এই কথাগুলি দৈববাণী না জনবাণী সে কথা আরও একবার পরে আসবে। তার আগে জানাই–আংশিকভাবে যে শ্লোকগুলি আমরা এখানে উদ্ধার করলাম, দুষ্যন্ত-শকুন্তলার সমগ্র কাহিনীর হাজারো শ্লোকের মধ্যে এই শ্লোক-দুটির পৃথক এক মূল্য আছে। মনে রাখতে হবে, মহাভারত ছাড়াও প্রায় সব প্রাচীন পুরাণে শকুন্তলা-দুষ্যতের কাহিনী সংক্ষেপে বা সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে। দুষ্যন্ত যখন ইচ্ছাকৃতভাবে শকুন্তলাকে স্মরণ করতে চাইলেন না, তখন প্রত্যেক পুরাণেই এই দৈববাণীর শ্লোক-তিনটি উল্লিখিত হয়েছে। সব পুরাণেই এই শ্লোকগুলি একই শব্দবিন্যাসে লিখিত এবং মহাভারতের শ্লোকগুলির সঙ্গে এই শ্লোকগুলির কোনও পার্থক্য নেই। শব্দেও নয়, অর্থেও নয়।
পুরাণকারেরা বলেছেন–এই শ্লোকগুলি নাকি দেবতারা গান করেন–দেবৈঃ শ্লোকো গীয়তে। পণ্ডিতেরা বলেন–পুরাণগুলির মধ্যে যখনই এইরকম—‘দেবতারা এই শ্লোকটি গান করেন’, অথবা ‘এমনটি শোনা যায়–ইতি শ্ৰয়তে’ অথবা এখানে ‘গাথা শোনা যায়–তথাহি গাথাঃ’–এইরকম উল্লেখ থাকে, তখনই বুঝতে হবে যে, এই দেবগান-গাথাগুলি হল– allu sions to matters that are handed down from very ancient times, long before the original Purana was compiled.
যে দু-তিনটি শ্লোকের একেকটি কলি আমরা উল্লেখ করেছি, সেই শ্লোকগুলি হাজারো শ্লোকের মালায় হীরকখণ্ডের মতো। ওই শ্লোকগুলি শুনলেই শকুন্তলা-দুষ্যন্তের পূর্বাপর জীবন-কাহিনী এক ঝলকে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। বোঝা যায়–মহারাজ দুষ্যন্ত কোন কারণে তার আপন স্ত্রীকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং তাঁর ঔরসজাত শিশুপুত্রটিকেও অস্বীকার করেছিলেন। শ্লোক কটি দুষ্যন্তের এই অন্যায়ের জন্য তাঁকে সাবধান করছে এবং স্ত্রী-পুত্রের মর্যাদা সম্বন্ধে তাঁকে সচেতন করছে। আমরা এই বহু-উল্লিখিত শ্লোক-তিনটির প্রাচীনতা নির্ধারণ করে বলতে চাইছি যে, দুষ্যন্ত-শকুন্তলার কাহিনী মহাভারতের কালের আরও আগে রীতিমত লোকস্তরে প্রচলিত ছিল। লোকেরা দুষ্যন্ত-শকুন্তলার বিশদ প্রণয় কাহিনী নাই জানুক, কিন্তু বহুশ্রুত এই শ্লোক দুটি তারা জানত। এই শ্লোক কটিকে প্রত্যেক মুখ্য পুরাণের কথকঠাকুর সন্নিবেশ করেছেন রাজবংশের পরম্পরার মধ্যে। শকুন্তলা-দুষ্যন্তের প্রণয়কাহিনী কিচ্ছুটি আনুপূর্বিক না বলে, যেই না ভরতের নাম আসবে অমনই পৌরাণিক বলবেন–ভারতের নাম। ভরত কেন হল জান? দেবতারা আকাশ থেকে বলেছিলেন–ভরস্ব পুত্ৰং দুষ্যন্ত। এই ‘ভরস্ব’ শব্দের দুটি বর্ণ ‘ভর’ আর ‘দুষ্যন্তে’র শেষ বর্ণ ‘ত’-এই তিনটি ব্যঞ্জন বর্ণ নিয়ে ভরত। মৎস্যপুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ, বায়ুপুরাণ, এবং হরিবংশ–এই প্রাচীন গ্রন্থগুলির মধ্যে সর্বত্র এই মহাভারতীয় শ্লোক-কটি অবিকৃত এবং প্রসঙ্গও সেই একই।
