আমাদের বিশ্বাস–দুষ্যন্তের এই অমর্যাদাকর জন্মের কাহিনী শকুন্তলাও নিশ্চয়ই জেনে ফেলেছিলেন। আর সেইজন্যই শকুন্তলার এত মেজাজ। অর্থাৎ সাধারণ এক রক্ষিতা বা বেশ্যার সংসর্গে যার জন্ম তার থেকে অন্তত স্বৰ্গবেশ্যা মেনকার মূল্য বেশি। কারণ, তিনি দেবকার্য সিদ্ধ করেন। শকুন্তলা তাই বললেন–স্বর্গলোকে আর অন্তরীক্ষলোকে আমাদের চলাফেরা, আর তুমি ঘুরে বেড়াও এই মরণশীল মর্ত্যভূমিতে, আমার জন্মের সঙ্গে তোমার জন্মের তুলনা? যেন পাহাড় আর সরষে।
জন্মের কথা তো গেল। শকুন্তলা আপন জন্মের মর্যাদায় এখন রীতিমতো গৌরবান্বিত। এখন তিনি রাজার অকথ্য তিরস্কারের প্রতিভাষণ দিচ্ছেন। শকুন্তলা বললেন–মানুষ যতক্ষণ না আয়নায় নিজের মুখখানা দেখে, ততক্ষণই সে নিজেকে সুন্দর দেখে। আয়নায় নিজের মুখখানা দেখলেই তবে না লোকে বুঝতে পারে নিজের সঙ্গে অন্যের ফারাক–তদান্তরং বিজানীতে আত্মানঞ্চেতরং জন। মানুষ যখন কথা বলে, তখন ভালমন্দ দুইই বলে। যেমন আমিও আগে বলেছি–আমার জন্ম এবং প্রতিপালনের সমস্ত বৃত্তান্তই তোমাকে অনুপুঙ্খভাবে। শুনিয়েছি। কিন্তু যে শুনছে সে যদি মুর্থ হয়, তবে ভাল কথাটা সে ধরে না, মন্দটাই ধরে, যেমন শুয়োর–ভাল জিনিসটা সে খায় না, তার নজর সব সময় বিষ্ঠার দিকে–অশুভং বাক্যমাদত্তে পুরীষমিব শূকরঃ।
শকুন্তলা বলতে চাইলেন–তুমিও ওই মন্দটাই ধরছ, রাজা। কেননা, ভাল মানুষ হলে সে নীর বর্জন করে ক্ষীরই গ্রহণ করত। দুর্জন লোকে অন্যের নিন্দা করে সুখ পায়, আমাকে নিন্দা করে তোমার তো সেই সুখই হচ্ছে, মহারাজ! শকুন্তলা দুষ্যন্তের তপোবনের সেই আচরণের সঙ্গে আজকের আচরণ মেলাতে পারছেন না। দুষ্যন্ত যেহেতু তাকে চিনেও চিনতে পারছেন না, তাই শকুন্তলা বলতে বাধ্য হচ্ছেন যে, জগতে এর চেয়ে হাসির ব্যাপার আর বুঝি হয় না, যখন একজন খারাপ লোক নিজেকে খারাপ জেনেও অন্য ভাল মানুষকে খারাপ বলে গালাগালি দেয়-যত্র দুর্জনমিত্যাহ দুর্জনঃ সজ্জনং স্বয়ম্। কী আশ্চর্য! তুমি নিজে আমার গর্ভে নিজেরই মতো একটি পুত্র উৎপাদন করে এখন সেই পুত্রের পিতৃত্ব অস্বীকার করছ কেমন। করে–তা আমার মাথায় আসছে না-স্বয়মুৎপাদ্য বৈ পুত্রং সদৃশং যো’বমন্যতে।
শকুন্তলা পুত্রের স্বার্থ ভেবে আবারও নিজেকে সংযত করলেন। বললেন-মহারাজ! আমার যা হয় হোক, তুমি ছেলেটিকে এমন করে অবজ্ঞা করো না। তুমি রাজা বটে, সত্য এবং ধর্মের রক্ষা করা তোমার স্বাভাবিক ধর্ম। সেই তুমি এমন কপটতা করো না আমার সঙ্গে। তুমি তোমার সত্যে প্রতিষ্ঠিত হও। আর যদি সব জেনে-বুঝে মিথ্যেটাকেই তুমি আঁকড়ে ধরে থাক, তবে আমি নিজেই চলে যাচ্ছি, তোমার