ভরতবংশের ঊর্ধ্বতন পরম্পরায় এতদিন যা ঘটেছে, তাতে স্ত্রীলোকের রক্তবিশুদ্ধি খুব একটা থাকেনি। ব্রাহ্মণীর রক্ত, স্বর্গসুন্দরী স্বৰ্গবেশ্যার রক্ত, এবং অবশ্যই ক্ষত্রিয়ার রক্ত–সব কিছু মিলেমিশে বেশ একটা কঠিন-কোমল ধাতুর বংশ-পরম্পরা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এই প্রথম ঘটনা ঘটল যখন পুরুষের দিক থেকে একেবারে অন্য রক্ত-সংক্রমণ ঘটল ভরতবংশে এবং একে সংক্রমণ না বলে আহরণ বলাই ভাল। কারণ এক ঋষিপুত্রকে দত্তক নেওয়ার ফলে ভরতবংশে রীতিমত ব্রাহ্মণ্য সংক্রমণ ঘটে গেল। এর ফল হয়েছে সুদূরপ্রসারী। মহাভারতের মূল আখ্যানে মহামতি যুধিষ্ঠিরের ব্রাহ্মণোচিত আচার-ব্যবহার এবং ব্রাহ্মণ্য-ভাবনা দেখে পণ্ডিতেরা এই বংশ-সংক্রমণের ঘটনার কথা স্মরণ করেন এবং যুধিষ্ঠিরের ব্যবহারের তাৎপর্য খুঁজে পান। আমরা অবশ্য কথাটা বাড়াবাড়ি মনে করি। কেননা, যুধিষ্ঠিরের ব্রাহ্মণ-ভাবনার জন্য এত দূর না ছুটে, তার অতিপ্রিয় পিতামহ ব্যাসদেব পর্যন্ত গেলেই চলবে। তবুও এ ঘটনা উল্লেখযোগ্য এই কারণে যে–প্রসিদ্ধ চন্দ্রবংশের পরম্পরার মধ্যে একটি ব্রাহ্মণ-পুরুষ তার ব্রাহ্মণ্যের মূল প্রোথিত করে দিলেন। ক্ষত্রিয়ের রাজবংশে ব্রাহ্মণের বিন্দু পতিত হল। এ ঘটনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আরও বোঝা যাবে–যখন ভরতবংশে আবারও উপযুক্ত বংশধরের ‘ক্রাইসিস’ তৈরি হবে। বিচিত্রবীর্যের স্ত্রীদের গর্ভাধান করার জন্য যখন আবার ব্যাসদেবের ডাক পড়বে, তার আগে কুরুবৃদ্ধ ভীষ্মদেব এই ব্রাহ্মণ-বংশ-সংক্রমণের কথাই স্মরণ করেছিলেন।
আমার সহৃদয় পাঠককুল। এবারে একটা সুখবর দিই। ভরতবংশে বিতথের পুত্র ভূমন্যু বা ভুবমনু জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গেই আমরা কিন্তু বহুত বহু-আলোচিত হস্তিনাপুরের কাছাকাছি চলে এসেছি। ভূমন্যুর সঙ্গে যে রমণীর বিয়ে হয়, তিনি যদুবংশীয় দাশাহের ধারায় জন্মেছিলেন। তার নাম বিজয়া। তাদের ছেলের নাম সুহোত্র। সুহোত্র যে খুব নামী রাজা ছিলেন তা নয়। তবে সার্বভৌম ভরতের সাম্রাজ্য তিনি সম্পূর্ণ দখলে রাখতে পেরেছিলেন। রাজসূয়-অশ্বমেধের মতো বড় বড় যজ্ঞ করে জনমনে ভরতবংশের ‘ইমেজ’টাও অটুট ধরে রেখেছিলেন সুহোত্র। চতুরঙ্গিনী সেনা এবং রাজকোষ–দুটোই সমৃদ্ধ থাকার ফলে তিনি একটু নগরায়ণ বা ‘আরবানাইজেশনে’র দিকে মন দিয়েছিলেন বলে মনে হয়। কারণ মহাভারত মন্তব্য করেছে–তার আমলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় মনুষ্যকলিলা ভূশম–এবং সুহোত্র বহু জায়গায় পাষাণ-নির্মিত চৈত্যগৃহ তৈরি করান। জনসাধারণের চাহিদা অনুসারে এই চৈত্যগুলিকে পাষাণ-নির্মিত যজ্ঞ স্থানও মনে করা যেতে পারে কারণ, যজ্ঞপশুর বধ-বন্ধনের জন্য ঘূপ-কাও তৈরি করা হয়েছিল বহু জায়গায়–চৈত্যযুপাঙ্কিতা চাসীভূমিঃ শতসহস্রশঃ।
