যে কবি গুপ্তরাজাদের স্বর্ণযুগে বসে বিরহিনী শকুন্তলাকে গর্ভিণী অবস্থায় পতিগৃহে যাত্রা করিয়ে দর্শক-শ্রোতার অনুকম্পা আকর্ষণ করবেন, তাকে অন্তত এই অংশের জন্য মহাভারতের কবির কাছে ঋণী বলা যায় না। মহাভারতে দুষ্যন্ত রাজা রথ পাঠানোর প্রতিজ্ঞা করে চলে গেলেন বটে, কিন্তু কোথায় সেই প্রতিজ্ঞাত চতুরঙ্গিনী সেনা? কোথায় রাজার রথ? দুষ্যন্তের রাজধানী থেকে কেউ এল না নির্জন আশ্রম-ভবনে, শকুন্তলাকে রাজধানীতে নিয়ে যাবার জন্য। তিনটি বৎসর সম্পূর্ণ চোখের ওপর দিয়ে চলে গেল–ত্রিস্ত বর্ষে পূর্ণেষু–রাজার রথ একবারও ঘর্ঘর করে এল না কৰাশ্রমের বনপথ ধরে। কিন্তু সময়কালে শকুন্তলার পুত্র জন্মাল মহর্ষির আশ্রমেই–অস্ত গর্ভং বামোরূঃ কুমার অমিতৌজসম্।
কী তার চেহারা! কী তার রূপ! মহর্ষির আশ্ৰম কুটিরে এক পুঞ্জ আগুন জ্বলে রইল শকুন্তলার কোল আলো করে। মহর্ষি কণ্ব পৌরব দৌষ্যন্তির জাতকর্মের সমস্ত সংস্কার সম্পন্ন করলেন। ছেলে বড় হতে লাগল ঋষির আশ্রমে। ছয় বৎসর বয়স হল ছেলের। গায়ের রঙ উজ্জ্বল হল, শরীর দৃঢ়, সম্ভাব্য সিংহের তেজ তার শারীরিক এবং মানসিক গঠনে। কুমার আরও একটু বড় হতেই তার রাজত্ব গড়ে উঠল বনস্থলীর পশু-সমাজকে নিয়ে। বাঘ, সিংহ, হাতি–সব কিছু ধরে এনে আশ্রমের কাছাকাছি গাছগুলিতে বেঁধে রাখা তার নিত্যদিনের খেলার মধ্যে পড়ত–ববন্ধ বৃক্ষে বলবান্ আশ্রমস্য সমীপতঃ। আশ্রমবাসীরা আগে কাউকে এমন দেখেননি। বন্য পশু-সমাজকে এইভাবে নিয়ন্ত্রণ-তাড়ন করা যে সে লোকের কর্ম নয়। আর সেটাই যখন এই রাজকুমার পারে–অতএব, আশ্রমবাসীরা বলল–অতএব এই রাজকুমারের নাম হোক সর্বদমন–অস্তু অয়ং সর্বদমনঃ সর্বং হি দময়ত্যয়ম্।
শক্ত-সমর্থ বালক সর্বদমনকে দেখে মহর্ষি বিচলিত হলেন। মহারাজ দুষ্যন্ত এখনও কোনও খোঁজই নেননি শকুন্তলার। তার যে একটি পুত্র এই আশ্রমের পরিবেশে বড় হয়ে উঠল, তাও তিনি ভাল করে জানেন না। মহর্ষি একদিন শিষ্যদের ডেকে বললেন–তোমরা শকুন্তলা আর তার ছেলেকে নিয়ে দুষ্যন্তের কাছে রেখে এসো। বিবাহিতা একটি রমণী যদি সুচিরকাল ধরে তার বাপের বাড়িতে পড়ে থাকে তবে পাঁচ জন পাঁচ কথা বলে-নারীণাং চিরবাসো হি বান্ধবেষু ন রোচতে। এমনি করে বেশি দিন থাকলে তার চরিত্র, ধর্ম, স্বভাব নিয়েও নানা প্রশ্ন আসবে। তোমরা তাই আর দেরি করো না, শকুন্তলাকে নিয়ে যাও দুষ্যন্তের কাছে–তস্মান্নয়ত মা চিরম্।
