দুষ্যন্ত বুঝলেন–একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। মেনকাকে না হয় যা তা বলা গেল, কিন্তু স্বাধ্যায়-অধ্যবসায়ে ব্রাহ্মণত্ব লাভ-করা বিশ্বামিত্র মুনিকে কামী বলে ফেলাটা রাজার পক্ষে যেন একটু বাড়াবাড়ি। দুষ্যন্ত তাই একটু সামলে নিয়ে বললেন–তা না হয় বুঝলাম যে, মেনকা অপ্সরা-সুন্দরীদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠা আর বিশ্বামিত্রও মুনিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু তাদের মেয়ে হয়ে তোমার কথাগুলো এমন বেশ্যাদের মতো কেন–তয়োরপত্যং কস্মাৎ পুংলীব প্রভাষসে? যে সব কথা তুমি আমার কাছে বলছ, তাতে তোমার লজ্জা হওয়া উচিত। খুব তো তপস্বিনী সাজ নিয়ে বেশ একটা সাধু-সাধু ভাব করে ঘুরে বেড়াচ্ছ। কিন্তু মনে রেখ-এটা রাজবাড়ি, তায় কথা বলছ রাজার সামনে। অতএব সাবধান। আমাকে জ্ঞান দেওয়া হচ্ছে। ভণ্ড কোথাকার, বেরোও এখান থেকে– বিশেষত মৎসাশে দুষ্ট তাপসী গম্যতাম্।
শকুন্তলাকে নিজের স্ত্রী বলে স্বীকার করা তো দূরের কথা, তাকে অস্বীকার করার জন্য দুষ্যন্ত এমনভাবেই তাকে কলঙ্কিত করলেন যেন, একজন রাজার তো নয়ই, একজন সাধারণ মানুষের কাছেও তিনি পরিত্যাজ্য। দুষ্যন্ত স্ত্রীকে অস্বীকার করে এবার পুত্রকে অস্বীকার করার যুক্তি সাজাচ্ছেন। বলছেন–আর তোমার ছেলেটি তো বেশ বড়সড় ঢ্যাঙা হয়ে গেছে, অল্প। বয়স দেখতে লাগে বটে, কিন্তু গায়ে বেশ শক্তি আছে মনে হয়–অতিকায় তে পুত্রো বালোতবলবানয়ম। কোথা থেকে একটা শালখুঁটির মতো ঢ্যাঙা ছেলে নিয়ে এসে, বলে কিনা আমার ছেলে–শালস্তম্ভ ইবোৰ্গতঃ। পরিষ্কার বোঝা যায়–তোমার মা বেশ্যা বলেই তুমিও বেশ্যার মতোই কথা বলছ। একমাত্র বেশ্যারাই নিজের অবিধিজাত সন্তানকে হঠাৎ এক পুরুষের সামনে হাজির করে তাকে তারই পুত্র বলে প্রতীত করাতে চায়। তুমি যা যা বলছ, যা যা সত্য বলে প্রমাণ করতে চাইছ, আমি যেহেতু তার কিছুই স্মরণ করতে পারছি না, তাই আর তোমার দাঁড়িয়ে থাকা সাজে না। তোমাকে আমি চিনি না, তুমি যাও এখান থেকে–নাহং বামভিজানামি যথেষ্টং গম্যতাং ত্বয়া।
রাজার বয়ান থেকে, ভাষা থেকে বোঝা যায়, তিনি সত্যিই নিজের কাছে নিজেকে লুকোতে চাইছেন। নইলে পুরুবংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক রাজা তার নাগরিকবৃত্তি বিসর্জন দিয়ে নিজের পূর্বপরিণীতা স্ত্রীকে এইভাবে কলঙ্কিত করতে পারেন না; অস্বীকার করতে পারেন না ঔরসজাত পুত্রকে। বেশ বুঝতে পারি–একটা গভীর কারণ আছে, যে জন্য তাকে এই অত্যাভিনয় করতে হচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটা শকুন্তলার দিক থেকে কতখানি মর্মান্তিক ভাবুন যে, তাঁর নিজের বলা কথা তাঁকে এখন গিলতে হচ্ছে আপন বমন-নিষেবণের মতো। কিন্তু এও তো সত্যি যে নিজের বাবা-মা যত খারাপই হোন, অন্যের মুখ দিয়ে তা শুনতে মোটেই ভাল লাগে না। সরলা শকুন্তলা তাই নিজের মতো করেই তাঁর প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন রাজাকে।
