উতথ্য এবং মমতার সন্তান গভীর তমোময় দৃষ্টি নিয়ে জন্মালেন। তাঁর নাম হল দীর্ঘতমা। আর বৃহস্পতির রতিমুক্ত তেজ থেকে অন্য একটি শিশুর জন্ম হল; উতথ্যপত্নী মমতার কোনও মমতা সে পেল না। তার জন্মমাত্রেই মমতা বৃহস্পতিকে বললেন–এটি তোমার জারজ সন্তান (দ্বাজ) একে তুমিই ভরণ-পোষণ কর, ভর দ্বাজং বৃহস্পতে। মমতা তৎক্ষণাৎ বৃহস্পতির পুত্রকে রেখে চলে গেলেন। এবং বৃহস্পতিও সেখানে এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন না। চলে গেলেন তিনিও। কিন্তু যাবার আগে মমতা যে কথাটি বলে গিয়েছিলেন—জারজকে তুমিই মানুষ কর–ভর দ্বাজম–শুধু সেই দুটি শব্দের অর্থ-স্মৃতি বহন করে সেই কুমার মাতা-পিতার মেহরসে বঞ্চিত হয়ে একা পড়ে রইল–তার নাম হল ভরদ্বাজ।
বায়ু-পুরাণ, মৎস্যপুরাণ খবর দিয়েছে–ঠিক এই সময়েই সার্বভৌম মহারাজ-ভরত পুত্রলাভের জন্য মরুৎসোম যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। মরুগণ এই যজ্ঞের প্রক্রিয়ায় খুশি হয়ে মাতা-পিতার ত্যাগ করা সেই শিশু ভরদ্বাজকে ভরত-মহারাজের হাতে তুলে দেন। উপহারের মতো–উপনির্ভরদ্বাজং পুত্ৰার্থং ভরতায় বৈ। মহর্ষি অঙ্গিরার বংশে জাত বৃহস্পতির ঔরস পুত্র ভরদ্বাজকে লাভ করে মহারাজ ভরত খুশি হয়ে কুমার ভরদ্বাজকে বললেন–আমার সব পুত্রের জন্মই যখন বিতথ অর্থাৎ বৃথা হয়ে গেছে, তখনই আমি তোমাকে লাভ করেছি। অতএব আজ থেকে তোমার নাম হোক ‘বিতথ ভরদ্বাজ’।
পাঠক। আপনাকে মহাভারতের সেই পুর্বোদ্ধৃত পংক্তিটিকে ‘বিতথ’ শব্দটি খেয়াল রাখতে বলেছিলাম। এতক্ষণে সেই বিতথ শব্দের সঙ্গে আরও একটি শব্দ জুড়ে যে নামটি পাওয়া গেল, তিনিই মহারাজ ভরতের নবলব্ধ পুত্র ‘বিতথ ভরদ্বাজ’। ভূমনুর প্রশ্ন এখনও আসেনি। কারণ তার আগে আরও দুটো কথা বলতে হবে। এবং এই ‘বিতথ ভরদ্বাজ’কে নিয়েও কিছু গবেষণা এখনও বাকি আছে।
প্রথমেই ভাবতে হবে–এই বৃহস্পতি, এই দীর্ঘতমা এবং এই ভরদ্বাজই মূল বৃহস্পতি, মূল দীর্ঘতমা এবং মূল ভরদ্বাজ কি না। হতেই পারে না। কারণ আমরা চন্দ্রবংশের উৎপত্তিকালে বৃহস্পতিকে পেয়েছি, আমাদের ভরত রাজা তখন কোথায়? বস্তুত এখানে বৃহস্পতি, দীর্ঘতমা বা ভরদ্বাজ বলতে তাঁদের বংশধর কাউকে বুঝতে হবে। ভেবে দেখুন, রামচন্দ্রের পূর্ব পিতামহ দিলীপ-রঘু–এঁদেরও পুরোহিত ছিলেন বশিষ্ঠ মুনি, আবার দশরথ-রামচন্দ্রের পুরোহিতও ছিলেন বশিষ্ঠ মুনি। এরা তো একই লোক হতে পারেন না। প্রাচীন ঋষিবংশে বশিষ্ঠর বংশজরা যেমন সবাই বশিষ্ঠ, তেমনি, বৃহস্পতি, দীর্ঘতমা বা ভরদ্বাজের বংশধরেরাও একেক জন বৃহস্পতি, দীর্ঘতমা এবং একেক জন ভরদ্বাজ। এখন ‘বিতথ ভরদ্বাজ’কে নিয়ে আরও দুটো কথা বলি।
