আমরা আগেও বলেছি এবং আবারও বলছি যে, হস্তিনাপুর প্রতিষ্ঠার আগে এই অঞ্চলে আর্যেতর নাগ জন-জাতির বসতি ছিল। নাগ অর্থ সর্প। তার মানে এই বিশেষ জনগোষ্ঠী সর্পের ‘টোটেম’ ব্যবহার করত। মহাভারতের অনেক জায়গায় হস্তিনাপুরকে সোজাসুজি নাগপুর’ বলা হয়েছে। মহারাজ পাণ্ডুর বিশেষণ ছিল ‘নাগপুরসিংহ’-তে নাগপুরসিংহেন পাণ্ডুনা করদীকৃতা। পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ ধরে নেওয়া যায়–মহারাজ হস্তী ওই জায়গাটি অধিকার করার পর নিজের নামে তার নামকরণ করেন হস্তিনাপুর। নাগ অর্থে যেহেতু হস্তীও বোঝায় তাই সর্পার্থক নাগ শব্দ পরিত্যাগ করে গজ বা হস্তিবাচক নাগ শব্দ প্রচলিত হল মহারাজ হস্তীর সম্মানে। কিন্তু পুরনো নামটাও স্মারক হিসেবে থেকে গেল-নাগসাহয়, নাগপুর ইত্যাদি। আবার নতুন নামও চলল–হস্তিনাপুর গজসাহয়, বারণসাহয় ইত্যাদি।
অন্য কোনও কীর্তি না থাকলেও শুধুমাত্র হস্তিনাপুর নগরীর জন্যই হস্তী বিখ্যাত হয়ে রইলেন। মহাভারতের বংশলতিকায় পুরু-ভরতের বংশে বিকুণ্ঠন নামে এক রাজার নাম এসেছে, যদিও প্রাচীন পুরাণগুলির সঙ্গে এই নাম মেলে না। পুরাণের পুরু-বংশপরম্পরায় হস্তীর তিন পুত্র–অজমীঢ়, দ্বিমীঢ় এবং পুরুমীঢ়। জ্যেষ্ঠ অজমীঢ়ের বংশধারাতেই পুরু ভরতবংশের রাজপরম্পরা চলতে থাকে হস্তিনাপুরকে কেন্দ্র করে। অজমীঢ় বিখ্যাত রাজা ছিলেন। পাণ্ডু, ধৃতরাষ্ট্র, যুধিষ্ঠির এঁদের বহুবার ‘অজমীঢ়’ বলে সম্মান করা হয়েছে। তবে রাজ্যবিস্তার, রাজ্যশাসন অথবা প্রজাপালনের জন্য অজমীঢ় যতখানি বিখ্যাত, তার চেয়ে তিনি অনেক বেশি বিখ্যাত বোধহয় তার পুত্র-পৌত্রদের জন্য।
অজমীঢ়ের তিন স্ত্রী-নীলিনী, কেশিনী এবং ধুমিনী। এই তিন স্ত্রীর গর্ভে অজমীঢ়ের যে সব পুত্র হয়, তারাই ভারতবর্ষের নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েন। এদিক দিয়ে মহারাজ অজমীঢ় একমাত্র যযাতির সঙ্গে তুলনীয়। কেশিনীর গর্ভে অজমীঢ়ের যে পুত্রটি জন্মগ্রহণ করেন, তার বংশের সকলেই ব্রাহ্মণ হয়ে যান। এঁদের বলা হয় ‘ক্ষত্রোপেত দ্বিজ’ অর্থাৎ ক্ষত্রিয়ের বংশে জম্মেও এঁরা রাজদণ্ড গ্রহণ না করে ব্রাহ্মণের যজ্ঞ-হোম-তপস্যার পথ বেছে নেন। কেশিনীর গর্ভজাত ওই পুত্রের নাম ক ছিল বলে এঁর বংশধরেরা সবাই কাণ্বায়ন ব্রাহ্মণ বলে সমাজে পরিচিত হন।
অজমীঢ়ের দ্বিতীয় স্ত্রী কেশিনীর কথা আগে বলে নিলাম। কারণ তাঁর প্রথমা স্ত্রী নীলিনীর গর্ভজাত পুত্রেরা অন্যদিক দিয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এইজন্য গুরুত্বপুর্ণ যে, এই বংশ হস্তিনাপুরে রাজত্ব করতেন না। প্রথমেই বলা ভাল যে, অজমীঢ়ের ঔরসে নীলিনীর গর্ভজাত পুত্র নীল এবং তার পুত্রেরা হস্তিনাপুরে থাকতেন কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। কিন্তু তাদের দু-তিন পুরুষ পরেই এই বংশে পাঁচটি পুত্র জন্মায়। তাদের নাম মুদগল, সৃঞ্জয়, বৃহদিষু, যবীনর