মহাভারতের কবি ভরতবংশের উত্তরাধিকারের ব্যাপারটা যত তাড়াতাড়ি সেরে ফেললেন, ব্যাপারটা কিন্তু তত সহজ নয়। মহাভারতের বক্তব্য থেকে আপাতত যেন মনে হতে পারে মহারাজ ভরত নিয়োগপ্রথায় ভরদ্বাজের কাছ থেকে একটি পুত্র লাভ করলেন। কিন্তু তা যদি হত, তবে তার উল্লেখ থাকত। কারণ, নিয়োগের ঘটনা লুকোনোর প্রয়োজন নেই মহাভারতের কবির। কিন্তু তাহলে প্রশ্ন হয়–হলটা কী তাহলে? হঠাৎ করে ভরদ্বাজকেই বা তিনি পেলেন কোথায়? ঘটনার তো পরম্পরা থাকবে একটা। সত্যি কথা বলতে কী-মহাভারতের বক্তব্যের সঙ্গে যদি অন্যান্য পুরাণগুলির বক্তব্য এখানে মিলিয়ে নেওয়া যায়, তাহলেই হয়তো সত্য কথাটা বেরিয়ে আসতে পারে, এমনকি তাতে মহাভারতের আকস্মিক বক্তব্যটা ভুলও প্রমাণ হয়ে যেতে পারে।
পুরাণগুলি যেহেতু রাজবংশ এবং ঋষিবংশের তালিকা নথিবদ্ধ করে রাখার ব্যাপারে প্রায় ঐতিহাসিকদের মতো কাজ করছে, তাই এ বিষয়ে পুরাণগুলির সাহায্য আমাদের নিতেই হবে। মহাভারতের যে দুটি পংক্তি এখানে আমরা উদ্ধার করেছি, তার মধ্যে খুব খেয়াল করার মতো দুটি শব্দ আছে–একটি হল ‘বিতথ’, দ্বিতীয়টি হল ‘ভূমন্যু’। এই শব্দ দুটি পরে আসবে। এবারে মূল প্রস্তাবে আসি।
বংশানুক্রমে অনুপযুক্ত রাজার রাজত্ব প্রজাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয় বলেই ভরত তার উত্তরাধিকারী খুঁজে বেড়াতে আরম্ভ করলেন। এই উত্তরাধিকারী সন্ধানের চেষ্টাটাই মহাভারতে ভরতের অনুষ্ঠিত যাগযজ্ঞের প্রতিরূপে ধরা আছে–ততো মহদ্ভিঃ ক্রতুভিরিজানোনা ভরতস্তদা। যদি যজ্ঞের ফলে বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে বেশির ভাগ পুরাণে দেখা যাচ্ছে–দেবতারা সন্তুষ্ট হয়ে বৃহস্পতির পুত্র ভরদ্বাজকে ভরতের পুত্রত্বে স্থাপন করেন :
ততো মরুদ্ভূরানীয় পুত্ৰঃ স তু বৃহস্পতেঃ।
সংক্রামিতো ভরদ্বাজো মরুদ্ভিৰ্ভরতস্য তু৷৷
তার মানে মহাভারতের শূন্যতা খানিকটা পূরণ হল, অর্থাৎ ভূমনকে প্রথমেই পাওয়া যাবে না, ভরদ্বাজই ভরতের পুত্ররূপে কল্পিত হলেন। এখানে আমাদের একটু পৌরাণিক প্রসঙ্গের অবতারণা করতেই হবে–তবে বিনীত অনুরোধ, যেন খেই হারিয়ে না যায়।
প্রথম কথা হল ভরদ্বাজ কে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আমাদের একটু বিব্রতও হতে হবে। তবু না বললে পুরাণকাহিনীর পরম্পরা এবং রাজবংশের পরম্পরা–কোনওটাই বোঝ যাবে না। সমস্ত প্রধান পুরাণেই যে কাহিনী আছে তা মোটামুটি গবেষণা করলে এই দাঁড়ায়–দেবগুরু বৃহস্পতির এক ভাইয়ের নাম আমরা পূর্বে বলেছি। তিনি সংবর্ত, যিনি তুর্বসুবংশীয় মরুত্ত রাজাকে যজ্ঞ করিয়েছিলেন। এই বৃহস্পতির বড় ভাই ছিলেন উতথ্য বা উচথ্য–উতথ্যস্য যবীয়াংস্তু পুরোধাস্ত্রিদিবেকর্মা। পুরাণকারেরা এই উতথ্য নামটিকে উশিজ বানিয়ে দিয়েছেন এবং তার কারণ হল– বেদে উতথ্য এবং উশিজ–এই দুটি নামই পাওয়া যায় বৃহস্পতির পূর্বপুরুষ হিসেবে। উশিজ খুব সম্ভবত উতথ্য, বৃহস্পতি এবং সংবর্তেরও পিতা ছিলেন, কিন্তু পুরাণকারেরা ভুলবশত উশিজকে বৃহস্পতির বড় ভাই বানিয়ে দিয়েছেন। মহাভারতের কবির মাথা এ বাবদে ঠিক আছে। তার মতে উতথ্য বৃহস্পতির বড় ভাই এবং তার স্ত্রীর নাম মমতা-মমতা নাম তস্যাসী ভার্যা পরমসম্মতা।
