৪৫.
রাজবধূ শকুন্তলা স্বামীর রাজসভায় প্রবেশ করতে যাচ্ছেন, অথচ কেউ তাকে রানি বলে চিনল না। কোনও মঙ্গলশঙ্খ বেজে উঠল না তাঁর এতদিনের প্রতীক্ষিত আগমনে, দাসীরা কেউ রাজদ্বারে দাঁড়িয়ে নেই পুষ্পের থালি হাতে। তপস্বীরা রাজবাড়ির দৌবারিকের কাছে শকুন্তলা এবং তার পুত্রের প্রবেশ সুগম করার জন্য অনুমতি চাইলেন এবং রাজার অনুমতিক্রমে তাদের প্রবেশ করানো হল–বেদিতা চ প্রবেশিতা। শকুন্তলার সঙ্গে আসা কথাশ্রমের তপস্বীরা শকুন্তলা রাজসভায় ঢুকেছেন দেখেই সঙ্গে সঙ্গে ফিরে গেলেন–আশ্রমং পুনরাগতঃ। শকুন্তলা রাজসভায় প্রবেশ করলেন পুত্রের হাত ধরে, একা।
যে মহাকবি একটি মাত্র ঘটনার অন্তর্ভুক্তি ঘটিয়ে সংস্কৃত সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটকটি লিখে ফেললেন, সে ঘটনা মহাভারতে নেই। তপোবন থেকে ফিরে আসবার আগে নিজের নাম লেখা যে আংটিখানি দুষ্যন্ত পরিয়ে দিয়ে এসেছিলেন শকুন্তলার হাতে, মহাকাব্যে তার। চিহ্নমাত্র নেই। মহাভারতের দুষ্যন্ত মহান পৌরব বংশের একান্ত অলক্ষ্য বীজ ব্যতীত আর কোনও স্মরণচিহ্ন রেখে আসেননি শকুন্তলার কাছে। কালিদাসে এই আংটির সূত্র ধরেই দুর্বাসার শাপও অনেক অর্থবহ হয়ে উঠেছে। কালিদাসের অভিজ্ঞানে দুর্বাসার অভিশাপ এমনই। এক অপূর্ব ঘটনা, যার মাধ্যমে নাটকের সমস্ত নাটকীয়তাই তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন কালিদাস। তপোবনের মধ্যে দুষ্যন্ত-শকুন্তলার মধ্যে যে কামনার আবর্ত তৈরি হয়েছিল, তারই ফলস্বরূপ গ্রিক ট্র্যাজেডির নেমেসিস’ যেন দুর্বাসার শাপের আকার ধারণ করেছে অভিজ্ঞান শকুন্তলে।
দুর্বাসার শাপের তাৎপর্য নিয়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী থেকে রবীন্দ্রনাথ–সকলেই ব্যাকুলিত হয়েছেন। আমরা তার মধ্যে যাচ্ছি না। শুধু বলে রাখি–দুর্বাসার শাপের একটা রাজনৈতিক সামাজিক তাৎপর্যও আছে, তবে সে কথা আসবে আমাদের কাহিনীর অনুক্রমেই। কালিদাসের বর্ণনায় দেখছি–রাজার কাছে শকুন্তলার প্রসঙ্গ প্রথম উত্থাপন করছেন কংশিষ্য শারব। তিনি মহর্ষি কন্থের নাম করে বলেছেন–আপনারা নিজে নিজে ঠিক করে যে বিবাহ করেছিলেন, সেটা মহর্ষি মেনে নিয়েছেন। এখন এই অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাকে আপনি আপনার গৃহস্থ ধর্ম আচরণের সহায় হিসেবে গ্রহণ করুন-তদিদানী আপন্নসত্ত্বা প্রতিগৃহ্যতাং সহধর্মচরণায়েতি। শার্সরবের বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে আর্যা গৌতমী–একমাত্র বয়স্কা মহিলা যিনি শকুন্তলার সঙ্গে এসেছিলেন তিনিও একটু বাঁকা করে বলেছিলেন–আমাদের মেয়েও কোনও গুরুজনের অক্ষো করেনি, আর আপনিও আপনার আত্মীয়-বন্ধুদের সঙ্গে একটুও আলোচনা করেননি নাপেক্ষিত গুরুজনো’নয়া ন ত্বয়া পৃষ্টে বন্ধুঃ। আপনারা নিজেরাই যেহেতু স্বাধীনভাবে সব কিছু করেছেন, সেখানে একজনের জন্য আরেকজনের কাছে কী আর ওকালতি করব?