মহারাজ দুষ্যন্তকে শকুন্তলা যে শর্তের কথা বলেছিলেন–তোমার রাজ্যে আমার গর্ভজাত পুত্রই হবে যুবরাজ–সেই শর্তের কথা মহর্ষি কথও জানেন। ফলে বয়ঃপ্রাপ্ত সর্বদমনকে দেখে মহর্ষি শকুন্তলাকে বলেছিলেন–এখন সময় হয়েছে মা! তোমার সর্বদমন এবার যুবরাজ হবে–সময়গা যৌবরাজ্যায় ইত্যব্রবীচ্চ শকুন্তলা। শকুন্তলা আপত্তি করেননি। মহর্ষির যুক্তিপূর্ণ কথা শুনে তিনি তাঁর শিষ্যদের নিয়ে দুষ্যতের রাজধানীর পথে রওনা হলেন, জনান্তিকে বলি–মহাভারতের কথকঠাকুর নিজে যেখানে বসে আছেন, সেই জায়গাটার নাম করেই মুখ ফসকে বলে ফেললেন–শকুন্তলার ছেলে সর্বদমনকে নিয়ে কথষুনির শিষ্যরা হস্তিনাপুরে। চললেন দুষ্যন্তের কাছে-শকুন্তলাং পুরস্কৃত্য সপুত্রাং গজসায়। কিন্তু হস্তিনাপুর তখন কোথায়? দুষ্যন্তের বেশ কয়েক পুরুষ পরে পুরুবংশের পরম্পরায় মহারাজ হস্তীর রাজত্বকালে হস্তিনাপুরের প্রতিষ্ঠা হবে। কাজেই হস্তিনাপুরে নয়। শকুন্তলাকে নিয়ে কণের শিষ্যরা চললেন দুষ্যতের রাজধানীতে। হয়ত হস্তিনাপুরের কাছাকাছি কোনও জায়গায়।
অভিজ্ঞানশকুন্তলের কবি তার নাটকের চতুর্থ অঙ্কে গর্ভিণী শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রার প্রাক্-মুহূর্তগুলি ধরে রেখেছেন ছবির মতো কয়েকটি শ্লোকে। কিন্তু মহাভারতের কবির জগৎ নিতান্তই কর্তব্যময়। এখানে কোনও মৃগশিশু অর্ধভূক্ত শম্পগ্রাস ত্যাগ করে শকুন্তলার আঁচল ধরে টানল না, নৃত্য ত্যাগ করল না ময়ূর-ময়ূরী। আশ্রমের বনবৃক্ষ থেকে অশ্রু-কুসুম ঝরে পড়ল না। কোনও প্রিয়ংবদা প্রিয়সখী ইন্দুপাণ্ড-তরু’র চীরবাস পরিয়ে দিল না শকুন্তলাকে; কেউ বনফুলের আভরণ রচনা করে দিল না শকুন্তলার কেশে, গ্রীবায়, হাতে। বাষ্পচ্ছন্ন মহর্ষির কণ্ঠ দিয়ে কোনও উদ্বেল উচ্ছ্বাস ধ্বনিত হল না, শকুন্তলাও জিজ্ঞাসা করলেন না–কবে তিনি আবার ফিরে আসবেন শান্ত আশ্ৰমপদে।
মহাভারতের কবি শকুন্তলাকে পতিগৃহযাত্রা করালেন অত্যন্ত বাস্তব-কঠোর অনাড়ম্বর। পরিবেশের মধ্যে। শকুন্তলা এখানে কোনও পুষ্পঘাতভঙ্গুরা নায়িকা নন। তিনি স্বাধীনচেতা, প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বময়ী। দুষ্যন্তের স্বভাব তিনি জেনে গেছেন, বুঝেও গেছেন।–দুষ্যন্তবিদিতাত্মনা। এতদিন পরে দুষ্যন্তের কাছে তিনি যুবতীর প্রেম, স্ত্রীর ভালবাসা ভিক্ষা কতে আসেননি। তিনি এক দীপ্তিমান পুত্রের হাত ধরে দুষ্যন্তের রাজধানীতে পৌঁছেছেন তারই পুত্রের মাতৃত্বের অধিকার নিয়ে–গৃহীত্বামরগর্ভাভং পুত্রং কমললোচন। প্রেমের দাবি নয়, পুত্রের যৌবরাজ্য দাবি করার জন্য শকুন্তলা এসেছেন তার সমস্ত শক্তি নিয়ে–দুষ্যত্তের সঙ্গে আজকে তার বোঝাপড়া হবে।
