মহর্ষি কণ্ব সন্ন্যাসী যতই হোন, তার লৌকিক বুদ্ধি অতি প্রখর। তিনি জানেন–বয়ঃসিদ্ধ। স্বভাবেই যুবক-যুবতীর হৃদয়ে কামনার তরঙ্গ ওঠে, তাকে ধমক দিয়ে বা অভিশাপ দিয়ে রুদ্ধ করা যায় না। তিনি শকুন্তলাকে পরিষ্কার বললেন–আমাকে গুরুত্ব না দিয়েও গোপনে তুমি আজ যা করেছ–রহসি মাম্ অনাদৃত্য যঃ কৃতঃ–অর্থাৎ একটি পুরুষের সঙ্গে তোমার এই গোপন মিলনে অধর্ম কিছু হয়নি, মা! তিনি তোমাকে চেয়েছেন, তুমিও তাঁকে চেয়েছ–এই পারস্পরিক চাওয়ার মধ্যেই গান্ধর্ব বিবাহের সিদ্ধি লুকনো আছে। এমন বিয়েতে মন্ত্র-তন্ত্রের বালাই নেই কিছু–সকামায়াঃ সকামেন নির্মন্ত্রো রহসি স্মৃতঃ। ক্ষত্রিয় পুরুষেরা এমন বিবাহ করেই থাকেন। আর তোমার দিক থেকেও এতে কোনও অধর্ম ঘটেনি মান স ধর্মোপঘাতকঃ। তাছাড়া মহারাজ দুষ্যন্ত ধর্মজ্ঞ পুরুষ, মহাত্মা। পুরুষ-সমাজে তার মতো মানুষ কোথায় আছে? তুমি তার আমন্ত্রণ স্বীকার করে যথার্থ কাজই করেছ।
হায়! আধুনিক যুবক-যুবতীর ভাগ্যে মহর্ষি কঘের মতো আরও কয়েকটি পিতার জন্ম হত যদি! মহর্ষি কথ দুষ্যন্ত-শকুন্তলার গান্ধর্ব-মিলন স্বীকার করে নিলেন এক অতি আধুনিক অনুকূলতা এবং সহজভাব দেখিয়ে। একই ভাব কালিদাসেও আছে অতি সংক্ষেপে, যদিও তা আরও কাব্যিক সরসতায় জারিত। আশ্রমিক ঋষির দৃষ্টিতে চোখে-না-দেখা দুষ্যন্ত সেখানে খানিকটা অন্তরীক্ষ লোকের দেবতার মতো। গান্ধর্ব-বিবাহে শকুন্তলার আত্মদানের ঘটনাটা তিনি যাজ্ঞিক ঋষির কল্পনায় ব্যক্ত করে বলেছেন-যজ্ঞ করার সময় যজ্ঞ-কাষ্ঠের ধোঁয়ায় দৃষ্টি অবরুদ্ধ হলেও যজমানের আহুতিটা আগুনেই পড়েছে ঠিকঠাক–দিষ্টা ধুমাকুলিতদৃষ্টেরপি যজমানস্য পাবকে এব আহুতিঃ পতিতা। মহাভারতের কণ্বমুনি শকুন্তলাকে সেই মুহূর্তেই আশীর্বাদ করে বলেছেন–তোমার গর্ভে এক বিরাট রাজপুরুষ জন্মাবেন। এই সসাগরা পৃথিবী তার অধিগত হবে। তিনি হবেন চক্রবর্তী সম্রাট।
এতক্ষণে যেন শকুন্তলার হুঁশ হল। যখন তিনি বুঝলেন–মহর্ষি কণ্ব ক্ষুব্ধ হননি তার গোপন-মিলনে, তখনই লজ্জান মুখখানি তুলে পিতার কাছে এলেন। তার ক্লান্ত স্কন্ধ থেকে নামিয়ে নিলেন সংগৃহীত সমি-ফুল-ফলের ঝোলাটি। এগিয়ে দিলেন পা ধধায়ার জল; আর কী আশ্চর্য, এরই মধ্যে ক্ষণকাল-সন্নিহিত প্রণয়ী রাজার