আমরা জানি এবং পূর্বে বলেছি যে, এর আগে যাদব-হৈহয়দের তাড়নায় তথা ইস্ফাকুদের শক্তিতে গঙ্গা-যমুনার অন্তর্বর্তী অঞ্চল থেকে পুরুবংশীয়রাই সরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। স্বয়ং ভরতের বাবা দুষ্যন্ত পর্যন্ত নিজের পৈতৃক রাজ্য পাননি। প্রতিষ্ঠানপুরের রাজধানীটি অনেক আগেই খোয়া গেছে। অতএব এটাই স্বাভাবিক যে, সার্বভৌম রাজা হিসেবে দৌষ্যন্তি ভরত পূর্বশত্রুতার শোধ তুলবেন এখন। ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে শতপথের প্রমাণটা এতই বেশি যুক্তিযুক্ত যে, আমরা অনুমান করতে পারি যে, শুধু গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতীর বিস্তীর্ণ তীরাঞ্চলই নয়, মহারাজ ভরত যদুবংশীয়দের রাজ্যও বেশ খানিকটা অধিকার করে নিয়েছিলেন। পুরাতন শত্রুতার প্রতিশোধ হিসেবে। এই রাজ্য যাদবাধ্যুষিত মথুরা-শৌরশেনী অঞ্চলেরই খানিকটা হবে হয়তো।
মনে রাখতে হবে–চন্দ্র-পৌরববংশীয় কোনও রাজার পক্ষে এই প্রথম এত বড় একটা রাজ্য দখল করে তাকে শাসন ব্রাও সম্ভব হল। এইজন্যই ভারত এক সার্বভৌম রাজা। তার নামেই এই ভারতবর্ষের প্রথম imperial unity এবং তাঁর নামেই ভারত বংশ, মহাভারত, ভারত-যুদ্ধ। রাজা হিসেবে ভরত যদি শুধু এক সাম্রাজ্যবাদী প্রজাশোষক রাজা হতেন, তাহলে এতক্ষণে তাঁর আলোচনা বৃথা হয়েছে। বস্তুত তাঁর মহত্তের এবং রাজকীয় প্রতিষ্ঠার আরও বিশাল এক কীৰ্তিভূমি আছে, যা আধুনিক রাজনৈতিক নেতাদের পর্যন্ত অতিশয় লজ্জা দেবে। পরবর্তীকালে দুর্যোধন-পিতা ধৃতরাষ্ট্র বা তাঁর পুত্রদের বারবার যে কথা বলা হয়েছে–দেখ, এটা ভরতবংশীয়দের উপযুক্ত নয়–এই নিন্দাবাদের সূত্র বোধহয় সার্বভৌম ভরতের অন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠায়।
.
৪৭.
সাতচল্লিশ কোনও রাজা-মহারাজা যদি বিখ্যাত হন, তবে তার খ্যাতির পিছনে একটি বৈশিষ্ট্য থাকে। মহারাজ ভরতের বহুকাল পরের উত্তরপুরুষ পাণ্ডব যুধিষ্ঠির যখন রাজসূয় যজ্ঞ করতে উদ্যত হয়েছিলেন, তখন মহামতি কৃষ্ণ তাকে কতগুলি বিশিষ্ট রাজার নাম করে বলেছিলেন– ইক্ষ্বাকুবংশীয় মান্ধাতা শত্রুজয়ের মাধ্যমে নিজের কীর্তি স্থাপন করেছিলেন। প্রজাপালনের সাধনে ভগীরথ, তপস্যায় কার্তবীর্য অর্জুন, তুর্ক-বংশীয় মরুত্ত অতুল সম্পত্তি আহরণ করে। যশস্বী হয়েছিলেন। আর মহারাজ ভরত বলপ্রয়োগের নৈপুণ্যে বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী হয়েছিলেন-কার্তবীর্যস্তপোবীর্যা বলান্তু ভরতঃ প্রভুঃ।
অতকাল পরে কৃষ্ণের এই স্মারক বক্তৃতায় বোঝা যায়–ভরত যে সার্বভৌম রাজা হয়েছিলেন, তার পিছনে সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং বলপ্রয়োগের কৃতিত্ব। ‘বল’ মানে শুধু গায়ের জোর নয়, পারিভাষিক অর্থে ‘বল’ শব্দ রাজার সৈন্য-সামন্ত সেনাপতি এবং দণ্ড প্রয়োগের ক্ষমতা বোঝায়। ভরতের রাজ্য জয় এবং দণ্ডনীতির নৈপুণ্য বহুকাল পরে যদুবংশীয় কৃষ্ণের মুখ দিয়ে অনুস্মৃত হওয়ার ফলে বুঝতে পারি–যাদবদের একাংশ অবশ্যই। মহারাজ ভরতের দণ্ডনীতির বলি হয়েছিলেন এবং সে কথা কৃষ্ণের সময়ে প্রবাদে পরিণত হয়েছে–বলা ভরতঃ প্রভুঃ।
