বেদ এবং ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলি ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যেদিন থেকে সৃঞ্জয় বৃহদিষুরা পঞ্চদেশ অধিকার করে পাঞ্চাল নামে পরিচিত হলেন, সেদিন থেকেই হস্তিনাপুরের রাজাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভাল ছিল না। শতপথ ব্রাহ্মণে দেখা যাচ্ছে–সৃঞ্জয়দের অধস্তন। স্থপতি বলে এক রাজাকে সৃঞ্জয়রাই সিংহাসনচ্যুত করেছিলেন। পাঞ্চাল দেশের এই গোষ্ঠীদ্বন্দের খবর যায় কৌরব রাজা প্রাতিপীয় বাহ্লীকের কানে–তদুহ বাহিকঃ প্রাতিপীয়ঃ শুশ্রাব কৌরব্যো রাজা। তিনি এই পাঞ্চালের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন এবং সৃঞ্জয়দের বিরুদ্ধে অপরুদ্ধ’ বা সিংহাসনচ্যুত রাজা স্থপতির জন্য কিছু করারও চেষ্টা করেন। কিন্তু এ সব তো অনেক পরের কথা। সৃঞ্জয় যখন পাঞ্চালে এসে রাজা হন; তখন কুরু, কৌরব–এঁরা কোথায়?
সৃঞ্জয় উত্তর পঞ্চালের অধিপতি হলেন। আর তার রাজধানীর নাম হল অহিচ্ছত্র। অহি’ মানে সর্প। এখানেও কি নাগজনজাতির বসতি ছিল? যাই হোক উত্তর পঞ্চাল জায়গাটা গঙ্গার উত্তর দিকে। ঠিক সৃঞ্জয়ের সময় থেকেই হস্তিনাপুরের রাজাদের সঙ্গে পাঞ্চালদের সম্পর্ক খারাপ হয়ে গিয়েছিল কিনা, সেটা সঠিক বলা না গেলেও তার ছেলে চ্যবন-পিজবনের সময় থেকেই এই দুই আর্যগোষ্ঠীর সম্পর্ক খারাপের দিকে যেতে থাকে। লক্ষণীয় ব্যাপার হল-ভগবান বলে চিহ্নিত কৃষ্ণ যে যদুবংশে জন্মেছিলেন সেই যদুবংশের যে মহান পুরুষেরা পাঞ্চাল সৃঞ্জয়ের সমসাময়িক ছিলেন তারা হলেন ভজিন, ভজমান, অন্ধক, দেবাবৃধ এবং বৃষ্ণি।
এই পাঁচ পুরুষের পিতা ছিলেন মহারাজ সাত–যিনি রাজত্ব করতেন মথুরা অঞ্চলে। সাদ্ভূত নিজে যেমন বিখ্যাত ছিলেন, ঠিক তেমনই ছিলেন তার পাঁচ পুত্র। পরবর্তীকালে কৃষ্ণকে সাত্ত্বত, বৃষ্টি অথবা অন্ধক বংশের ধুরন্ধর পুরুষ বলেই লোকে ডাকবে। যাই হোক, সাত্ত্বতের দ্বিতীয় পুত্র ভজমানের সঙ্গে পাঞ্চালরাজ সৃঞ্জয়ের দুই মেয়ের বিয়ে হয়। সৃঞ্জয়ের দুই মেয়ের নাম বাহ্যকা এবং উপবাহকা–ভজমানস্য সৃঞ্জয়ৌ বাহ্যকাথোপবাহাকা। আমাদের ধারণা-সৃঞ্জয় এই বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন নিজের স্বার্থেই। এই বৈবাহিক সম্পর্কের ফলে পিতৃপুরুষের গড়া নতুন রাজ্য পঞ্চাদেশকে তিনি অন্তত খানিকটা সুরক্ষিত রেখেছেন। যাদব-সাত্ত্বত-বৃষ্ণিদের সঙ্গে জোট বাঁধায় হস্তিনাপুরের ভরতবংশীয় রাজারা পঞ্চালদেশকে কোনওভাবে আঘাত করেননি বা করতে পারেননি।
সৃঞ্জয়ের পুত্র চ্যবন-পিজবন এবং তাঁর পুত্র সুদাস–দুজনেই কিন্তু রাজ্য বিস্তারে মন দেন। ঋগবেদে বলা হয়েছে–স্বয়ং ইন্দ্র সুদাস পৈজবনের জন্য নতুন জনপদ তৈরি করেন–কর্তা সুদাসে অহ বা উ লোক। পণ্ডিতেরা সন্দেহ করেন, পৈজবন সুদাস এতটাই শক্তিমান ছিলেন যে তিনি নিজের রাজ্য উত্তর পঞ্চাল অতিক্রম করে দক্ষিণ পঞ্চালও জিতে নিয়েছিলেন। ঋগবেদের খবর অনুযায়ী পৈজবন সুদাস অন্তত দুটি জনপদের একুশ জন লোককে হত্যা করেছিলেন। তার মধ্যে একটি জনপদ যদি দক্ষিণ পঞ্চাল হয় তবে আর একটি কোন জনপদ?
ঠিক এই জায়গা থেকেই আমাদের আবারও হস্তিনাপুরে ফিরে যেতে হবে। হস্তিনাপুরের রাজা হস্তীর পুত্র অজমীঢ়ের দুই পত্নী কেশিনী এবং নীলিনীর কথা বলতে বলতে আমরা পঞ্চালে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু অজমীঢ়ের তৃতীয়া পত্নী ধুমিনীর কথা আমরা বলিনি। হস্তিনাপুরের ভরতবংশ এই ধৃমিনীর বংশধারাতেই চলছিল–তস্মিন বংশঃ প্রতিষ্ঠিত। অজমীঢ়ের তৃতীয় পত্নী ধূমিনীর গর্ভজাত পুত্র হলেন ঋক্ষ। ঋক্ষর গায়ের রঙ ছিল ধোয়ার মতো। হস্তিনাপুরের রাজা হিসেবে ঋক্ষর তত সুখ্যাতি কিছু নেই। কিন্তু তার পুত্র সম্বরণ নানা কারণেই বিখ্যাত ছিলেন-ঋক্ষাৎ সংবরণো জজ্ঞে রাজ বংশকরঃ সুতঃ।
ঋক্ষপুত্র সংবরণ যখন হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসলেন, তখন তিনি ভরত এবং অজমীঢ়ের রাজ্যশাসনের গৌরবেই সম্পূর্ণ আপ্লুত ছিলেন। একবারও তিনি ভাবেননি যে, সার্বভৌম রাজা ভরতের পরম্পরাপ্রাপ্ত পৈতৃক রাজ্যের একটি প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ তৈরি হয়েছে পাশেই। পাঞ্চাল রাজ্যে পৈজবন সুদাসের ক্ষমতা তিনি একটুও পরিমাপ করতে পারেননি। মহাভারতের কবি আমাদের সংবাদ দিয়েছেন—ঋক্ষপুত্র সংবরণ যখন রাজা হলেন হস্তিনাপুরে, তখন বিরাট এক ধ্বংস নেমে এসেছিল হস্তিনাপুরে–সংক্ষয়ঃ সুমহানাসীৎ প্রজানা ইতি নঃ তম্। রাজ্যের সৈন্য-সামন্ত, রাজকোষ, মন্ত্রী-অমাত্য–সব কিছুর মধ্যেই এমন এক বিপর্যয় দেখা দিল যে, সংবরণ কোনওভাবেই রাজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলেন না। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ও কিছু ছিল–দেশে অনাবৃষ্টির ফলে শস্য ছিল না। তার ফল যা হয়, ব্যাধি-মৃত্যু লেগেই রইল হস্তিনাপুরের রাজমণ্ডলে। সংবরণের এই বেহাল অন্তঃরাষ্ট্রীয় অবস্থার সুযোগ নিল শত্রুসেনারা। তারা দলে দলে এসে ভরতবংশীয়দের আক্রমণ করল–অভ্যন্ ভারতংশ্চৈব সপত্নানাং বলানি চ।
এই শত্রুদের মধ্যে প্রথম যে দেশের নাম করতে হবে, সেটি হল পঞ্চাল রাজ। ঋগবেদে ভরতবংশীয়দের সঙ্গে সুদাসের সংঘর্ষের উল্লেখ থাকায় পণ্ডিতেরা মনে করেন–তখন পাঞ্চালের রাজা ছিলেন ওই সুদাস পৈজবন। তিনি তার চতুরঙ্গিনী সেনাবাহিনী নিয়ে হস্তিনাপুর আক্রমণ করলেন–অভ্যয়াৎ তঞ্চ পাঞ্চালো বিজিত্য তরসা মহীম্। পাঞ্চালদের ভয়ংকর আক্রমণের মুখে সংবরণ হস্তিনাপুর রক্ষা করতে পারলেন না। দশ অক্ষৌহিনী সেনার তোড়ে সংবরণ ভেসে গেলেন পৈতৃক রাজধানী থেকে। স্ত্রী-পুত্র সঙ্গে নিয়ে তাকে পালিয়ে যেতে হল। তাঁর সঙ্গে রইলেন বিশ্বস্ত পুরাতন কিছু বন্ধু-বান্ধব আর রইলেন পুরাতন মন্ত্রীমশাইরা।