শকুন্তলা ভীষণ রেগে গেছেন। বিদগ্ধা নায়িকার মতো সুচতুর বাগভঙ্গি প্রকাশ করে তার পক্ষে দুষ্যন্তের প্রতিভাষণ দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ তিনি সেই নায়িকা নন। আর কেউ যদি–শালা, শুয়োরর বাচ্চা’ বলে গালাগালি দেয়, তবে তার উত্তরে-দেখুন, আপনি বোধহয় ঠিক বুঝতে পারছেন না–এমন ভদ্রভাষণও কোনও কাজের কথা নয়। শকুন্তলা তাই দুষ্যন্তকে বললেন–সরষের দানা দেখেছ, মহারাজ! অন্যের দোষটা যদি সরষের দানার মতোও হয়, তবে সেটা খুব তোমার চোখে পড়ে। কিন্তু তোমার নিজের ছিদ্রটা যে বেলের মতো এত বড়, সেটা তো নজরেই আসছে না–আত্মনো বিশ্বমাত্রাণি পশ্যপি ন পশ্যসি। শকুন্তলা এর আগে নিজের পিতা-মাতা সম্বন্ধে যা বলে ফেলেছেন, ফেলেছেন। এখন গলার জোরে তা ঠিক করার চেষ্টা করছেন। বেশ্যাপুত্রও অন্যের মুখে আপন জননীর বেশ্যা-পরিচয়ে ক্রুদ্ধ হয়। শকুন্তলা বললেন-আমার মাকে অত হেলাফেলা করো না, রাজা। মেনকা অঙ্গরা হলে কী হবে, তার চলা-ফেরা সব দেবতার মধ্যে, দেবতারা তার পেছন পেছন ঘোরেনমেনকা ত্রিশেষে ত্রিদশাশ্চানু মেনকাম্। সেদিক দেখতে গেলে তোমার জন্মের থেকে আমার জন্মের মর্যাদা অনেক বেশি–মমৈবোৎকৃষ্যতে জন্ম দুষ্যন্ত তব জম্মতঃ।
কথাটা শুনলে আপাতত মনে হতে পারে যেন শকুন্তলা একেবারে ছেলেমানুষি ঝগড়া করছেন। কিন্তু এই ছোট্ট একটি কথা–তোমার জন্ম আমার থেকে খারাপ–এই ছোট্ট একটি কথার মধ্যে কিছু ব্যঞ্জনা আছে বলে মনে হয়। শকুন্তলার জন্মবৃত্তান্ত দুষ্যন্ত তার মুখেই শুনে এসেছেন, কিন্তু এতদিন যখন দুষ্যন্ত তপোবন থেকে স্ত্রীকে আনবার জন্য কোনও চিন্তাই করেননি, তখন নিশ্চয়ই রাজার সমালোচনা কিছু হয়েছে। দুষ্যন্তর জন্মবৃত্তান্ত, পরের ঘরে মানুষ হওয়ার কথা, তখনই শকুন্তলার কানে এসে থাকবে। আমরা আগে বলেছিলাম-মরুত্ত রাজা যজ্ঞ সমাপন করে তাঁর মেয়ে সম্মতাকে দাসী হিসেবে দান করেছিলেন পুরোহিত সংবর্তকে। ‘দাসী’ শব্দে সেকালে ভোগ্যা স্ত্রীকেই বোঝানো হত। তার সামাজিক মর্যাদা অনেকটা বেশ্যার মতোই, বেশ্যা না হলেও অনেকটা রক্ষিতার মতো। আমরা অনুমান করেছিলাম–উচ্ছিন্ন পৌরববংশের কোনও অকুলীন পুরুষের সঙ্গে সম্মতার সঙ্গতি হওয়ার ফলেই দুষ্যত্তের জন্ম হয়েছিল এবং কন্যার প্রতি মমতাবশত মরুত্ত রাজা আর জামাইয়ের ওপর নির্ভর করেননি। তিনি নিজেই মানুষ করেছিলেন দুষ্যন্তকে।
