মহাভারতের কবি এবার রাজার সম্বন্ধে নিরপেক্ষ মন্তব্য করছেন। তিনি বললেন শকুন্তলার কথা শুনে রাজার সব কথা মনে পড়া সত্ত্বেও–তস্যা রাজা স্মরম্নপি–রাজা মিথ্যে কথা বললেন। বললেন-তোমার কথা আমার কিছুই মনে পড়ছে না। তোমার বেশটা তপস্বিনীর মতো হলে কী হবে, আসলে তুমি বদমাশ মেয়েছেলে। ধর্ম বল, অর্থ বল, আর কামই বল–এই তিন বর্গের কোনওটার ব্যাপারেই আমার সঙ্গে তোমার কোনওদিন কোনও সম্বন্ধ ঘটেছিল বলে আমার তো মনে পড়ছে না–ধর্মার্থকামসম্বন্ধং ন স্মরামি ত্বয়া সহ। কাজেই তুমি এখানে থাক, বা চলে যাও, বা যা ইচ্ছে তাই করো, তাতে আমার কী আসে যায়–গচ্ছ বা তিষ্ঠ বা কামং যথেচ্ছসি তথা কুরু।
পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, মহাভারতের দুষ্যন্ত জ্ঞানপাপী আর কালিদাসের দুষ্যন্ত দুর্বাসার শাপের ফলে পূর্বঘটনা বিস্মৃত। স্বভাবতই কালিদাসের দুষ্যন্ত অনেক মহনীয় স্বভাবের মানুষ। কিন্তু কেন, এই কেন’র মধ্যেই আমাদের মতে দুর্বাসার শাপের তাৎপর্য লুকিয়ে আছে। মনে রাখতে হবে–কালিদাস রাজসভার কবি। গুপ্তযুগের কোনও বিশালকীর্তি মহারাজার সভাকবি তিনি–সেকথা একেবারে নির্দিষ্ট করে জানা না গেলেও তার কাছে রাজার গৌরব অনেক বেশি। বিশেষত পৌরব-বংশের অধস্তন দুষ্যন্তের সম্বন্ধে বারবার তার নাটকে মর্যাদা ফুটে উঠেছে। তপোবনের প্রথম উপন্যাসে সেই যে–’জন্ম যস্য পুরোৰ্বংশে’–বলে পৌরব-বংশের মহিমা কীর্তন করেছেন কালিদাস, সেই মহিমা থেকে তার দুষ্যন্ত চ্যুত হননি কখনও। এমনকি অভিজ্ঞানের তৃতীয় অঙ্কে, যেখানে শকুন্তলা দুষ্যত্তের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হচ্ছেন, সেখানেও দুষ্যন্তকে অতি-আগ্রহ থেকে নিবৃত্ত করার জন্য শকুন্তলার মুখে সেই মর্যাদার অভিধান-পৌরব! শিষ্টাচার রক্ষা করো। কামনায় পীড়িত হলেও আমার নিজের ওপরে প্রভুত্ব নেই কোনও-পৌরব! রক্ষ বিনয়। মদনসন্তপ্তা অপি নহি আত্মনঃ প্ৰভবামি।
বস্তুত পৌরব-বংশীয় এক রাজার সম্বন্ধে কালিদাসের এই মর্যাদাবোধ তৈরি হয়েছে গুপ্ত-বংশীয় রাজাদের মর্যাদাবোধ থেকেই। পুরুংশের বংশকর পুরুষ দুষ্যন্ত নিজের পরিণীতা পত্নীকে সম্পূর্ণ চেনা সত্ত্বেও অস্বীকার করছেন–এই মিথ্যাচার এক স্বর্ণযুগীয় রাজার সভাকবির পক্ষে সহ্য করা কঠিন। সেই কারণেই, হয়তো বা গুপ্ত-রাজার মর্যাদায় প্রতিবিম্বিত পৌরব-রাজার মর্যাদা রক্ষার জন্যই কালিদাস দুর্বাসার শাপের অবতারণা করেছেন অভিজ্ঞানশকুন্তলে। বিস্মৃতির মতো এক অনিবার্য অভিশাপের নিয়তি তৈরি করে রাজসভায় কবি কালিদাস পৌরব দুষ্যন্তকে সমস্ত সামাজিক সঙ্কট এবং লোকাপবাদ থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। রাজা