এখানে চৈত্য শব্দের সঙ্গে যুপ শব্দটি থাকায় ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতেরা চৈত্য শব্দটাকে যজ্ঞস্থান বলেই মনে করেছেন, কিন্তু আমাদের সবিশেষ ধারণা–এখনকার দিনের মতো একেবারে ‘পার্মানেন্ট’ একটা বাঁধানো জায়গায় যজ্ঞ করতে সেকালের ঋষি-মুনিরা পছন্দ করতেন না। কিন্তু যজ্ঞীয় পশুর বধ-বন্ধনের ব্যাপারটা যেহেতু খুবই সমস্যা তৈরি করত, তাই ব্রাহ্মণ্য-সংস্কৃত সমাজে জায়গায় জায়গায় যুপ নির্মাণ করাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু চৈত্য শব্দটা আমরা যাজ্ঞবল্ক্যসংহিতার নিয়মে জমির সীমা নির্ধারণ করার জন্য পাষাণ স্তূপ হিসেবেই মেনে নিতে চাই। ‘চৈত্য-য়ূপ’ শব্দের সঙ্গে ‘অঙ্কিত’ শব্দটিও আমাদের কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ‘অঙ্কিত’ শব্দের অর্থ চিহ্নিত। সুহোত্র রাজার নগরায়ণের পদক্ষেপে শতসহস্র পাষাণ-ক্রুপের বন্ধনে চিহ্নিত ভূমির পরিমাপই যদি এখানে গ্রাহ্য হয়, তবেই কিন্তু তার পরবর্তী বংশধরের সবচেয়ে বলিষ্ঠ পদক্ষেপটি সার্থক করে তুলবে।
সুহোত্র ইক্ষ্বাকু-বংশের কন্যা সুবর্ণাকে বিবাহ করেন এবং তাঁর গর্ভজাত পুত্রটির নামই হল হস্তী। হয়তো পিতার চৈত-যুপাঙ্কিত নগরায়ণের পথ ধরেই মহারাজ হস্তী হস্তিনাপুর-নগরীর প্রতিষ্ঠা করেন
সুহোস্যাপি দায়াদো হস্তী নাম বভূব হ।
তেনেদং নির্মিতং পূর্বং নাম্না বৈ হস্তিনাপুরম্।
ভরতবংশের ধারায় মহারাজ হস্তীকে লাভ করার পর আমরা এখন হস্তিনাপুরে দাঁড়িয়ে আছি।
.
৪৮.
সেই কবে প্রতিষ্ঠানপুরে চন্দ্রবংশীয় রাজাদের ঠিকানা পেয়েছিলাম। তারপরে যযাতির কনিষ্ঠ পুত্র পুরুর রাজত্ব শেষ হয়ে গেল, এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানপুরের ঠিকানাও হারিয়ে গেল। এতদিন পরে পুরু-ভরতবংশীয়দের নতুন রাজধানীর পত্তন করলেন মহারাজ হস্তী। হস্তীর পূর্বপুরুষ মহারাজ ভরত রাজ্য বিস্তারেই ব্যস্ত ছিলেন। গঙ্গা-যমুনার দোয়াব অঞ্চল থেকে সরস্বতী নদীর তীর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল জয় করে ভরত নিজের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু, তাঁর রাজধানীটির নাম আমরা পাইনি। পিতা সুহোত্রের নগরায়ণের পথ ধরে মহারাজ হস্তী শেষ পর্যন্ত নিজের নামে ভরতবংশের একটি রাজধানী প্রতিষ্ঠা করলেন। পণ্ডিতেরা বলেন–আধুনিক ‘মিরাট’ শহরের কাছাকাছি কোনও জায়গায় হস্তিনাপুরের ভৌগোলিক অবস্থান। স্থান নির্বাচনের মধ্যে যদি কোনও বুদ্ধি কৌশল কাজ করে থাকে, তবে রাজধানী হিসেবে হস্তিনাপুরের মতো একটা স্থান নির্বাচন করা যথেষ্ট রাজনৈতিক বোধের পরিচয়। কেননা, অতি আধুনিক কালেও আমাদের ভারতবর্ষের যে রাজধানী, সেই দিল্লি থেকে হস্তিনাপুর খুব দূরে নয়।
