যাই হোক, দৈববাণী অথবা পুরোহিত-অমাত্যের সংশোধনে রাজা দুষ্যন্ত ভরতকে নিজের পুত্র বলে প্রমাণ করিয়ে নিলেন রাজসংসদে। শকুন্তলা এবং ভরতকে ফিরিয়ে আনতে দেরি হল না। রাজসভায় দাঁড়িয়ে রাজা দুষ্যন্ত পুত্রের মস্তক আঘ্রাণ করলেন উজ্জীবিত বাৎসল্যে। ব্রাহ্মণদের স্বস্তিবাচনে, বন্দীর বন্দনা গানে রাজসভা মুখরিত হয়ে উঠল। শকুন্তলাকে পট্টমহিষীর সম্মান দিয়ে রাজা দুষ্যন্ত তার মৌখিক অভিনয়ের পাপ স্খলন করলেন। জনান্তিকে ডেকে বললেন-দেবি! তোমার সঙ্গে আমার মিলন হয়েছিল লোকের অসমক্ষে–কৃতো লোপরোক্ষো’য়ং সম্বন্ধো বৈ ত্বয়া সহ। এই ঘটনা নিয়ে আমি অনেক চিন্তা করে বার করেছি যে, লোক্সমক্ষে তোমার নির্দোষ প্রমাণ করার জন্যই আমাকে এইরকম একটা অভিনয় এবং খারাপ ব্যবহার করতে হবে। নইলে লোকে ভাবত, একটি চপলা রমণীর দুরভিসন্ধিতে রাজা দুষ্যন্ত তার সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। তারা ভাবত–তুমি স্ত্রীলোকের ছলাকলায় ভুলিয়ে আমায় বশ করেছিলে এবং এখন ছেলেটাকে চাপিয়ে দিলে রাজসিংহাসনে। তুমিই বোঝ, আমার পুত্রটিকেও তো ন্যায়সঙ্গতভাবে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করতে হবে–পুত্ৰশ্চায়ং বৃতো রাজ্যে ময়া তস্মাদ বিচারিত। সেই ভাবনা ভেবেই আমি তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি।
দুষ্যন্ত শকুন্তলাকে যে অপমান করেছিলেন, তা পুষিয়ে দিলেন দানে, মানে, তোষণে বাসোভিরশ্নপানৈশ পূজয়ামাস ভারত। পুত্র সর্বদমন এখন ভরতে পরিণত। দুষ্যন্ত তাঁকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করলেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অর্থাৎ তার পর ভরতের রাজা হওয়া সুনিশ্চিত হল। দুষ্যন্ত আরও বেশ কিছুকাল রাজত্ব করে বানপ্রস্থ অবলম্বন করলেন এবং তার মৃত্যু হয়। বনেই।
দুষ্যন্তের মৃত্যুর পর সর্বদমন-ভরত যথান্যায়ে পৈতৃক রাজ্য লাভ করলেন। একটা ব্যাপার। এখানে লক্ষ্য করার মত। ভরতের জীবনের কোনও বিশিষ্ট কাহিনী আমরা মহাভারতে পাব না। প্রণয় কাহিনী নয়, যুদ্ধ-বিগ্রহ নয়, এমনকি তার অপকীর্তিরও কোনও কাহিনী মহাভারতে ধরা নেই, যাতে করে মহারাজ ভরতের সম্বন্ধে আমরা উকৰ্শ হতে পারি। অথচ মহারাজ ভরতই চন্দ্রবংশের সেই বিশিষ্ট ব্যক্তি, যাঁর নামে এই ভারতবর্ষ, যার নামে প্রসিদ্ধ চন্দ্রবংশের ধারার অন্য নাম হয়ে গেল ভরত বংশ-ভরতা ভারতী কীর্তিযেনেদং ভারতং কুলম্। ভবিষ্যতে আমরা দেখব–কৌরব, পাণ্ডব সকলেই নিজেদের ভরতবংশীয় বলতে গৌরব বোধ করবেন। কিন্তু কেন এই গৌরব–তা ব্যাখ্যা করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে এক অতিসাধারণ ঘটনায়–মহাভারতের বিশাল বিশাল চরিত্রের মেলায়, বহু বিচিত্র কাহিনীর অন্তরালে সে ঘটনা প্রায় চোখেই পড়ে না।
