কালিদাসের শকুন্তলার কি রাগ হয়নি? খুবই হয়েছিল, কিন্তু তা তাকে দমন করতে হয়েছে কালিদাসের হৃদয় অনুসারে বিদগ্ধা নায়িকার মতো। মহাভারতের শকুন্তলাও আপাতত এই ক্ষুরমাণ ক্রোধ দমন করলেন কাশ্রমবাসিনী তপস্বিনীর শমতায়, তেজে। ঝগড়াঝাটির স্বরগ্রামের প্রথম স্বর থেকে তিনি আরম্ভ করতে চান, কারণ তিনি এখানে একা এবং কোথায় এ বিবাদ শেষ হবে তিনি জানেন না। শকুন্তলা বললেন–মহারাজ! সব মনে থাকা সত্ত্বেও সাধারণ হেঁদো লোকের মতো তুমি এমন মিথ্যা কথা বলছ কেন–জানম্নপি মহারাজ কম্মাদেবং প্রভাষসে? তুমি মনে মনে খুব ভালই জান–কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে। কাজেই আদালতে ভদ্রলোক যেমন সত্যি কথা বলে, তুমিও তাই কর। তোমার মন জানে একরকম, আর তুমি বলছ আরেকরকম। তুমি তো নিজের কাছ থেকে নিজেকেই চুরি করছ চোরের মতো?
মহাভারতের শকুন্তলা মহর্ষি কণ্বের পরম্পরায় জ্ঞানীর মতো কথা বলেন। রাজাকে তিনি জীবাত্মা সাক্ষী-চৈতন্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন–মানুষ নির্জনে পাপ করে ভাবে–পাপ কিসের? কেউ তো জানতেই পারেনি–মন্যতে পাতকং কৃত্বা ন কশ্চিৎ বেত্তি মামিতি। কিন্তু মহারাজ! তোমার অন্তরপুরুষ জানে, তুমি কী করছ। আর জানেন অন্তরীক্ষ লোকের দেবতারা। তোমার হৃদি-স্থিত কর্মসাক্ষী জীবাত্মাকে তুমি কঁকি দিতে পার না। তুমি এই রাজসভার মধ্যে আমাকে এমনভাবে অপমান করছ যেন আমি ভীষণ খারাপ নীচ স্বভাবের মহিলা। অবশ্য আমি বোধহয় শূন্যে রোদন করছি কারণ, তুমি কিছুই শুনছ না।
শকুন্তলা এরপর ‘জায়া’ ‘পুত্র’, ‘ভার্যা’–-এই সমস্ত শব্দের ধর্মীয় এবং সামাজিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে রতি, প্রীতি এবং ধর্ম যে পত্নীরই অধীন–তা খুব সুন্দরভাবে বোঝালেন। তারপর ভাবলেন–এতদিন পর যদি কোনও পুরুষ পূর্বপরিচিত স্ত্রীকে পছন্দ নাই করে, তবু তার পুত্রের ওপর তো মায়া থাকবে? শকুন্তলা তাই এবার পুত্রের কথা পাড়লেন। বললেন–মহারাজ! আমার কথা নাই ভাবলে, অন্তত পুত্রসুখের কথাটা ভাব। ধুলোমাটি গায়ে মেখে পুত্র যখন পিতার কোলে ওঠে–পিতুরাশ্লিষ্যতে’ঙ্গানি…ধরণীরেণুগুষ্ঠিতঃ–তখন সেই আনন্দের কি সীমা আছে কোনও? তোমার পুত্র এই সামনে উপস্থিত, সে তোমার কাছে যাবার জন্য কেমন করুণ চোখে তাকাচ্ছে তোমার দিকে, তাকে এমন করে অবজ্ঞা করছ কী করে? আরে এই সাধারণ পিঁপড়েগুলো পর্যন্ত নিজের ডিম কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, সযত্নে সেগুলিকে রক্ষা করে, –অণ্ডানি বিভ্রতি স্বানি ন ভিন্দন্তি পিপীলিকাঃ–সেখানে তুমি কোনওভাবেই এই স্বাঙ্গজাত পুত্রটিকে ফেলে দিতে পার না। তুমি যেদিন আশ্রম থেকে চলে এসেছিলে তখন থেকে এই পুত্রমুখ দেখেই আমি তোমার বিরহ-দুঃখ সহ্য করেছি। শান্ত সরোবরের মধ্যে মানুষ যেমন নিজের প্রতিবিম্ব দেখে, তেমনই পুত্রের মধ্যে পুরুষ-মানুষ তার নিজের ছায়াটাই দেখে, তোমার পুত্রও দেখ ঠিক তোমারই মতো–সরসীবামলে’ত্মানং দ্বিতীয়ং পশ্য বৈ সুতম।