এমন বিশাল এক সাম্রাজ্যের সার্বভৌম অধিকার ভরতের পররাষ্ট্রনীতির প্রজ্ঞা বহন করে–স্বীকার করি; কিন্তু অন্তঃরাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে, বিশেষত প্রজাসাধারণের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর এতটাই চিন্তা ছিল যে, সে ক্ষেত্রেও তার ভাবনা প্রাবাদিক স্তরে পৌঁছেছিল। কেমন করে–তা বলি। মহারাজ ভরতের তিনটি স্ত্রী ছিলেন এবং এই প্রত্যেক স্ত্রীর গর্ভেই তার তিনটি করে পত্র হয়। সকলেই জানেন–ভারতবর্ষে রাজা বা মন্ত্রী হয়ে জন্মালে এক বিশাল সৃবিধে পাওয়া যায়। রাজারা বংশ-বংশ ধরে রাজত্ব চালিয়ে যান, মন্ত্রীরাও তাই। ভারতবর্ষে রাজতন্ত্রের বদলে গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র যাই আসুক সেখানেও প্রধানমন্ত্রীর পুত্র ক্রমান্বয়ে প্রধানমন্ত্রী হন, এ আমরা চোখে দেখেছি। জনসাধারণের রাজনৈতিক চেতনার অভাব অথবা বীরপূজার তত্ত্ব, যাই এখানে খাটুক না কেন, রাজার পরে রাজপুত্র রাজা হবেন–এটাই সাধারণ ধারণা। অন্তত সেকালের জনসাধারণ সাধারণভাবে রাজপুত্রকেই পরবর্তী রাজা হিসেবে চাইত। ভরত মহারাজের নটি পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্রটিই যে রাজা হবেন–এটাই সবার ধারণা ছিল।
কিন্তু না, এই রুটিন-বাঁধা ব্যাপারটা ভরতের রাজত্বে ঘটল না। তিন রানীর গর্ভে জাত ন’টি পুত্রের চরিত্র এবং গতিবিধি লক্ষ্য করে ভরত তাঁদের একজনকেও ভরত-বংশের পরবর্তী রাজা হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইলেন না। তিনি বার বার বলতে লাগলেন–একটি পুত্রও আমার মত হয়নি-নাভ্যনন্দত তান্ রাজা নানুরূপা মমত্যুত। ‘আমার মত হয়নি’–এই কথার মধ্যে ভরতের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বা অহংকার যতই প্রকাশিত হোক, আসলে তিনি মনে করেছিলেন যে, তার বিশাল সাম্রাজ্য চালানোর মত চারিত্রিক বল তার পুত্রদের নেই। রাজার ভাব দেখে তার তিন রানী মোটেই খুশি হননি। মহাভারতের খবর অনুযায়ী তারা ক্রুদ্ধ হয়ে আপন পুত্রদেরই নাকি হত্যাই করেছিলেন–ততস্তান্ মাতরঃ ক্রুদ্ধাঃ পুত্রা নির্যমক্ষয়ম্।
তিন রানীর এই ক্রোধ তাঁদের স্বামীর ওপরে, না পুত্রদের ওপরে–সে খবর মহাভারতের কবি দেননি। তবে রাজপুত্র হয়েও পিতার রাজ্যের উত্তরাধিকার পেল না–এটা একরকম মৃত্যুরই সামিল। অথবা এতবড় সম্রাট পিতার পুত্র হওয়া সত্ত্বেও যে পুত্রদের রাজ্যপ্রাপ্তির যোগ্যতা বা চরিত্রবল নেই, বীরপ্রস ক্ষত্রিয়-মাতার কাছে সেই পুত্রেরা মৃতেরই সামিল। মায়েদের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডও হয়তো এইরকমই কোনও অর্থ বহন করে। যাই হোক, ভরত নিজ পুত্রদের কাউকেই প্রজাপালনের উপযুক্ত না মনে করায় তার বংশের উত্তরাধিকার নিয়ে একটা দারুণ ক্রাইসিস’ তৈরি হল। নিজের বংশে পুত্র জন্মানো সত্ত্বেও তার কার্যকারিতা যখন বৃথা। হয়ে গেল–ততস্তস্য নরেন্দ্রস্য বিতথং পুত্ৰজন্ম তৎ–মহারাজ ভরত তখন নানারকম যাগ যজ্ঞ করা আরম্ভ করলেন। মহাভারত খবর দিয়েছে–ভরত শেষ পর্যন্ত মহর্ষি ভরদ্বাজের কাছ থেকে ভূমন্য নামে একটি পুত্র লাভ করলেন-লেভে পুত্রং ভরদ্বাজাদ ভূমং নাম ভারত। ভরদ্বাজের কাছ থেকে সেই পুত্র লাভ করেই মহারাজ ভরত নিজেকে পুত্রবান মনে করলেন এবং ভূমকেই তিনি ভরতবংশের উত্তরাধিকারী হিসেবে যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করলেন।