ভরত রাজা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা তাঁর রথচক্রের ঘর্ঘর শুনতে পাচ্ছি। কথাশ্রমের তপোবনে সর্বদমন ব্যাঘ্র-সিংহের পশুসমাজে রাজা হয়ে বসেছিলেন, এখন তার পৈতৃক রাজ্যে। অভিষেক সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রথচক্রের ধ্বনি আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলল–তস্য তৎ প্রথিতং চক্রং লোকসংনাদনং মহৎ। ভরত দিগবিজয়ে বেরলেন। কাছে-দূরে। সমস্ত রাজা-মহারাজ ভরতের বশ্যতা স্বীকার করে নিলেন। একদিকে রাজ্যজয় অন্যদিকে রাজার আদর্শ ধর্মে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা–এই দুয়ের মিশ্রণে ভরতের যশ ছড়িয়ে পড়ল দিগদিগন্তে। তিনি সার্বভৌম এবং চক্রবর্তী রাজা হলেন–স রাজা চক্রবর্ত্যাসীৎ সার্বভৌমঃ। প্রতাপবান্। সার্বভৌম রাজা মানে যেমন তেমন রাজা নন, সমুদ্র পর্যন্ত তার রাজ্যের সীমা ঐতরেয় ব্রাহ্মণ তাই বলেছে–অর্ধসমন্তপৰ্য্যায়ী স্যাৎ সার্বভৌমঃ…সমুদ্রপর্যন্তায়া একরা।
ভরত যে এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর ছিলেন, তা শুধু তাঁর রাজদণ্ডের বিস্তার থেকেই প্রমাণযোগ্য নয়। সেকালের রাজা-মহারাজারা রাজ্যজয়ের সিদ্ধি হিসেবে নানা যাগ-যজ্ঞ করতেন। সেই যজ্ঞের নাম এবং তার গুরুত্ব থেকেও রাজাদের রাজ্য-বিস্তারের পরিমাপ করা যায়। মহাভারতে দেখতে পাচ্ছি–মহারাজ ভরত অনেক যজ্ঞ করেছিলেন–ইজে চ বহুভির্যঃ–এবং তাকে যজন করিয়েছিলেন স্বয়ং তার মাতামহ মহর্ষি কণ্ব। ভরতের নামা যজ্ঞক্রিয়ার মধ্যে একটি খবর পাওয়া যাচ্ছে যে, মহারাজ ভরত, ‘গোবিতত’ নামে অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন এবং তাতে তিনি বহু দক্ষিণা দিয়েছিলেন মহর্ষি কণ্বকে।
এখন প্রশ্ন হল–অশ্বমেধ যজ্ঞ কারা করেন? সুপ্রাচীন ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলি বলেছে–অশ্বমেধ যজ্ঞ হল সমস্ত যজ্ঞের রাজা-ঋষভঃ রাজা বা এষ যজ্ঞানাং যদশ্বমেধঃ। শতপথ ব্রাহ্মণ। বলেছে–রাজসূয় যজ্ঞ করে একজন রাজার পদবি লাভ করতে পারেন আর বাজপেয় যজ্ঞ করে সম্রাটের পদবি। কিন্তু আপস্তম্ব শ্ৰেীভসূত্রের মতে যিনি অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন, তিনিই আসলে সার্বভৌম রাজা। অথবা সার্বভৌম রাজা যিনি হতে চান, তিনিই অশ্বমেধ যজ্ঞ করার উপযুক্ত পাত্র-রাজা বা সার্বভৌমঃ অশ্বমেধেন যজ্ঞে। সত্যি কথা বলতে কী, একজন অশ্বমেধযাজ্ঞী সার্বভৌম রাজার সংজ্ঞাই হল–যিনি চতুর্দিকে রাজ্যবিস্তার করেছেন। বিশাল সাম্রাজ্যের এক নিয়ন্তা এইভাবে সাম্রাজ্যের ধারকে পরিণত হন–অশ্বমেধযাজ্ঞী সর্বা দিশোভিজয়তি ভুব…যারমেবৈনং ধর্তারং করোতি।
ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলির এই প্রমাণ এবং যজ্ঞের পরিধি থেকে আমরা বুঝতে পারি–সার্বভৌম ভরত রাজা চতুরস্তা পৃথিবী সমুদ্র পর্যন্ত নাই জয় করে থাকুন, কিন্তু তার আপন রাজ্যের চতুর্দিকে বেশ খানিকটা জায়গা পর্যন্ত নিজের অধিকার বিস্তার করেছিলেন। মনে রাখতে হবে–ইংরেজিতে যাকে আমরা imperial unity বলি, তা মহাভারতের এই যুগে আক্ষরিক অর্থে সম্ভব ছিল না। কিন্তু ভরতকে প্রথম সার্বভৌম নৃপতি বলার কারণ-তিনি চতুর্দিকে তার রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। কোনও সন্দেহ নেই, প্রাচীর সেই প্রতিষ্ঠানপুরের নাম আমরা আর শুনতে পাচ্ছি না। মহাভারতের বক্তা নিরপেক্ষ বৈশম্পায়ন মন্তব্য করছেন–আমরা এইরকম শুনেছি যে, মহারাজ রাজধানীটি ছিল সারা পৃথিবীর সেরা রাজধানী–বিষাণভূতং সর্ব্যাং পৃথিব্যামিতি নঃ শ্রুত। ভরতাধষিতং পূর্বং…।