এবং কৃমিলা (অথবা কপিল অথবা কম্পিল্য)। এই পাঁচ ছেলের বাবা হর্য মুখে মুখে সবাইকে বলতেন–আমার এই পাঁচ ছেলে অন্তত পাঁচটা রাজ্য রক্ষা করতে সমর্থ হবে–পঞ্চানামেতেষাং বিষয়াণাং রক্ষণায় অলমেতে মৎপুত্রাঃ। হস্তিনাপুরে পৌরবংশের প্রধান ধারায় যেহেতু এঁরা কোনও রাজ্য পাননি, তাই রাজ্যবিস্তার বা অন্য রাজ্য স্থাপন করার একটা প্রবল প্রচেষ্টা এঁদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। এঁরা প্রত্যেকেই যুদ্ধবীর ছিলেন এবং নিজেরা যুদ্ধ করে পাঁচটি ছোট ছোট রাজ্য অধিকার করেন। পাঁচজনই নিজেদের অধিকৃত ভূমি রক্ষা করতে সমর্থ (সংস্কৃতে অলং) ছিলেন বলে তাঁদের সম্পূর্ণ রাজ্যখণ্ডটির নাম পঞ্চাল (পঞ্চ+অলম)–অলং সংরক্ষণে তেষাং পঞ্চালা ইতিবিতাঃ।
ভবিষ্যতে পঞ্চ-পাণ্ডবের শ্বশুর এবং দ্রৌপদীর পিতা এই পঞ্চালের একতম সৃঞ্জয়ের বংশে জন্ম গ্রহণ করবেন বলেই পঞ্চাল বা পাঞ্চাল রাজ্যের প্রতিষ্ঠা আমাদের কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। যে পাঁচজন পঞ্চাল রাজার নাম আমরা করলাম, তাদের মধ্যে প্রথম হলেন মুদগল। তার ছেলেরা সবাই ব্রাহ্মণ হয়ে যান। এবং তারা মৌদগল্য বা মৌদগল্যায়ন ব্রাহ্মণ নামে পরিচিত হন। অর্থাৎ কাম্বায়ন ব্রাহ্মণদের মতো এঁরাও ক্ষত্রিয়-ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রোপেতা দ্বিজাতয়ঃ। এই মুগলের বংশেই পরে কুরু-পাণ্ডবদের প্রথম অস্ত্রগুরু কৃপাচার্য জন্মাবেন।
পাঞ্চাল-রাজ্যের প্রধান বংশটি চলতে থাকে সৃঞ্জয়ের ধারায়। মহাভারতে পাঞ্চালদের অন্তত একশবার সৃঞ্জয়ের বা সোমক নামে ডাকা হয়েছে। তার কারণ সৃঞ্জয়ের পুত্র ছিলেন চ্যবন পঞ্চজন অথবা চ্যবন পিজবন এবং তাঁর তিন পুরুষ পরেই সোমক। সৃঞ্জয় এবং সোমক পাঞ্চালদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজা বলেই পরবর্তীকালে দ্রুপদ রাজার দেশবাসীকে কখনও পাঞ্চাল, কখনও সৃঞ্জয় আবার কখনও সোমক বলে ডাকা হয়েছে। ঠিক যেমন যুধিষ্ঠিরকে ভারত, পৌরব অথবা অজমী বলে ডাকা হয়েছে।
ভৌগোলিক দিক থেকে পঞ্চাল রাজ্যটার অবস্থিতি ছিল হস্তিনাপুরের দক্ষিণ-পূর্বে। এখনকার দিনে উত্তরপ্রদেশের বেরিলি, বুদাউন, ফুরুখাবাদের সঙ্গে যদি রোহিলখণ্ডের বেশ। খানিকটা জুড়ে দেওয়া যায় তবেই আমরা সেকালের পঞ্চাল দেশটি পেয়ে যাব। এর পুবদিকে গোমতী নদী বয়ে চলেছে কুলুকুলু করে, পশ্চিমে মথুরা-শূরসেনের দেশ। পাঞ্চালের দক্ষিণে অভিশপ্ত চম্বল–দক্ষিণাংশাপি পাঞ্চালান্ যাবচ্চমতী নদী। আর উত্তরে, অথবা বলা উচিত পঞ্চাল-রাজ্যের উত্তর-পশ্চিমে বিখ্যাত সেই হস্তিনাপুর। যদিও বিশাল ঘন বনরাজির নিবিড় সন্নিবেশ পঞ্চাল রাজ্যটাকে যেন হস্তিনাপুর থেকে একটু আলাদা করে রেখেছে, তবে স্বীকার করতেই হবে ভরতবংশ অথবা অজমীঢ় বংশের হস্তিনাপুরী ধারা থেকে বেরিয়ে আসার ফলে এঁদের একটু স্বাতন্ত্র্যবোধ এবং অহমিকাও ছিল।
