শক্তপোক্ত একটা রাজ্যের উত্তরাধিকার বহন করে সংবরণ কী করে তার পৈতৃক রাজ্য খোয়ালেন, তার পিছনে আমাদের নিজস্ব একটা অনুমান আছে। আমাদের মহাকবি মহারাজ সংবরণের প্রেমের তপস্যায় মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন–
পত্নীবর মাগি
করেনি সম্বরণ তপতীর আশে
প্রখর সূর্যের পানে তাকায়ে আকাশে
অনাহারে কঠোর সাধনা কত?
নিঃসন্দেহে এই কবি-কল্পনার মধ্যে কিছু ‘অ্যানাক্রনিজ’ আছে। কারণ এখানে সংবরণের কথা যিনি সবিস্ময়ে স্মরণ করাতে চাইছেন তিনি দেবযানী। বৃহস্পতিপুত্ৰ কচকে যদি সংবরণের কথা স্মরণ করিয়ে ধিক্কার দিতে হয় তবে ক্রান্তদশী কবিকে দেবযানীর পাঁচ-সাত পুরুষ পরের ভবিষ্যতে দৃষ্টি দিতে হয়। কবি-ঋষির ভুল ধরার জন্য আমার কোনও আকুলতা নেই। আকুলতা যতটুকু আছে, তা হল সংবরণের প্রেমের তপস্যা নিয়ে। মহাকবি তার প্রেমের ব্যাপ্তিতে মুগ্ধ হয়েছিলেন বলেই, দেবযানীর মুখে তার অতি-কনিষ্ঠ প্রপৌত্রের উদাহরণটি সাজিয়ে দিতে দ্বিধা বোধ করেননি।
আমরা আমাদের গদ্যজাতীয় বক্তব্য পেশ করার সময় এই কাব্যপংক্তি স্মরণ করলাম এই কারণে যে, আমাদের অনুমান–হয়তো এ কথা শুনে মহাকবি আরও খুশি হতেন–আমাদের অনুমান-প্রোমের মুগ্ধতার কারণেই হয়তো হস্তিনাপুরের সম্রাট সম্বরণ তার রাজ্য হারিয়ে বসেছিলেন। কেমন করে?–তা একটু বলতেই হয়। সম্বরণের বেশ কয়েক পুরুষ পরে। পাণ্ডবরা যখন জতুগৃহের আগুন থেকে বেঁচে পাঞ্চালের পথে রওনা হয়েছেন, তখন গন্ধর্ব চিত্ররথের সঙ্গে তাদের দেখা হল। প্রধানত অর্জুনের সঙ্গেই তার কথাবার্তা হয়েছিল এবং বারবার তিনি অর্জুনকে ‘তাপত্য’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। ‘তাপত্য’ মানে তপতীর বংশজ। অর্জুন স্বভাবতই এই সম্বোধনে আকৃষ্ট হলেন এবং এই মিষ্টি সম্বোধনের কারণ জানতে চাইলেন। অর্জুন বললেন–সবাই আমাদের কৌন্তেয় বলে ডাকে, তাই তো বেশ ভাল। এই তপতী আবার কে, যার নামে ‘তাপত্য’ হলাম আমরা–তপতী নাম কা চৈ তাপতা যকৃতে বয়ম? গন্ধর্ব চিত্ররথ তথন তপতীর কাহিনী বললেন অর্জুনকে এবং আমাদের ধারণা এই কাহিনীর মধ্যেই মহারাজ সম্বরণের রাজ্য হারানোর সংকেত লুকিয়ে আছে।
রাজ্য লাভ করার সঙ্গে সঙ্গেই যে সম্বরণের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, তেমন কোনও সমাচার আমরা পাইনি। বরং প্রথম দিকে তিনি বেশ ভাল রাজ্যশাসন করেছিলেন। সামন্ত রাজারা তার বশংবদ ছিলেন। বন্ধু সজ্জনের প্রতি তার ব্যবহার ছিল চাঁদের জ্যোৎস্নার মতো কোমল-কমনীয়, আর দুষ্ট জনের প্রতি সংবরণ ছিলেন সূর্যের মতো প্রতাপী–স সোম অতি-কাত্বা আদিত্যমিক্ তেজসা। মর্ত্যভূমির রাজার এই অসামান্য ক্ষমতা দেখেই নাকি ভগবান সূর্যদেব তার মেয়েকে সংবরণের সঙ্গে বিয়ে দেবেন বলে ঠিক করেন।