শকুন্তলা পুত্রের উপযোগিতা সম্বন্ধেও অনেক শাস্ত্রবাণী শোনালেন রাজাকে। কিন্তু সেসবে যখন কিছু হল না, তখন বললেন–আমার কপালটাই খারাপ, রাজা! অঙ্গরাশ্রেষ্ঠা মেনকার গর্ভে আমার জন্ম। মুনিশ্রেষ্ঠ বিশ্বামিত্র আমার জনক। কিন্তু হলে হবে কী? কী নিষ্ঠুর সেই অপ্সরা-জননী আমার! জন্মমাত্রেই হিমালয়ের এক সমভূমিতে আমাকে ফেলে দিয়ে চলে গেলেন তিনি-যেন পরের ছেলে কোলে নিয়েছিলেন কোনওমতে–অবকীৰ্য্য চ মাং জাতা পরাত্মজমিবাসতী। আগের জন্মে কী পাপই না করেছিলাম, ঠাকুর! নইলে, সেই ছোটবেলায় বাপ-মা আমায় ছেড়ে চলে গেল, আর এখন তুমি আমায় অস্বীকার করছ–কিং নু কৰ্মশুভং পূর্বং কৃতবত্যন্যজন্মনি। তা বেশ, আমাকে না হয় তুমি চিনেও চিনলে না, না হয় ত্যাগই করলে আমাকে, আমি সেই আশ্রমেই আবার ফিরে যাব না হয়, কিন্তু এই ছেলেটি তোমার, একে তুমি নিশ্চয়ই ফেলে দিতে পার না-ইমন্তু বালং সন্ত্যকুং নাৰ্হস্যাত্মজমাত্মনা।
শকুন্তলা এতক্ষণ ভালয় ভালয় অনেক কথা বলেছেন। ঝগড়া করার জন্য এখনও সেরকম করে গলা তোলেননি। মনে ক্রোধ জমা হলেও তা প্রকাশ করেননি। যা বলেছেন, তা সমাজ, ধর্ম এবং নৈতিকতার যুক্তি দিয়েই বলেছেন। এমনকি যা বলেছেন, তার মধ্যে সরলতাও এত বেশি ছিল যে, মহারাজ দুষ্যন্ত এবার তার সুযোগ নেবেন। সেই তপোবনে শকুন্তলাকে দেখে মুগ্ধ হওয়ার পরেই দুষ্যন্ত তার কাছে তার জন্মবৃত্তান্ত শুনতে চেয়েছিলেন। শকুন্তলা অকপটে সব বলেওছিলেন। কথায় বলে–অর্থনাশ, মনের কষ্ট আর ঘরের কলঙ্ক কোথাও বেশি বলতে যেও না–অর্থনাশং মনস্তাপং গৃহে দুশ্চরিতানি চ। কিন্তু কথাশ্রমে পালিতা শকুন্তলা রাজাকে আপনার সমব্যথী ভেবে হৃদয় উজাড় করে সব বলে দিয়েছেন। নিজের মায়ের কলঙ্কও গোপন করেননি। কিন্তু এখন একাকিনী পুত্রের হাত ধরে শকুন্তলা দাঁড়িয়ে আছেন রাজসভায় আর দুষ্যন্ত সরলা বালিকার সেই অকপট স্বীকারোক্তির সুযোগ নিচ্ছেন।
দুষ্যন্ত এতক্ষণ ধরে শকুন্তলার কথা শুনে পূর্বকালের বহুবিবাহিত কুলীন বামুনের মতো বললেন–তোমার গর্ভে আমার একটি পুত্র হয়েছে–এসব কথা আমার মোটেই স্মরণ হচ্ছে না। আর তোমার কাছে যেমন শুনছি, তাতে তোমার জননীটিকে তো একটি নির্দয়-হৃদয় বেশ্যা। ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না–মেনকা নিরনুক্রোশা বন্ধকী জননী তব। পুজোর প্রসাদী ফুল যেমন একসময় ফেলে দেয়, তেমনই তোমার মা মেনকা তোমাকে নির্মাল্যের মতো হিমালয়ের এক কোণে ফেলে দিয়ে গেছে। তোমার বাবা বিশ্বামিত্রও যে খুব দয়ালু মানুষ, তা মোটেই নয়। তার আবার একসময় বামুন হবার শখ হয়েছিল–বিশ্বামিত্রো ব্রাহ্মণত্বে লুব্ধ–কিন্তু এখন যা দেখছি তাতে ষড়রিপুর প্রথমটিই তো তার প্রধান অবলম্বন।