সংবর্তের কথা, পুর্বে বলেছি যে, বৃহস্পতি দেবতাদের গুরু নির্বাচিত হলে তিনি ছোট ভাই সংবর্তের জীবন দুর্বিষহ করে দিয়েছিলেন। তার স্ত্রীর সম্বন্ধেও বৃহস্পতির যে কিছু লালসা কাজ করেছে তারও প্রমাণ তখন আমরা পেয়েছি। লক্ষণীয় ব্যাপার হল–বৃহস্পতির ইন্দ্রিয়বৃত্তি কখনই খুব একটা সংযত ছিল না এবং তিনি বড় ভাইয়ের স্ত্রীর প্রতিও সমানভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। অর্থাৎ বৃহস্পতির এই অভ্যাস ছিল। কোনও এক সময়ে–হয়তো উতথ্য তখন মারা গেছেন–বৃহস্পতি তার অগ্রজের পত্নী মমতাকে দেখে মোহিত হন এবং তাঁকে বলেন–তুমি বেশ ভাল করে সেজেগুজে এস তো দেখি, আমি তোমার সঙ্গে মিলন প্রার্থনা করি। মমতার গর্ভে সেই সময় তার প্রয়াত স্বামীর পুত্র রয়েছে। অতএব অবাক-বিস্ময়ে কাকুতি-মিনতি করে মমতা বৃহস্পতিকে বললেন–তোমার ভ্রাতার সন্তান আমার গর্ভে। তুমি বিরত হও বৃহস্পতি–অন্তর্বত্নী ত্বহং ভ্ৰাত্রা জ্যেষ্ঠেরম্যতামিতি।
মমতা আরও বললেন–যে ছেলে আমার গর্ভস্থ হয়ে আছে, সে গর্ভে থেকেই ষড়ঙ্গ বেদ উচ্চারণ করছে। এখন এই অবস্থায় যদি তুমিও আমার সঙ্গে মিলিত হও, তাহলে দুজনের সন্তান তো আর একই গর্ভে ধারণ করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে-দ্বয়োর্নাস্ত্যত্র সম্ভবঃ। মমতা অনুনয় করে বললেন–আমার এই সময়টা পার হয়ে যাক, তারপর তুমি যা বলবে, তাই করব–অস্মিবে গতে কালে যথা বা মন্যসে বিভো। বৃহস্পতি বললেন–তোমার কাছে আমি জ্ঞান শুনতে চাইনি–বিনয়া নোপদেষ্টব্যঃ–যা বলছি তাই কর। স্বামীহীনা অরক্ষিতা মমতাকে বৃহস্পতি কিছুতেই মুক্ত হতে দিলেন না। অকামা রমণীর প্রতি বলপ্রয়োগ করে তিনি উপগত হলেন সকামেস বভূব ততঃ কামী তয়া সার্ধম অকময়া।
বৃহস্পতি যখন কামনার চরম মুহূর্তে পৌঁছেছেন, সেই সময় একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। মমতার গর্ভস্থ সন্তান গর্ভ থেকেই বলে উঠল-মহাশয়! আপনি এইভাবে কামপ্রবল হয়ে উঠবেন না। আমি এই গর্ভে পূর্বাহ্নেই উপস্থিত, এখানে দুজনের স্থান হবে না–ভোস্তাত মা গমঃ কামং…পূর্বঞ্চাহমিহাগতঃ। মহাভারত জানিয়েছে–বৃহস্পতি তেজোমুক্ত হবার আগেই মমতার গর্ভস্থ মুনি-সন্তান নিজের পা দিয়ে বৃহস্পতির কামগতি রুদ্ধ করলেন পামারোধয় মার্গং শুক্ৰস্য চ বৃহস্পতেঃ। বৃহস্পতির তেজ অস্থানে পতিত হল এবং অভীষ্ট কামগতি রুদ্ধ হওয়ায় তিনি ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে মমতার গর্ভস্থ সন্তানকে অভিশাপ দিলেন–তুই যখন সমস্ত প্রাণীর পরমেপ্সিত এই রতিমুক্তির কালে আমাকে এইভাবে বাধা দিলি, অতএব তুই অন্ধ হয়ে জন্মাবি–প্রতিষেধসি তস্মাত্ত্বং তমো দীর্ঘং প্রবেক্ষ্যসি।