সূর্যদেবের মেয়ের নাম তপতী। অপূর্ব তার রূপ, মোহন তার স্বভাব। তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুচারু বর্ণনা করতে গেলে দেবতা, মানুষ, যক্ষ-রাক্ষস-কারও মধ্যে তার কোনও উপমান খুঁজে পাওয়া যাবে না। তিনি প্রত্যঙ্গসুন্দরী–সুবিভক্তানবদ্যালী স্বসিতায়তলোচনা–এবং তার পিতা সূর্যদেব সারা দুনিয়ায় তার উপযুক্ত কোনও পাত্র খুঁজে পাননি। তিনি তাই মনে মনে সম্বরণকেই জামাতা হিসেবে ঠিক করে রেখেছিলেন, যদিও মুখে তাঁকে কিছু বলেননি।
তপতীর পিতা এই সূর্যদেব সূর্যবংশীয় কোনও নৃপতি কিনা, সে সম্বন্ধে আমাদের লৌকিক বিশ্বাস প্রবল। মহাভারতের কবি অবশ্য সূর্যপুত্রী তপতীর সঙ্গে ভবিষ্যতে সম্বরণের মিলন ঘটাবেন বলে সম্বরণকে পূর্বাহ্নেই সূর্যের উপাসক বলে চিহ্নিত করেছেন। বৈদিক যুগের অব্যবহিত পরের যুগে কোনও ক্ষত্রিয় রাজা সূর্যের উপাসক ছিলেন–এটা কোন আশ্চর্য কথা নয়। যাই হোক, সম্বরণ প্রতিদিনই পুষ্প-গন্ধ-মাল্যের উপচারে সূর্যপূজা করতেন সূর্যমারাধয়ামাস নৃপঃ সম্বরণস্তদা। কিন্তু এই সূর্যপূজার সঙ্গে সূর্যকন্যা তপতীর কোনও সংস্রব আপাতত ছিল না। সূর্যদেব নিজের মেয়ের সৌম্যসুন্দর রূপ দেখে উপযুক্ত পাত্রের চিন্তায় ভাবিত ছিলেন–নোপলেভে ততঃ শান্তিং সম্প্রদানং বিচিন্তয়–এবং সংবরণের কথা তিনি মনে মনে ভাবছিলেন, এই পর্যন্ত–তপত্যা সদৃশং মেনে সূর্যঃ সম্বরণং তদা–কিন্তু এদিকে অন্যরকম একটি ঘটনা ঘটল।
হস্তিনাপুরের সুযোগ্য শাসক সম্বরণ রাজা রাজ্যশাসনের ক্লান্তি কাটাতে মৃগয়ায় বেরলেন। মৃগয়া করতে করতে সম্বরণ পার্বত্য দেশের গভীর বনাঞ্চলের মধ্যে প্রবেশ করলেন। এদিকে পাহাড়ী পথের ধকল সহ্য করতে না পেরে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় ক্লান্ত তার অশ্বটি হঠাৎই মারা গেল। সম্বরণ আর কী করেন? পায়ে হেঁটেই তিনি পার্বত্য প্রদেশের এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াতে লাগলেন–পত্তামেব গিরৌ নৃপঃ–আর ঠিক এই সময়েই পাহাড়ের কোল আলো করা একটি রমণীকে দেখতে পেলেন সম্বরণ–যাঁর তুলনা তিনি নিজেই–দদশাসদৃশীং লোকে কন্যামায়ত লোচনা।
পাহাড়ের কোলে নির্জন বনভূমির মধ্যে একাকিনী সেই রমণীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সরণের মনে হল যেন আকাশ থেকে সূর্যের প্রভা খানিকটা খসে পড়েছে ভূঁয়ে রবেষ্টামিব প্রভা। সম্বরণের মনে হল—সূর্যের মতো দীপ্তিময় ব্যক্তিত্বের মধ্যে যদি চাঁদের কমনীয়তা মিশিয়ে দেওয়া যায়, তবেই যেন এ রূপের তুলনা হয়। সম্বরণ মুগ্ধ হলেন। নিষ্পলক দৃষ্টিতে রমণীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এক সময় দেখলেন–সোনার বরণ রমণীর রূপে বৃক্ষলতা-পাহাড়ও যেন কখন সোনা হয়ে গেছে। এই রূপের তুলনায় দুনিয়ায় তাবৎ সুন্দরীকে সম্বরণের মনে হল যেন খেদি-পেঁচি-অবমেনে চ তাং দৃষ্টা সর্বলোকেষু যোষিতঃ। মানুষের চক্ষু থাকার যা ফল, সে ফল সম্পূর্ণ লাভ করে সম্বরণ শুধু মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়েই রইলেন। তার যেন কোনও কাজ নেই, রাজধানীতে ফেরবার কোনও তাড়া নেই, অশ্বটিও মারা গেছে–যেন ভাল হয়েছে। তিনি শুধু দাঁড়িয়েই রইলেন–ন চচাল ততো দেশা বুবুধে ন চ কিঞ্চন।
