ভৃগু-বংশের নাম শোনা মাত্রই পণ্ডিতরা কিন্তু টান-টান হয়ে বসেন। সুকৃথঙ্কর থেকে সুকুমারী ভট্টাচার্য–অনেক পণ্ডিতেরই ধারণা যে, মহাভারত-রচনা, বিশেষত মহাভারতের প্রক্ষিপ্তাংশে ভৃগুবংশীয়দের ভাল রকম হাত আছে। আমি সেই সব বিতর্কের মধ্যে যাচ্ছি না। মহাভারত যেমনটি আমাদের হাতে এসেছে, তাই নিয়েই আমাদের বিচার। তবে হ্যাঁ, পণ্ডিতরা যে সৌতি উগ্রশ্রবাকে মহাভারতের ‘থার্ড এডিটর’ বলেছেন, তাতে আমাদের আপত্তি নেই। প্রসঙ্গত বলি- তাদের মতে মহাভারতের প্রথম সম্পাদক ব্যাসদেব, দ্বিতীয় সম্পাদক ব্যাস-শিষ্য বৈশম্পায়ন, যিনি জনমেজয়কে মহাভারত-কথা “শুনিয়েছেন। আর আমাদের থার্ড এডিটর’ সৌতি উগ্রশ্রবা–যেমনটি বৈশম্পায়ন এবং তাঁর পিতা রোমহর্ষণের কাছে পুরাণ-কথা, ভারতের ইতিহাস শিখেছেন, তেমনটি আমাদের বলেছেন। বেশির মধ্যে এই, তার কাহিনীতে আছে তার নিজের কালের হাওয়া, নিজের সময়ের সমস্যা এবং সংকট। সেও তো সামাজিক ইতিহাসই বটে, না হয় সেটা কিছু পরবর্তী সময়ের, তাতে আমাদের কী অসুবিধে? আমরা সেটাও জানতে চাই।
সৌতি উগ্রশ্রবা বলতে আরম্ভ করলেন। মহর্ষি ভৃগুর স্ত্রী ছিলেন পুলোমা। আগেই জানিয়ে দিই- প্রথম কল্পে ব্রহ্মা যাদের দিয়ে তার সৃষ্টিকার্য আরম্ভ করেছিলেন, ভৃগু তাদের অন্যতম। ওদেশে যাকে আমরা অ্যাডাম বলে ডেকেছি, আমাদের দেশে ওরকম অ্যাডাম’অন্তত দশজন আছেন। তাদের বলা হয় ব্রহ্মার মানসপুত্র। তাদের মধ্যে জনা পাঁচেক ব্রহ্মবাদী হয়ে ব্রহ্মসাধনে মন দিলেন, আর অন্য পাঁচজন বিবাহাদি করে সৃষ্টির প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখলেন। আমাদের ভৃণ্ড এই দ্বিতীয় দলের। তার স্ত্রীর নাম পুলোমা। তিনি যথেষ্ট সুন্দরী, কিন্তু তার স্বভাবটা ভৃগুর মতোই অর্থাৎ এঁর সঙ্গে ওঁর মত মিলত খুব কথকঠাকুরের ভাষায়–সমশীলিনী। ঋষির সঙ্গে আনন্দে তার দিন কাটছে, এরই মধ্যে ভৃগুর সন্তান এল পুলোমার গর্ভে।
মহর্ষি ভৃগু একদিন গর্ভবতী স্ত্রীকে আশ্রমে একা রেখে বেরিয়েছেন নদীতে স্নান করার জন্য। ব্রাহ্মণ মানুষ; স্নানে একটু সময় লাগে–সন্ধ্যা আহ্নিক, সূর্য-প্রণাম আর অবগাহন করতে যে সময় লাগে, সে সময় খুব কম নয়। এরই মধ্যে একটি রাক্ষস এসে পৌঁছলেন ভৃগুর আশ্রমে। ভৃগুর সুন্দরী স্ত্রীটিকে দেখে রাক্ষসের মন বড় পুলক হল, বেশ কামাবেশও হল। লক্ষণীয় ব্যাপার হল–এই রাক্ষসের নামও পুলোমা।
দুই পুলোমা–অর্থাৎ ভৃগুর স্ত্রী পুলোমা এবং রাক্ষস পুলোমা–এই দুজনের দেখা হওয়ার আগেই একটা জ্ঞানের কথা শোনাই। মনে রাখতে হবে রাক্ষস’ শব্দটা শোনামাত্রই আপনারা যারা পুরুষ্টু গোঁফওয়ালা বিশাল দাঁতওয়ালা, হা-হা-ধ্বনিযুক্ত কতগুলি জীবের কল্পনা করেন, তাদের আমরা রীতিমতো নিরাশ করব। রাক্ষসেরা সকলেই দেবতাদের বৈমাত্রেয় ভাই এবং তাদের বাবা একজনই- মহর্ষি কাশ্যপ। পুরাণে-ইতিহাসে এবং