মতো এক মিথ্যাচারী কপট মানুষের সঙ্গে বাস করা আমারই বা সইবে কেমন করে–আত্মনা হন্ত গচ্ছামি তাদৃশে নাস্তি সঙ্গত। তবে আমার যাবার আগে আমার সত্য প্রতিজ্ঞাও তুমি শুনে রাখ, মহারাজ। তোমাকে বাদ দিয়েও, তোমার কোনও সহায়তা ছাড়াই আমার এই পুত্র একদিন রাজরাজেশ্বর হবে–ঝতেপি তাঞ্চ দুষ্যন্ত…চতুরন্তামিমা উবং পুত্রো মে পালয়িষ্যতি।
কালিদাসের সভ্য-ভব্য পুষ্পঘাতভরা শকুন্তলাকে যদি এইরকম ঝগড়া করে নিজের মত প্রতিষ্ঠা করতে হত এবং তাও রাজার সামনে, তবে এতক্ষণ তিনি মৃত ঘোষিত হতেন। দুষ্যন্তকে সামান্য দু-চার কথা বলে একা বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে অন্তরীক্ষলোকের সাহায্য এসে পৌঁছেছে অভিজ্ঞান-শকুন্তলে। কিন্তু মহাভারতের শকুন্তলা চিরন্তনী জননীর গৌরবে কপট স্বামীর মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে সপ্রত্যয়ে পুত্রের হাত ধরে বেরিয়ে চলে এসেছেন রাজসভা ছেড়ে–এতাবদুত্ত্বা রাজানং প্রাতিষ্ঠত শকুন্তলা।
.
৪৬.
শকুন্তলা দুষ্যন্তের রাজসভা ছেড়ে গেলেন ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ হয়ে। মহাভারতের সহজ সরল অনাড়ম্বর পরিবেশের মধ্যে রাজনামাঙ্কিত কোনও অঙ্গুরীয় রোহিত মৎস্যের পেট কেটে বার কতে হয়নি এখানে। শকুন্তলা বাইরে প্রস্থান করার সঙ্গে সঙ্গে এখানে মহাভারতী দৈববাণী হয়েছে এবং সে দৈববাণী হয়েছে কখন? না, রাজা তখন বসেছিলেন রাজসভার ঋত্বিক, পুরোহিত, মন্ত্রী-অমাত্যের দ্বারা বৃত হয়ে। আমরা অবশ্য দৈববাণী বলতে আকাশ-ফাটা কোনও অশরীরী শব্দস্ফোট বুঝি না। যা বুঝি, তা হল জনমত। দুষ্যন্তের সভার ঋত্বিক, পুরোহিত, মন্ত্রী-অমাত্যেরা কেউ নির্বোধ গর্দভ নন। তারা শকুন্তলার দাপট দেখে, সত্যের প্রত্যয় দেখে এবং সর্বোপরি একটি বালকের মধ্যে দুষ্যন্তের ছায়া দেখে নিশ্চয়ই দুষ্যন্তকে বলেছিলেন তার মত পুনর্বিবেচনা করতে এবং সেটাই হয়তো দৈববাণী।
দৈববাণী হল–দুষ্যন্ত এই পুত্রটিকে তুমি ভরণপোষণ করো। শকুন্তলার প্রতি এইভাবে অবজ্ঞা প্রদর্শন করো না–ভরস্ব পুত্ৰং দুষ্যন্ত মাবমংস্থাঃ শকুন্তলা। কোনও সন্দেহ নেই–তোমারই ঔরসে শকুন্তলার গর্ভে এই পুত্রের জন্ম হয়েছে–এবং শকুন্তলা সত্য কথা বলেছে–তৃঞ্চাস্য ধাতা গর্ভস্য সত্যমাহ শকুন্তলা। দৈববাণী শকুন্তলার বক্তব্যের সত্যতা প্রতিপন্ন করেই ক্ষান্ত হল না, দেবতাদের মুখ দিয়ে দুষ্যন্ত তার পুত্রের নামকরণও শুনতে পেলেন–আমাদের অনুরোধেই যখন তোমাকে এই পুত্রের ভরণ-পোষণ করতে হবে, তখন এই পুত্রের নাম হোক ভরত–তস্মাদ ভবত্বয়ং নাম্না ভরতো নাম তে সুতঃ।