শার্ঙ্গরব, আর্যা গৌতমী–এঁদের কথা শুনে রাজার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল–এ সব আবার কী শুরু হল? উপন্যাস নাকি–কিমিদম উপন্যস্তম? আর লজ্জানম্রা অবগুণ্ঠনবতী শকুন্তলা রাজার প্রথম কথাটা শুনে মনে মনে বলেছিলেন-কথা তো নয়, যেন আগুন–পাবকঃ খলু বচনোপন্যাসঃ। শারব রাজার কথায় আমল দেননি। শকুন্তলাকে রাজার ঘরে প্রবেশ করানোর জন্য নতুন যুক্তির অবতারণা করেছেন। রাজা তাতে বলেছেন–আমি কি কখনও এই রমণীকে বিবাহ করেছি বলে আপনাদের মনে হচ্ছে–কিং ভবতী ময়া পরিণীতপূর্বা? শারব আকাশ থেকে পড়েছেন, আর্যা গৌতমী রাজার প্রত্যয়ের জন্য শকুন্তলার অবগুণ্ঠন খুলে তাকে চেনানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু রাজা চিনতে পারেননি। কিছুই তার মনে পড়ছে না। মনে পড়ছে না, কারণ দুর্বাসা শাপ দিয়েছেন। শকুন্তলা তপোবনে বসে রাজার কথা ভাবতে ভাবতে সব ভুলে গিয়েছিলেন। দুর্বাসা অতিথি হয়ে এসে হাজার জানান দিয়েও শকুন্তলার ধ্যান ভাঙাতে পারেননি, তাই দুর্বাসা শাপ দিয়ে গেছেন–যার কথা তুই এমন করে ভাবছিস, তাকে হাজার বোঝালেও, হাজার চেনালেও সে তোকে চিনতে পারবে না–স্মরিষ্যতি ত্বং ন স বোধিতোপি সন।
প্রিয়ংবদা দুর্বাসা মুনিকে অনেক তুষ্ট করে মুনির কাছ থেকে কথা আদায় করেছিলেন যে, কোনও আভরণ-চিহ্ন রাজাকে দেখাতে পারলে রাজা তাকে চিনতে পারবেন। অনসূয়া সে কথা শুনে বলেছিলেন-বাঁচা গেল। রাজার দেওয়া আংটি তো শকুন্তলার কাছেই আছে। অতএব এ যাত্রায় বেঁচে যাবে শকুন্তলা। কিন্তু শকুন্তলা বাঁচেননি। অপূর্ব-নির্মাণ-নিপুণ কবি সেই রাজার নামাঙ্কিত আংটিটি শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রার পথেই হারিয়ে দিয়েছেন। যাত্রাপথে শচীতীর্থের জলে স্নান-বন্দনা করতে নেমে শকুন্তলা আংটি হারিয়ে এসেছিলেন। অতএব দুর্বাসার শাপ ক্ষীণ হবার মতো কোনও উপকরণই রইল না শকুন্তলার অধীনে। রাজা কিছুই স্মরণ করতে পারলেন না। কালিদাসের নাটকে অপূর্ব করুণরসের যোজনা হল শৃঙ্গাররসের গৌণ বান্ধবের মতো।
মহাভারতের শকুন্তলার কাছে কোনও দুর্বাসা মুনি আসেননি। আংটি, অভিশাপ–কিছুই সেখানে নেই। তিনি পুত্রের হাত ধরে রাজসভায় ঢুকলেন এবং কোনও ভণিতা না করে রাজাকে বললেন–মহারাজ! এই নাও তোমার ছেলে। তুমিই এর জন্ম দিয়েছিলে। আমার সঙ্গে তোমার যেমন কথা হয়েছিল, সেই প্রতিজ্ঞা অনুসারে তোমার এই পুত্রকে এখন তোমার যুবরাজের সিংহাসনটি দেওয়ার কথা–অয়ং পুত্রঃ ত্বয়া রাজন্ যৌবরাজ্যেভিষিচ্যতাম্। এতদিন পরে রাজার যদি সামান্য সন্দেহ বা বিস্মৃতিও কাজ করে, তাই শকুন্তলা এখানেই থামেননি। অবশ্য অবগুণ্ঠন মোচন করা, অথবা সেই যে সেই হরিণ-শিশু আমার আঁচল ধরে টেনেছিল–এই সব কাব্যিক স্মারকচিহ্ন কিছু নয়; যে ঘটনা সবার মনে থাকে সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শকুন্তলা একেবারে গ্রাম্য ভাষায় বললেন–আমার সঙ্গে সঙ্গমের পূর্বে তুমি যে প্রতিজ্ঞা করেছিলে, মহারাজ!-যথা সমাগমে পূর্বং কৃতঃ স সময়ঃ ত্বয়া–তুমি শুধু সেই কথাটা স্মরণ করো–তং স্মরস্ব মহাভাগ কন্যাশ্রমপদং প্রতি।