দর্শনে যেমনটি আছে তার বিস্তৃত আলোচনায় গেলে আপনারা আবার আমাকে জ্ঞানদাতা ঠাকুরদাদাটি ভাববেন বলে তার মধ্যে যাচ্ছি না, যদিও গেলে ভাল হত। তবে জেনে রাখুন- তারা ভাল রকম সংস্কৃত জানতেন, বেদ-বেদাঙ্গ-ব্যাকরণের জ্ঞানও তাদের বেশ টনটনে। দেবতাদের থেকে তাদের গুণ কোথাও কোথাও বেশি। বস্তুত তাদের মতো ইঞ্জিনিয়ার এবং শিল্প-রসিক তো সে যুগে কমই ছিল। রাবণের স্বর্ণলঙ্কা অথবা ময়দানবের তৈরি ইন্দ্রপ্রস্থ অথবা ত্রিপুর দুর্গ স্মরণ করলেই রাক্ষসদের শিল্প-সত্তার পরিচয় পাবেন আপনারা। দেখতেও তারা কেউ খারাপ নন, রীতিমতো সুপুরুষ।
এত সব গুণ থাকা সত্ত্বেও কতগুলি দোষই এঁদের একেবারে রাক্ষস করে ছেড়েছে। দোষের মধ্যে প্রধান হল ছয় রিপু, বিশেষত কাম-ক্রোধ তাদের এতই বেশি প্রবল, অপিচ নিজের ওপর তাদের সংযমও এতই কম যে, শুধু ষড়রিপুই তাদের রাক্ষস বানিয়ে দিল। নইলে দেখুন, দেবতা-রাক্ষসে যতই শাশ্বতিক বিরোধ থাক, তাদের মধ্যে এমনিতে মিলটাই বেশি। বিয়ে-থাও কিছু কম চলত না। এই পুলোমা রাক্ষসের কথাই ধরুন। পুরাণে-ইতিহাসে পুলোমা’ নামে কিন্তু দু-তিন জন রাক্ষস আছেন। রাক্ষসদের পুরো একটা শুষ্টিকেও তাদের মায়ের নামে পুলোমার গুষ্টি বলা হয়েছে মহাভারতে। পুলোমা আর কালকা–একজন দৈত্য-সুন্দরী অন্যজন অসুর-সুন্দরী- পুলোমা নাম দৈতেয়ী কালকা চ মহাসুরী। এরা দুজনেই তপস্যা করে ব্রহ্মর কাছে নিজেদের ছেলেদের জন্য বর চেয়ে নিয়েছিলেন। এই পুলোমার ছেলেরাই পৌলোম গুষ্টির রাক্ষস–পৌলোমৈশ্চ মহাসুরৈঃ।
পুলোমা নামে এই রাক্ষস-সুন্দরীর কথা বলে নিলাম এইজন্য যে, রাক্ষসদের মধ্যে পুলোমা নামটা মেয়েদেরও চলত, ছেলেদেরও চলত। এই রকমটা ব্রাহ্মণ-ঋষিদের মধ্যেও চলত, যেমন আস্তীক-মুনির পিতা জরৎকারু মুনির পত্নীও জরৎকারু, যদিও এই স্ত্রী-জরৎকারু নাগ-বংশের মেয়ে। সেকথা পরে। কারণ দেবরাজ ইন্দ্র যাকে সপ্রেমে বিয়ে করেছিলেন, সেই শচী-দেবী কিন্তু এক রাক্ষসে পুলোমার মেয়ে। শচীদেবীকে অনেকেই আদর করে পৌলোমী বলে ডাকেন। এখনকার অনেক মা’ও সাদরে কন্যার নাম দেন পৌলোমী। এমন রাক্ষুসে নাম শুনে দুঃখ পাবার কিছু নেই। আমার বক্তব্য, দুটো আলাদা আলাদা উদাহরণ থেকে এটা কিন্তু বেশ প্রমাণ হল যে, পুলোমা নামটা রাক্ষস-দৈত্যদের মধ্যে বেশ চলত। আমার তো বেশ সন্দেহ হয়, মহর্ষি ভৃগু হয়তো এক রাক্ষসীকেই বিয়ে করেছিলেন, হয়তো রাক্ষস-ঘরেরই এক পরমা সুন্দরী কন্যা তিনি। এ বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ এই মুহূর্তে কিছু দিতে পারছি না বটে, তবে পুরাণে ইতিহাসে এ তাবৎ যত ‘পুলোমা পাওয়া গেছে, সে ছেলেই হোক আর মেয়েই হোক, তারা সবাই রাক্ষস-ঘরের সন্তান। ঠিক এই দৃষ্টিতে দেখলে ভৃগুর স্ত্রী পুলোমার সঙ্গে রাক্ষস পুলোমার পূর্ব-পরিচয় থাকাও অসম্ভব নয় এবং সত্যি বলতে কি পূর্ব-পরিচয় ছিলও।
