞ্চ নির্জনে’রণ্যে চরস্যেকা শুচিস্মিতে? সম্বরণ থাকতে পারলেন না। রমণীয় রূপ দেখে নিজের ভাবটুকুও তিনি আর গোপন করতে পারলেন না। সম্বরণ বললেন-তোমার মতো সুন্দরী আমি কোনওদিন দেখিনি। তোমার অঙ্গের এই মনোহর অলংকারগুলি আমার কাছে বাল্য মনে হচ্ছে, বস্তুত তোমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই এই আভূষণের যথার্থ অলংকার। তোমার এই মধুর মুখখানি দেখে আমার মন আকুল হয়ে উঠেছে ভালবাসায়–মাং মথুতীব মন্মথঃ।
সম্বরণ অনেক কথা বলে গেলেন প্রলাপের মতো। কিন্তু রমণী একটি কথারও উত্তর দিলেন না। মেঘাচ্ছন্ন আকাশে বিদ্যুৎ ঝলকের মতো হঠাৎই তিনি অদৃশ্য হলেন। সম্বরণ তার দেখা না পেয়ে চার দিকে খুঁজতে লাগলেন–তামম্বেং স নৃপতিঃ পরিচক্রাম সর্বতঃ। কোথাও তাকে পাওয়া গেল না। পাগলের মতো খুঁজতে খুঁজতে একসময় সম্বরণের চেতনা লুপ্ত হল। তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন মাটিতে। যিনি এতকাল ভরতবংশের সমস্ত শত্ৰু নিপাত করে ভূতলে শায়িত করেছেন, তিনি এক রমণীর মোহে নিজেই লুটিয়ে পড়লেন ভূমিতে–পাতনঃ শসংঘানাং পপাত ধরনীতলে। রাজা যখন চেতনা-লুপ্ত হয়ে পড়ে আছেন, ঠিক তখনই সেই রমণী আবারও উপস্থিত হলেন রাজার সামনে–পুনঃ পীনায়তশ্রোণী দয়ামাস তং নৃপম। রমণী বললেন—আপনি ভূতলশয়ন ছেড়ে উঠুন রাজা। বিধাতা আপনাকে রাজা করে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, আপনার কি এত অল্প কারণে মূৰ্ছিত হওয়া চলে–মোহং নৃপতিশার্দুল..ন মর্হস্যরিন্দম? পরিষ্কার বোঝা যায়, রমণী এতক্ষণ লুকোচুরি খেলছিলেন রাজার সঙ্গে।
সম্বরণ দেখলেন–সেই রূপ, সেই মনোহর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঞ্চার। এক মুহূর্ত দেরি না করে তিনি বিবাহের প্রস্তাব করলেন রমণীর কাছে। বললেন তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না–ন হ্যহং ত্বতে ভীরু শ্যামি খলু জীবিতু। সম্বরণ এইটুকু কথা বলেই থামেননি। যত রকম স্তুতি-প্রশংসায় রমণীর মন জয় করা যায়, সেসব তো তিনি করলেনই, উপরন্তু শতরকম ভাবে রমণীর হৃদয়ে শত করুশার উদ্রেক করে তিনি শুধু বললেন–আমার প্রাণ বাঁচাতে হলে তোমাকে যে আমার কাছে আত্মদান করতেই হবে। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না–প্রাণা হি প্রজহন্তি মা। সম্বরণ শেষ প্রস্তাব করলেন–এই মুহূর্তেই আমরা গান্ধর্ব বিবাহের নিয়মে মিলিত হতে পারি। তুমি রাজি তো?
