অনুমান করা যায়–দুষ্যন্ত ছিলেন উচ্ছিন্ন পৌরবকুলের বংশকর রাজা। তিনি প্রতিষ্ঠানপুরের আশা ছেড়ে দিয়ে গঙ্গা-যমুনার অন্তর্বর্তী অঞ্চলেই রাজত্ব করতেন। ভরতের সময় তাঁর পৈতৃক রাজ্য আরও ছড়িয়ে যায় চতুর্দিকে এবং তার অশ্বমেধ যজ্ঞের স্থানগুলি থেকে তার রাজ্যের একটা স্থানস্থিতিও নির্ণয় করা যায়। সম্পূর্ণ নিষ্কন্টক না হলে সেই জায়গায় অশ্বমেধ যজ্ঞ করা সম্ভব নয় এবং ভরতের যজ্ঞস্থানগুলির পরিচয় মহাভারত ছাড়াও আরও প্রাচীনতর গ্রন্থে পাওয়া যায়। আশ্চর্য হল–অতিপ্রাচীন ব্রাহ্মণ-গ্রন্থগুলির মধ্যেও যখন ভরতের নাম করা হচ্ছে, তখন বলা হচ্ছে ভরতের কথা পূর্বে গান করা হয়েছে গাথায়– তদেতগাথয়াভিগীত। অর্থাৎ ভরতের সম্বন্ধে অন্তত পাঁচটি গাথা ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলি রচনার বহু পূর্ব থেকেই প্রচলিত। এই পাঁচটি অতি প্রাচীন গাঁথার ধ্রুবপদ হল–ভরতের মতো রাজা কখনও হয়নি, কখনও হবারও নয়। মানুষ যেমন হাত দিয়ে স্বর্গ ছুঁতে পারেন না, তেমনই মানুষের মধ্যে কেউ তার মহান কীর্তি স্পর্শ করতে পারবে না। তাই বলেছিলাম–তার মতো কেউ হয়নি, আর হবারও নয়–মহন্দ ভরতস্য ন পূর্বে নাপরে জনাঃ।
কী তাঁর কীর্তিকাহিনী, একটু শুনি। শতপথ আর ঐতরেয় ব্রাহ্মণ একযোগে বললেন তাহলে প্রাচীন পদ্য শোনো, গাথা শোনো, যা আমরা উদ্ধার করেছি দুজনেই। প্রথম পদ্য হল–দৌষ্যন্তি ভরত যমুনার কাছে আটাত্তরটা আর গঙ্গার কাছে বৃত্ৰগ্ন নামে একটা জায়গায় পঞ্চান্নটা ঘোড়া অশ্বমেধ যজ্ঞের জন্য বেঁধে রেখেছিলেন–অষ্টাসপ্ততিং ভরতো দৌষন্তিমুনামনু। গঙ্গায়াং বৃত্ৰগ্নে’বধাৎ পঞ্চপঞ্চাশতং হয়া।
মহাভারতের কবি ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলির সমস্ত সংবাদ একটি শ্লোকের মধ্যে পরিবেশন করে আরও একটা অতিরিক্ত খবর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন–শুধু গঙ্গার তীরে আর যমুনার তীরেই নয় সরস্বতীর তীরেও ভরত-মহারাজের অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া বাঁধা ছিল–ত্রিশতৈশ্চ সরস্বত্যাং গঙ্গামনু চতুঃশতৈঃ। গঙ্গা-যমুনা আর সরস্বতীর জল-ধোয়া এই অশ্বমেধ যজ্ঞগুলির খবর দিয়ে আমরা যেটা প্রমাণ করতে চাইছি তা হল দৌষ্যন্তি ভরতের রাজদণ্ড বিস্তৃত হয়েছিল গঙ্গা-যমুনার মিলনভূমি, প্রয়াগের কাছাকাছি জায়গা থেকে সরস্বতী নদীর তীর মানে পাঞ্জাব পর্যন্ত। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ একটি অতিরিক্ত খবর দিয়ে বলেছেন যে, মষ্ণার নামে একটা জায়গায় মহারাজ ভরত শয়ে শয়ে কালো দাঁতাল হাতির দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে দান করেছিলেন।
মঞ্চার নামে যে জায়গাটা ঐতরেয় ব্রাহ্মণে এক্ষুণি দেখলাম, সে জায়গাটার ভৌগোলিক অবস্থিতি নির্ণয় করা কঠিন, তবে তা করতে পারলে ভরতের রাজ্যবিস্তার সম্পর্কে নতুন খবর পাওয়া যেত। তবে ঐতরেয় বাদ দিয়ে যদি শতপথ ব্রাহ্মণের একটা অতিরিক্ত খবর আপনাদের দিই, তবে নির্ঘাত তখনকার দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিটা আরও ভাল বোঝা যাবে। শতপথ বলেছেন-মহারাজ সাত্রাজিত শতানীক কাশীর রাজার যজ্ঞীয় অশ্ব হরণ করেছিলেন, ঠিক যেমন মহারাজ ভরত হরণ করেছিলেন সাতৃতবংশীয়দের যজ্ঞীয় অশ্ব–আদত্ত যজ্ঞং কাশীনা-ভরতঃ সত্ত্বতামিব। তারপর আবার সেই গান–ভরতের মতো কেউ নেই, আর কেউ হবারও নয়। কথাটা প্রণিধানযোগ্য। মহামতি পারজিটার সব সময় ভাবেন–সেকালের মানুষদের কোনও ঐতিহাসিক দৃষ্টি ছিল না এবং তারা সব গুলিয়ে ফেলতেন। যেমন শতপথ নাকি এখানে দৌষ্যন্তি ভরতকে রামের ভাই ভরতের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন–it has con fused Bharata, the famous Paurava king, with apparently Bharata, the brother of Rama of Ayodhya.