এই প্রাচীন অনুবংশ্য শ্লোক-কটিই হয়তো দুষ্যন্ত-শকুন্তলার প্রণয়কাহিনী এবং তাদের পুত্ৰনামের বীজস্বরূপ। এই শ্লোকগুলি পৌরাণিক-পরম্পরায় চলে আসছিল মহাভারতের পূর্বকাল থেকে এবং হয়তো দৈববাণীর চেয়েও এই কথাগুলির ব্যবহারিক এবং বাস্তব মূল্য ছিল অনেক বেশি। কালিদাসের অভিজ্ঞানে কুমার সর্বদমন অথবা ভরতের প্রসঙ্গ আসে তখনই যখন মর্তের কামনা শাশ্বত প্রেমে পরিণত হয়, ফুল থেকে ফলে পরিণতি ঘটে। পুত্র জন্মের আনন্দ সেখানে নাটকের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করে এবং সে আনন্দ শৃঙ্গার রসের মহত্তর তাৎপর্যে বিশ্রান্তি লাভ করে। মহাভারতের কবির কাছে এই নাটক এবং নায়কোচিত পরিণতির কোনও মূল্য নেই। তার কাছে প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে–প্রসিদ্ধ ভরতবংশের মূল ভরতের ‘ভরণ’ কীভাবে সম্ভব হয়েছিল–সেটা প্রকাশ করা। যে ‘ভরত’ থেকে ‘ভারত’ নামের সৃষ্টি-ভরতা ভারতী কীর্তিঃ–যে নাম থেকে পরবর্তী পাণ্ডব-কৌরবরা নিজের কুলমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হবেন, সেই ভরত কীভাবে পিতার দ্বারা বিপ্রলব্ধ হয়েও পুনরায় রাজার আসনে প্রতিষ্ঠিত হলেন–একমাত্র সেইখানেই মহাভারতের কবির দুষ্যন্ত-শকুন্তলা কাহিনীর তাৎপর্য।
আমরা আগে বলেছি, দৈববাণীর সময় রাজার পাশে ছিলেন মন্ত্রী, অমাত্য এবং ঋত্বিক-পুরোহিতেরা। দৈববাণী শুনেই রাজা তাদের বললেন–আপনারা এই দৈববাণী শুনুন ভাল করে। এই পুত্রটি যে আমারই, তা আমি ভাল করেই জানতাম–অহঞ্চাপি-এবমেবৈনং জানামি স্বয়মাত্মজ। কিন্তু আমি যদি শুধু শকুন্তলার কথায় এই বালকটিকে পুত্র হিসেবে স্বীকার করে নিতাম, তাহলে সাধারণ মানুষ আমাকে সন্দেহ করত এবং ভাবত–ছেলেটি ওর নিজের নয়, অথচ তাকে সিংহাসনে চাপিয়ে দিল শুধু রাজা বলে–ভবেদ্ধি শঙ্কা লোস্য নৈব শুদ্ধো ভবেদয়।
দেখুন, রাজসভায় শকুন্তলার যে হেনস্থা হয়েছে, তাতে আধুনিক পরিশীলিত বুদ্ধিতে সেকালে স্ত্রীলোকের মর্যাদা এবং তার সামাজিক অবস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তো উঠতেই পারে। কিন্তু দেখুন, সেকালের রাজাদেরও আজকের দিনে স্বেচ্ছাচারী বলা হয়। স্বৈরাচার ছাড়া তারা নাকি জনগণের ধার ধারতেন না একটুও। কিন্তু এই কি তার নমুনা হল? আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস–অলৌকিক কোনও দৈববাণী নয়, দুষ্যতের রাজসভার মন্ত্রী-অমাত্য-পুরোহিতেরাই শকুন্তলার প্রত্যয় দেখে রাজাকে সাবধান করেন এবং রাজা তখন বলেন–পুত্রটি যে আমারই, তা আমিও জানতাম। কিন্তু শুধু শকুন্তলার কথায় তাকে স্বীকার করে নিয়ে লোকে আমাকে সন্দেহ করত। এখানে ‘লোকে’ মানে–আপনারাই সন্দেহ করতেন। সেকালের দিনের স্বৈরাচারী একনায়ক তথা রাজতন্ত্রের নিরিখে রাজার এই লোকাপেক্ষা আমাদের মুগ্ধ করে। অর্থাৎ রাজারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারতেন না, মন্ত্রী, অমাত্য, পুরোহিতকে অতিক্রম করে, সাধারণ লোককে বুদ্ধু বানিয়ে যা ইচ্ছে রাজারা তাই করতে পারতেন না।
