ভরদ্বাজ ব্রাহ্মণ হওয়া সত্ত্বেও যেহেতু ক্ষত্রিয় ভরতের পিতৃত্ব স্বীকার করেছেন, তার ফলে ব্রাহ্মণ ভরদ্বাজ ক্ষত্রিয়ের সংজ্ঞা লাভ করেন–তস্মাদ দিব্যো ভরদ্বাজো ব্রাহ্মণ্যাৎ ক্ষত্রিয়ো ভবৎ। পৌরাণিকেরা অবশ্য ভরদ্বাজের ব্রাহ্মণত্বও পুরোপুরি হরণ করেননি। তারা বলেছেন- ভরদ্বাজ দ্বিপিতৃক–একদিকে বৃহস্পতিও তার পিতা, অন্যদিকে মহারাজ ভরতও তাঁর পিতা। আরও একটা বিশেষণ ভরদ্বাজের কপালে জুটেছে, সেটা হল–দ্ব্যামুয্যায়ণ –অর্থাৎ দো-আঁশলা। মৎস্যপুরাণ বলেছে–ভরদ্বাজের বংশে ক্ষত্রিয়রাও জন্মেছেন, ব্রাহ্মণেরাও জন্মেছেন-তস্মাদপি ভরদ্বাজা ব্রাহ্মণাঃ ক্ষত্রিয়া ভুবি। আমাদের ধারণা ভরতের। পিতৃত্ব স্বীকার করার ফলে ভরতবংশে জাত পুত্রগুলিই ভরদ্বাজের ক্ষত্রিয় বংশ। আর বিতথকে সিংহাসনে বসিয়ে বনগমন করার পর ভরদ্বাজের যে সব পুত্র জন্মেছেন, তারাই ব্রাহ্মণ। কিন্তু ভরদ্বাজের দুর্ভাগ্য, তিনি দ্বিপিতৃক হওয়ার ফলে তার পুত্রেরা ব্রাহ্মণই হোন, আর ক্ষত্রিয়ই হোন, তারা সবাই দো-আঁশলা–দ্ব্যামুয্যায়ণকৌলীনাঃ স্মৃতাস্তে দ্বিবিধেন চ।
আরও একটা কথা এখানে না বললে নয়। আমরা এতক্ষণ মহারাজ ভরতের মরুৎসোম যজ্ঞ, মরুগণের তুষ্টি এবং তার ফলে ঋষি ভরদ্বাজের ক্ষত্রিয় বংশে সংক্রমণের কথা বললাম পৌরাণিকদের যুক্তি মেনে। তাদের ঈঙ্গিত বক্তব্য আমরা একটু পরীক্ষা করে পেশ করেছি মাত্র। কিন্তু লৌকিক দৃষ্টিতেও ভরতের পুত্র-অন্বেষণের একটা ব্যাখ্যা দেওয়া যায় এবং সেটা। পারজিটার সাহেবই কিন্তু ধরেছেন ভাল। অবশ্য আমাদের প্রাচীন ব্রাহ্মণ গ্রন্থ ঐতরেয় ব্রাহ্মণের সাক্ষীটা এখানে খুব জরুরী। ঐতরেয় বলেছেন- মামতেয় দীর্ঘতমা, অর্থাৎ সেই উতথ্যের স্ত্রী মমতার ছেলে দীর্ঘতমা, যিনি বৃহস্পতিকে রতিক্রিয়ায় বাধা দিয়ে অভিশাপ কুড়িয়েছিলেন সেই দীর্ঘতমা ভরত দৌষ্যক্তির ঐন্দ্র মহাভিষেক সম্পন্ন করেন।
ঐন্দ্র মহাভিষেক এমনই এক অভিষেক যা হয়তো মহারাজ ভরতের সার্বভৌমত্ব লাভের পর সংঘটিত হয়েছিল। কারণ স্বর্গরাজ্যে ইন্দ্রের সার্বভৌম প্রতিষ্ঠার প্রতিরূপেই মর্ত্যলোকের রাজার ঐন্দ্র মহাভিষেকের আচরণ অনুষ্ঠিত হয়। ধারণা করা যায়-ভরত কথঞ্চিৎ বৃদ্ধ হবার পর দীর্ঘতমা মামতেয় এই অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন। এখন একটা সন্দেহ উপস্থিত হবে। কারণ পুরাণে দীর্ঘতমা এবং বৃহস্পতির পুত্র ভরদ্বাজ–দুজনকেই আমরা যখন জন্মাতে দেখেছি, তখন ভরত-মহারাজের বয়স হয়ে গেছে। তিনি তখন উপযুক্ত উত্তরাধিকারীর সন্ধানে মরুৎসোম যজ্ঞ করছেন–তস্মিন্ কালে তু ভরতো মরুদ্ভিঃ ক্রতুর্ভিঃ ক্ৰমাৎ। এদিকে বৃদ্ধ দীর্ঘতমা, যিনি হয়তো মহারাজ ভরতের বংশগত পুরোহিত, তিনি বৃদ্ধ ভরতের মহাভিষেক সম্পন্ন করছেন–ঐতরেয় ব্রাহ্মণের এই সংবাদ কিন্তু পুরাণের সংবাদের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাপারটাকে এইভাবে ব্যাখ্যা করা যায় মূল দীর্ঘতমা এবং মূল ভরদ্বাজও ভরতের থেকে বয়সে অনেক বড় ছিলেন। পারজিটার লিখেছেন–The aged Dirghatamas, and Bhardvaja also, may thus have lived till the beginning of Bharata’s reign. Though that, the first Bharadvaja could not have been given in adoption to Bharata, yet his grandson (or perhaps great grandsons) may have been so given, and this…strongly suggests that it was Vidathin (আমাদের পৌরাণিক ভাষায় ‘বিতথ’) who was adopted.
পারজিটার সাহেবের আসল অনুমানের কথাটা এখনও বলিনি। কিন্তু সেটাই লৌকিকভাবে ভরতের এই পুত্রান্বেষণের ঘটনাটা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত করে। পারজিটার অনুমান করেন যে, বৃহস্পতি, সংবর্ত–এঁরা সবাই ছিলেন তুর্ববংশীয় মরুত্ত রাজার দেশের লোক। বৃহস্পতি, সংবর্ত এবং মরুত্তের কাহিনী আমরা পূর্বে বলেছি–তাতে এই অনুমানটা যথেষ্ট সমর্থনযোগ্যই মনে হয়। বৃহস্পতিই মরুত্ত রাজার বংশানুক্রমিক গুরু ছিলেন-তাও আমরা পূর্বে বলেছি। স্বাভাবিকভাবেই ধারণা হয়, বৃহস্পতি যে অন্যায়ই করে থাকুন অথবা মমতার ব্যাপারে যাই। ঘটে থাকুক, ভরদ্বাজ এই মরুত্ত রাজার দেশেই জন্মগ্রহণ করেন এবং তার পুত্র বা প্রপৌত্র বিতথ ভরদ্বাজও জন্মান ওখানেই। ভরতের পুত্রজন্ম যখন বিফল হল, তখন বৃদ্ধ। দীর্ঘতমা–যিনি ভরতের ঐন্দ্র মহাভিষেক সম্পন্ন করেন–তিনি হয়তো তখন তার আত্মীয়কল্প যুবক ভরদ্বাজকে দত্তক নিতে বলেন। মহারাজ ভরত যেহেতু মরুত্ত রাজার দেশ থেকে ভরদ্বাজকে নিয়ে আসেন অতএব পৌরাণিকেরা ভুল করে অথবা সাধারণ ঘটনার দেবায়ন ঘটিয়ে বলেন-মরুণ ভরতের মরুৎসোম যজ্ঞের প্রক্রিয়ায় তুষ্ট হয়ে ভরদ্বাজকে ভরতের পুত্রত্বে সংক্রমিত করেন। মরুৎ আসলে মরু রাজা।
পারজিটার সাহেবের এই অনুমান আমরা সমর্থন করি অন্য আরও একটা কারণে। আমাদের ধারণা–ভরতের পিতা দুষ্যন্ত মরুত্ত রাজার ঘরে মানুষ হয়েছিলেন। আজ এতদিন পরে মহারাজ ভরত যখন নিজের অযোগ্য পুত্রদের অসামর্থ্যে হতাশ বোধ করছিলেন, তখন সেই পালক পিতামহ মরুত্ত রাজার দেশ থেকে ভরদ্বাজ এবং তাঁর পুত্র বিতথকে নিয়ে এসে একভাবে পিতৃঋণ শোধ করলেন। হতেও বা পারে, এবং এই কারণেই সাহেবের অনুমানটা আমরা এখানে সমর্থনই করি।