দুষ্যন্ত সেখানে এমনই এক রাজমহিমায় প্রতিষ্ঠিত, যেখানে তিনি পরিণীতা শকুন্তলার সম্বন্ধে কটু কথা কিংবা পূর্ব-পরিণয়ের অস্বীকৃতি জানালেও পাঠক-দর্শক তাকে বড় দোষ দিতে পারে না। দুর্বাসার শাপে যখন তার কিছুই মনে নেই, তখন যদি শকুন্তলা বলেন–ঠিক আছে আপনার দেওয়া স্মৃতিচিহ্ন দেখিয়ে আপনার সন্দেহ দূর করছি–সেই মুহূর্তে রাজা একান্ত রাজোচিতভাবে বলেন-উদারঃ কল্প-উত্তম প্রস্তাব।
পাঠক এখানেও রাজার বিচার-বুদ্ধি এবং স্বচ্ছ স্বভাবে সন্দেহ করতে পারে না। কোনও প্রমাণ পেলে রাজা নিশ্চয় মানবেন–এই নিরপেক্ষ রাজগুণে পাঠকের অন্তঃকরণ আশান্বিত হয়। কিন্তু শকুন্তলা তার আংটি হারিয়ে ফেলেছেন। ফলত রাজার কটুক্তি তাকে শুনতেই হবে–এই অবধারিত যুক্তিতে শকুন্তলার জন্য পাঠকের মন যতই বিষণ্ণ হোক, পূর্বানুরাগবিস্মৃত শাপগ্রস্ত দুষ্যন্তকে তারা ক্ষমা করে দেয়। কালিদাস আপন কবি-প্রতিভায় দুষ্যন্তকে যে এই অপূর্ব মর্যাদায় স্থাপন করেছেন, তার কারণ অন্য আর যা কিছুই হোক, অন্তত একটা কারণ তার নিজেরই পরিশীলিত বিদগ্ধ নাগরিক রুচি। সেই রুচিতে একজন পৌরব রাজাকে মিথ্যাচারী, কপট, হীন অবস্থায় রেখে দেওয়া যায় না। ফলত মহাভারতের আকরিক অবস্থা থেকে দুষ্যতকে তুলে এনে তিনি তাকে দুর্বাসার অভিশাপের মূছায় যতখানি বিস্মৃতমূৰ্ছিত করেছেন, তার থেকে অনেক বেশি, তিনি তাকে পৌরব রাজার মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠা করেছেন।
অন্যদিকে শকুন্তলার অবস্থাও তাই। রাজাকে তিনি যত কথা বলেছেন, তাতে শকুন্তলার দিক থেকে সবচেয়ে বড় গালাগালি হল–অনার্য। সেকালের নাগরিক শব্দকোষে অনার্য শব্দের চেয়ে বড় তিরস্কার কিছু নেই। আর এই শব্দটাই যদি আরও একটু বিশদভাবে বলা যায়, তবে কালিদাসের শকুন্তলার মুখে যা আসে, তা হল অনার্য। আপনি নিজের মন দিয়ে সবাইকে দেখছেন। এমন আর অন্য কে আছে যে ধর্মের পোশাক পরা, ঘাসে ঢাকা কূপের মতো আপনাকে অনুকরণ করবে?
মহাভারতের দুষ্যন্ত যখন শকুন্তলাকে চিনেও ইচ্ছে করে চিনলেন না–তস্যা রাজা স্মরপি–তখন প্রথম আঘাতে ক্ষণিকের তরে শকুন্তলা যেন লজ্জা পেয়েছিলেন, ক্ষণিকের তরে যেন তার সংজ্ঞা লুপ্ত হয়েছিস–নিঃসংজ্ঞেব চ দুঃখেন…ব্রীড়িতেব তপস্বিনী। অর্থাৎ সবটাই যেন। লজ্জায় ভেঙে পড়ে রাজসভায় সংজ্ঞালপ্ত হয়ে পড়ে যাবার মতো দুর্বল রমণী তিনি নন। আকস্মিক আঘাত কাটিয়ে উঠতেই রাগে-অধৈর্যে তার চোখ লাল হয়ে উঠল, ঠোঁট কাঁপতে থাকল আর বাঁকা চোখে এমন অর্থপূর্ণভাবে তিনি দুষ্যন্তের দিকে তাকাতে থাকলেন, যেন রাজাকে তিনি এক্ষুনি ভস্ম করে দেবেন–কটাক্ষৈনিহতীব তির্য রাজানমৈত।
