এ বিষয়ে পণ্ডিতদের মতামত ব্যক্ত করে আরও দশ পাতা লেখা যায়, কিন্তু তাতে মূল ঘটনার খেই হারিয়ে যাওয়ার ভয় আছে। এখানে শুধু এইটুকু মাথায় রাখতে হবে যে, খাণ্ডবদাহের সঙ্গে সঙ্গে পাণ্ডবদের সঙ্গে তক্ষকের শত্রুতা শুরু হয়। এবং পরিক্ষীণ পাণ্ডব-বংশের শেষ পুরুষ পরীক্ষিতের ওপর প্রতিশোধের মধ্য দিয়ে এই পালার শেষ সূচনা হয়। ধাতু-প্রত্যয় নিষ্পন্ন করে বাননটা পরীক্ষিত’, ‘পরীক্ষিত’ অনেক রকম হয়। আমরা চালু বানান পরীক্ষিতই বলব।
তক্ষক কি কালীয়, বাসুকি কি অনন্ত–এঁদের ঘরবাড়ি মানুষের মতোই, ভাষাও যথেষ্ট সংস্কৃত এবং আর্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এঁদের ওঠাবসা বিয়ে-থাও যথেষ্ট হয়েছে। আপাতত তক্ষক আর উতঙ্কের বৃত্তান্তে দেখব– উতঙ্ক বড় বড় নাগগোষ্ঠীর প্রধানদের মনোরম-স্তুতি রচনা করেছেন এবং নাগরাজ তক্ষক পৌষ্য-পত্নীর দুল দুটি ফিরিয়েও দিয়েছেন। উতঙ্ক গুরুপত্নীর কাছে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই উপস্থিত হয়েছেন এবং তার আশীর্বাদও পেয়েছেন। কিন্তু তক্ষক তার সঙ্গে যে ব্যবহার করেছে এবং তাকে যে পরিমাণ হেনস্তা করেছে, তাতে তার ক্রোধ চূড়ান্ত হয় এবং তিনি তার গুরুভাই হস্তিনাপুরের রাজা জনমেজয়ের কাছে উপস্থিত হয়েছেন তক্ষকের ওপর প্রতিশোধ তুলতে ক্রুদ্ধঃ তক্ষক প্রতিচিকীর্ষমাণো হস্তিনাপুরং প্রস্থে। অন্য রাজা বাদ দিয়ে জনমেজয়ের কাছে তার যাওয়ার কারণও ছিল। কারণ একটাই। জনমেজয়ও তক্ষকের শত্রু। তক্ষক তার পিতা পরীক্ষিতকে মেরেছেন।
উতঙ্ক হস্তিনাপুরের রাজসভায় পৌঁছনোর আগে আগেই জনমেজয় তক্ষশিলা জয় করে ফিরে এসেছেন। গবেষকরা এমনও মনে করেন যে, জনমেজয়ের তক্ষশিলা-অভিযানও নাগ-জাতীয় জন-জাতিকে পর্যুদস্ত করার জন্য। কারণ ইতিহাস-মতে এই অঞ্চলে নাগদের প্রভুত্ব এবং ক্ষমতা দুই ছিল। ‘তক্ষক’ শব্দের সঙ্গে তক্ষশিলার মিল এবং সেখানে বৌদ্ধ-প্রভাবের অনুষঙ্গে তক্ষকের নগ্ন ক্ষপণকের বেশ ধারণও এই নিরিখে ব্যাখ্যা করা। যাই হোক এত তর্কের মধ্যে না গিয়ে আমরা আপাতত উতষ্কের আক্রোশ লক্ষ্য করব। উতঙ্ক বললেন, যে কাজ আপনার করা উচিত ছিল, মহারাজ সেই কাজ বাদ দিয়ে অন্য কাজ করে যাচ্ছেন।
ইঙ্গিতটা অবশ্যই তক্ষশিলা-বিজয়ের দিকে। তক্ষশীলার নাগজাতীয়দের অনেকেই জনমেজয়ের হাতে পর্যদস্ত হলেও তক্ষকের এখনও কিছুই হয়নি। উতঙ্ক তাই বললেন, সেই তক্ষক নাগ আপনার বাবাকে মেরেছে–তক্ষকেশ মহীন্দ্রে যেন তে হিংসিতঃ পিতা- আপনি তাকে মারার কথা ভাবুন, আপনি বালকের মতো অন্য কাজ করে যাচ্ছেন–বাল্যদিবান্যদেব ত্বং কুরুতে নৃপসত্তম। উতঙ্ক জনমেজয়কে চেতিয়ে দিয়ে বললেন,তক্ষক বিনা অপরাধে আপনার বাবা পরীক্ষিতকে দংশন করেছে। শুধু কি তাই? আপনার পিতার চিকিৎসার জন্য মহামুনি কাশ্যপ আসছিলেন, তক্ষক তাকেও কায়দা করে ফিরিয়ে দিয়েছে। অতএব এই অবস্থায় অন্য কিছু নয়, আপনি সর্প-যজ্ঞ করুন যাতে তক্ষককে পুড়িয়ে মারা যায়। উতষ্ক এবার রাজাকে জানালেন- তক্ষক তাকে হেনস্তা করেছে। সব শুনে জনমেজয় একেবারে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন, মহাভারতের উপমায় সেটা–আগুনে ঘি–দীপ্তোগ্নি ইবিষা যথা।
০০৫. উগ্রশ্রবা সৌতির গল্প
০৫.