রমণীর কোমল হৃদয় আর কত সইতে পারে। এতক্ষণ রাজার অন্তরালে থেকে তার হৃদয়ের সমস্ত উচ্ছ্বাস আর আকুতি লক্ষ্য করেছেন তিনি। রাজার কথা শুনে এবারে তিনি আর নিরুত্তরে দাঁড়িয়ে থাকলেন না। একটু ঘনিষ্ঠভাভাবেই বললেন–বিবাহ? মহারাজ! আমি শুধু আমার ইচ্ছাতে এই কাজ করতে পারি না। আমার পিতা আছেন। আমাকে যদি সত্যিই তুমি ভালবেসে থাক, তবে আমার পিতার কাছে তুমি আমাকে যাচনা করে নাও-ময়ি চেদস্তি তে প্রীতির্যাচস্ব পিতরং মম। আমি স্বীকার করি–আমি যদি প্রথম দর্শনেই তোমার ভালবাসার পাত্র হয়ে থাকি, তবে তুমিও প্রথম ভালবাসবার মতো এক পুরুষ-রত্ন। তবু কী জান, এই শরীরটা আমার পিতার দেওয়া। এই শরীরের আমার অধিকার নেই কোনও। একবারটি তুমি আমার পিতাকে বল। তবে শুধু আমার কথা জানতে চাইলে বলি–পৃথিবীতে এমন কোন্ রমণী আছে যে তোমার মতো বিখ্যাত বংশের অভিজাত রাজাকে মনেপ্রাণে স্বামী হিসেবে না চাইবে, বিশেষত যে রাজা আমাকেই চান-কন্যা নাভিলষেন্নাথং ভর্তারং ভক্তবৎসল। তুমি তোমার তপস্যায়, প্রণিপাতে আমার পিতাকে তুষ্ট করা। তিনি অনুমতি দিলেই আমি তোমার হব–ভবিষ্যামথ তে রাজন্ সততং বশবর্তিনী। সম্বরণের সঙ্গে কথা শেষ করে রমণী নিজের পরিচয় দিলেন–আমি সূর্যের কন্যা। মনে রেখ রাজা–আমার নাম তপতী।
পরিচয়ের শেষে রমণী আবারও অন্তর্হিত হলেন এবং সম্বরণ তাকে না দেখে আবারও চেতনালুপ্ত হয়ে লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে। এদিকে সম্বরণের অনুযাত্রী বৃদ্ধ মন্ত্রী সৈন্য-সামন্ত সঙ্গে নিয়ে তাকে খুঁজতে খুঁজতে আসছিলেন। সেই মহাবনের মধ্যে এসে অশ্বহীন লুপ্তচেতন রাজাকে দেখে বৃদ্ধ মন্ত্রীর বুক কেঁপে উঠল। তিনি ভাবলেন–নিশ্চয় ঘোড়া খুইয়ে শ্রান্ত পিপাসার্ত রাজা বনের পথে হাঁটতে হাঁটতে সংজ্ঞালুপ্ত হয়ে পড়ে গেছেন মাটিতে ক্ষুৎপিপাসাপরিশ্রান্তং তর্কয়ামাস বৈ নৃপম্। বৃদ্ধ মন্ত্রী পিতার মতো স্নেহে সম্বরণকে মাটি থেকে উঠালেন, পদ্মগন্ধী শীতল জল এনে ছিটিয়ে দিলেন তার মাথায়। রাজার সংজ্ঞা ফিরে এল অচিরেই। কিন্তু সংজ্ঞা ফিরে আসতেই রাজার মনে পড়ল তপতীর কথা। তপতী বলেছিলেন–তুমি তপস্যায় প্রণিপাতে সন্তুষ্ট কর আমার পিতাকে–আদিত্যং প্রণিপাতেন… যাচস্ব পিতরং মম–তবেই আমি তোমার হব।
বৃদ্ধ মন্ত্রীকে নিজের কাছে রেখে সৈন্য-সামন্ত সবাইকে রাজধানীতে ফিরে যেতে বললেন সম্বরণ। তারা চলে যেতেই রাজাও সূর্যের উপাসনার জন্য সেই পাহাড়ের সানুদেশে সূর্যের সন্তুষ্টির উদ্দেশে তপস্যা আরম্ভ করলেন; আর মনে মনে স্মরণ করতে লাগলেন ঋষি বশিষ্ঠকে, তার এই বিষণ্ণতায় তিনিই একমাত্র সাহায্য করতে পারেন তাকে–জগাম মনসা চৈব বশিষ্ঠ ঋষিসত্তমম্। বশিষ্ঠ সম্বরণ রাজার পুরোহিত। পুরো বার দিন উধ্বমুখে সূর্যের তপস্যায় সম্বরণের দিন কাটল। বশিষ্ঠ সম্বরণের অবস্থা জেনে উপস্থিত হলেন সেই পর্বতের সানুদেশে। সম্বরণ তপতাঁকে লাভ করার জন্য এই তপস্যা করছেন জেনে বশিষ্ঠ নিজেই গিয়ে দেখা করলেন সূর্যদেবের সঙ্গে। তিনি বললেন-মহারাজ সম্বরণ আমাদের রাজা। তিনি যশস্বী ধর্মজ্ঞ এবং উদারচেতা। আমি তার বিবাহের জন্য আপনার মেয়ে তপতাঁকে নিয়ে যেতে চাই। সুর্যদেব মনে মনে আগেই সম্বরণকে তপতীর উপযুক্ত স্বামী হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। অতএব বশিষ্ঠের প্রস্তাবমাত্রই তিনি বললেন-সম্বরণ রাজাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। আর মুণিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আপনি এবং রমনীকুলে মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ আমার এই কন্যা তপতী। অতএব এই বিবাহের প্রস্তাবে আমার আপত্তি কোথায়–তপতী যোষিতাং শ্রেষ্ঠা কিমন্যদপসর্জনা।