আমাদের ধারণা স্বয়ং পারজিটারই এখানে গুলিয়ে ফেলেছেন। এখানে শতানীক সাত্রাজিতের তুলনা হচ্ছে দৌষ্যন্তি ভরতের সঙ্গে। কোথা থেকে যে এখানে রামের ভাই ভরতের প্রসঙ্গ এল এবং ব্রাহ্মণরা এই ভরতের সঙ্গে সেই ভরতকে যে কী করে গুলিয়ে ফেললেন, কোথায় গুলিয়ে ফেললেন, তার কোনও বিন্দুবিসর্গ আমাদের বুদ্ধিতে এল না। ঐতিহাসিক দৃষ্টির অভাব প্রমাণ করতে গিয়ে এখন যদি শতপথের পংক্তির মধ্যে যে নামের ছায়ামাত্র নেই, তাই আমরা আমদানি করি, তাহলে তো বড়ই বিপদ। এই ধরনের শূন্যে কুসুমকল্পনা বাদ দিয়ে পারজিটার সাহেব যদি আপন ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে ঐতরেয়-কথিত ‘মষ্ণার’ জায়গাটার ভৌগোলিক অবস্থিতি নির্ণয় করতেন, তবে আমাদের অনেক সুবিধে হত, মহারাজ ভরতের তো সুবিধে হতই।
পারজিটারের যুক্তিটাও অদ্ভুত। তাঁর বক্তব্য–King Bharata was long prior to Satavants or Sastvatas, but Rama and Bharata of Ayodhya were their Contemporaries. সাহেব ব্যাপারটা মোটেই ঐতিহাসিক যুক্তিতে বোঝেননি। তার প্রথম বোঝা উচিত–দুষ্যপুত্র ভরতের সম্বন্ধে যে প্রাচীন গাথাটি শতপথ ব্রাহ্মণে সংকলিত হয়েছে, সেই গাথাটির রচনাকালে হয়তো সাদ্ভূতদের আবির্ভাব ঘটেছে। সাদ্ভূতরা মূলত যদুবংশীয়, যদুবংশেরই এক রাজার নাম সাদ্ভূত। কৃষ্ণকে পরবর্তীকালে অন্তত দুশ বার একাধারে যদুবংশীয় এবং সাদ্ভূতগণের শ্রেষ্ঠ পুরুষ বলে বর্ণনা করা হয়েছে–ভগবান্ সাত্ত্বতাং পতিঃ। ব্রাহ্মণ্য গাথাটির মধ্যে বরং ঐতিহাসিক দৃষ্টি বেশি আছে, কারণ ভরতের সময়ে যদুবংশীয়রা বিভিন্ন বংশে (যাদব, তালজঘ, হৈহয় ইত্যাদি) বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় নির্দিষ্ট কোনও যদুবংশীয় রাজার নাম না করে, পরবর্তীকালে যদুবংশীয়রা সকলেই যে নামে চিহ্নিত হতেন, সেই নামটি উল্লেখ করে গান বাঁধা হয়েছে–শতানীক সাত্রাজিত কাশীর রাজার যজ্ঞীয় অশ্ব হরণ করেছিলেন–ঠিক যেমন ভরত হরণ করেছিলেন সাদ্ভূতগণের অশ্বটি। আর ঠিক এর পরেই ভরতের সম্বন্ধে সেই ধ্রুবপদ থাকার ফলে কোনও সন্দেহই থাকে না যে-ইনি হলেন দৌষ্যন্তি ভরত।