কাহিনী জমে উঠেছে। উগ্রশ্রবা সৌতির গল্পে সমবেত মুনি-ঋষিরা এখন রীতিমতো ‘সাসপেনস’ নিয়ে বসে আছেন। উতঙ্ক জনমেজয়কে ক্ষেপিয়ে তোলার পর তিনি কী করলেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। সৌতি কিন্তু কিছু বললেন না, সাসপেনসটা ধরে রাখলেন। উতঙ্কও যে জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞের একটা কারণ–এইটুকু বলেই সৌতি বললেন, বলুন আর কী শুনতে চান? কীই বা আর বলব- কিং ভবন্তঃ শ্রোতুমিচ্ছত্তি, কিমহং ব্রুবাণি ইতি।
ঋষিরা অনেকক্ষণ গল্প শুনেছেন। কুলপতি শৌনক তখনও অগ্নিশরণগৃহে। ঋষিদের একটু লজ্জাই করল। এই বারো বছরের যজ্ঞ মহর্ষি শৌনকেরই ঘাড়ে। মূল দায়িত্ব তার বলে ব্যস্ততাও তার বেশি। ঋষিরা মজাসে গল্প শুনছেন, আর ওদিকে কুলপতি শৌনক–কোথায় যজ্ঞকাষ্ঠ, কোথায় সোম-রস, কোথায় কোন বৈদিক বসবেন–এ সব নিয়ে মরছেন। সমবেত ঋষিদের লজ্জা হল। তারা বললেন–সৌতি! কুলপতি শৌনক আসুন এখানে। আমাদের তো অনেক কিছুই শুনতে ইচ্ছা। কিন্তু কী জান, দেবতা-অসুর-গন্ধর্ব-মনুষ্য-নাগ–এঁদের খবর কুলপতি শৌনকও ভাল মতো রাখেন–মনুষ্যোরগ-গন্ধর্ব-কথা বেদ চ সর্বশঃ। কাজেই তিনি এলে আমাদের প্রশ্ন করারও যুত হবে।
অর্থাৎ সৌতি উগ্রশ্রবার ফাঁকি দেবার উপায় নেই। যারা জানেন অল্প, তাদের কাছে গল্প ফঁদা এক জিনিস, কিন্তু শৌনকের মতো বিদ্বান, বুদ্ধিমান প্রাধ্যাপকের সামনে কি চলবে না। কাহিনীকার এবং সহৃদয় রসিক শ্রোতা এক সঙ্গে বসবেন, তবেই না মহাকাব্যকথা আরম্ভ হবে। তা মহর্ষি শৌনক এসে গেলেন কিছুক্ষণের মধ্যেই। তিনি কিন্তু এসেই আগে কিছু শুনতে চাইলেন না। নতুন কথক-ঠাকুর কেমন কতখানি জানেন তিনি, সেসব খোঁজ-ভঁজ নিয়ে তবে তিনি আসল কথায় যাবেন। নতুন কথককে পরীক্ষা করার জন্য তিনি বললেন- তোমরা বাবা রোমহর্ষণ ছিলেন পুরাণ-বিজ্ঞ মানুষ; স্বয়ং ব্যাসের কাছে তাকে মহাভারতের কাহিনী পড়তে হয়েছে। তা বাপু, তুমিও কি সেইরকম পড়াশুনা করে এসেছ–ক্কচিৎ ত্বমপি তৎ সর্বমধীষে লৌমহর্ষণে–নাকি ফাঁকি আছে তোমার বিদ্যায়? আচ্ছা বেশ, থাক এসব কথা–তুমি বরং একটু ভূত-বংশের কাহিনী বলো দেখি, শুনি–শ্রোতুমিচ্ছামি ভার্গব। সৌতি উগ্রশ্রবার পরীক্ষা আরম্ভ হল। আসলে শৌনক যে সব ছেড়ে ভৃগুবংশের কথাটাই প্রথম শুনতে চাইলেন, তার কারণ–তিনি নিজেও ভৃগুবংশীয়। আত্মবংশের সব কিছুই তাঁর জানা। সৌতি উগ্রশ্রবার তাই বড় পরীক্ষা সামনে।