কথা হল–মহারাজ ভরত যাকে দত্তক হিসেবে পেলেন-তার নামই ভরদ্বাজ? অথবা তার নাম বিতথ? নাকি এটা ভরদ্বাজের বিশেষণ অথবা অন্য কোনও নাম? প্রশ্ন আছে আরও। মহর্ষি ভরদ্বাজই কি এর পরে প্রসিদ্ধ ভরতবংশের রাজা হয়ে বসলেন, নাকি তার কোনও ছেলে? মহাভারতের কবি এখানে একটি ফাঁক রেখে বলেছেন–ভরদ্বাজের কাছ থেকে ভূমন্যুকে লাভ করলেন ভরত। অন্যদিকে মৎস্যপুরাণ বলেছে–ভরতের পর বিতথ নামে ভরদ্বাজই রাজা হলেন-ততন্তু বিতখো নাম ভরদ্বাজো নৃপো’ভবৎ। কিন্তু এর দুই পংক্তি পরেই মৎস্যপুরাণ বললেন–বিতথ জন্মগ্রহণ করলে মহারাজ ভরত স্বর্গারোহণ করেন–ততো জাতে হি বিতথে ভরতশ্চ দিবং যযৌ। আবার তারপরেই–ভরদ্বাজও পুত্রকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করে স্বর্গস্থ হলেন–ভরদ্বাজো দিবং জাতভিষিচ্য সুতং ঋষিঃ।
বায়ুপুরাণের শ্লোকগুলিও প্রায় মৎস্যপুরাণের মতোই। কিন্তু একটাই বাঁচোয়া–বায়ুপুরাণ মৎস্যপুরাণের মতো একবারও ওই কথাটি বলেনি যে–তারপর বিতথ নামে ভরদ্বাজ রাজা হলেন। আসলে এইখানেই মৎস্যপুরাণে একটি লিপিপ্রমাদ আছে। মৎস্যপুরাণের পংক্তিতে ‘ভরদ্বাজঃ’ শব্দটি হবে ‘ভারদ্বাজঃ’–যার অর্থ ভরদ্বাজের পুত্র রাজা হলেন–ততন্তু বিতথে নাম ভারদ্বাজো নৃপোবৎ। আমরা যে ঠিক বলছি, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ রয়ে গেছে হরিবংশে। সেখানে পরিষ্কার বলা আছে–মহারাজ ভরতের পুত্ৰজন্ম বৃথা হল এবং মহর্ষি ভরদ্বাজের এক পুত্র, যাঁর নাম বিতথ–সেই বিতথ জন্মালেই উপযুক্ত উত্তরাধিকারী লাভ করে ভরত স্বর্গারোহণ করলেন–ততন্তু বিতথো নাম ভরদ্বাজ তো’ভবৎ। অন্যদিকে ছেলে বিথকে সিংহাসনে বসিয়ে মহর্ষি ভরদ্বাজও বনের পথে পা বাড়ালেন।
এর পরে মৎস্যপুরাণেও আর কোনও ভুল নেই, বায়ুপুরাণেও আর কোনও ভুল নেই, হরিবংশে তো নেইই। দেখা যাচ্ছে-মৎস্য এবং বায়ু সমস্বরে বলছে-বিতথের ছেলের নাম হল ভুবমন যাকে মহাভারত বলেছে ভূমন–বিতথস্য তু দায়াদো ভুবমনর্বভূব হ (ভুবমহাযশাঃ)।
আমরা বেশ বুঝতে পারছি–বায়ু, মৎস্য, হরিবংশ, মহাভারত-একেক পুরাণের একেক কথা উদ্ধার করে আমরা সুকুমারমতি পাঠকের মাথাটা একেবারে গণ্ডগোল পাকিয়ে দিয়েছি। কিন্তু এতে করে বোঝবার ব্যাপার আছে একটাই। মহারাজ ভরতের মরুৎসোম যজ্ঞে প্রীত হয়ে মরুগণ পিতৃমাতৃপরিত্যক্ত ভরদ্বাজকে ভরতের পুত্রত্বে স্থাপন করলেন–ততো মরুদ্ভিরানীয় পুত্ৰস্তু স বৃহস্পতেঃ। সংক্রামিতো ভরদ্বাজ। কিন্তু পুরাণগুলির নানা বয়ান থেকে যেহেতু বোঝা যায় যে, ভরদ্বাজ ভরতের সিংহাসনে বসেননি, তাতে বোধহয়, ভরত ভরদ্বাজকেও ভালরকম পরীক্ষা করে দেখেছেন এবং তার পুত্র বিতথ জন্মালে–সেই বিতথকেই তিনি নিজের উত্তরাধিকারী বলে মনোনীত করেছেন।