সমৃদ্ধির জন্য কুশল-ভিক্ষা করলেন মহর্ষির কাছে। বললেন–তাঁর কোনও দোষ নেই পিতা। আমি স্বেচ্ছায় তাঁকে স্বামী হিসেবে বরণ করেছি–ময়া পতিতো রাজা দুষ্যন্তঃ পুরুষোত্তমঃ। তুমি তার প্রতি প্রসন্ন হও পিতা। শকুন্তলার কথা শুনে আধুনিক পিতা যা বলেন কণ্বও তাই বললেন। আজকের দিনে যদি আমাদের মেয়ে তার উপযুক্ত প্রণয়ীকে স্বামী হিসেবে বেছে নেয়, তবে সেই প্রণয়ী-স্বামী আমাদের একান্ত অজানা-অচেনা, এমনকি অপছন্দ হলেও, সে যেমন আমাদের মেয়ের প্রণয়-স্বার্থেই আমাদের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে, মহর্ষি সেই দৃষ্টিতেই শকুন্তলাকে বললেন–আমি তো তোর জন্যেই দুষ্যন্তের ওপর খুশি হয়েছি মা। তুই তাকে নিজে পছন্দ করেছিস, আমি কি তার ওপর প্রসন্ন না হয়ে থাকতে পারি–প্রসন্ন এব তস্যাহং ত্বকৃতে বরবণিনী।
নতুন বিয়ে হলে গর্বিণী বধূটি যেমন বাপের বাড়ি এসে শ্বশুর বাড়ির সম্বন্ধে উচ্চগ্রামে নানা প্রশংসা করে কথা বলে,–আমার শ্বশুরবাড়িতে এরকমটি চলবে না, এমনটি হলে আমার শ্বশুর-শাশুড়ি তুলকালাম করে ফেলবেন–এইরকম নানা কল্পিত গৌরবে বধুটি যেমন গৌরবান্বিত হয়, ঠিক তেমনই শকুন্তলাকে আমরা শ্বশুরবাড়িতে যাবার আগেই যথেষ্ট গৌরবান্বিত দেখছি। তিনি যে প্রসিদ্ধ পৌরব-বংশের বন্ধু নির্বাচিত হয়েছেন, স্বামীর বিশাল রাজ্য এবং রাজত্ব নিয়ে তারও যে কত দায়িত্ব আছে, সে কথা বেশ প্রকট হয়ে উঠল শকুন্তলার হাবে-ভাবে, কথা-বার্তায়। কণ্বমুনি প্রসন্ন হয়ে শকুন্তলাকে বর চাইতে বললে শকুন্তলা বললেন-পৌরব-বংশের রাজারা যেন আপন ধর্ম থেকে চ্যুত না হন, পৌরবরা যেন তাদের রাজ্যে চিরপ্রতিষ্ঠিত থাকেন–ততে ধর্মিষ্ঠতাং বট্রে রাজ্যাচ্চাস্থলনং তথা।
পরিষ্কার বোঝা যায়–এখনও দূষ্যন্তের রাজধানীতে প্রবেশ না করলেও শকুন্তলা এখনই পৌরব দুষ্যতের রাজবধু হবার গৌরব অনুভব করছেন। ইন্দ্রিয়-সুখের চরিতার্থতায় ক্ষণমাত্র বিচলিত হলেও কথাশ্রমের পালিতা কন্যাটি মুহূর্তের রূপান্তরে পৌরববংশের রাজবধুর ইতিকর্তব্যতার মধ্যে নিজেকে স্থাপন করেছেন। হয়তো দুষ্যন্ত-শকুন্তলার মৌর্তিক মিলনের মধ্যে প্রেম ছিল না কোনও, হয়তো যুবক-যুবতীর ইন্দ্রিয়-চরিতার্থতাই সেখানে বড় হয়ে উঠেছিল, কিন্তু প্রেম না থাকলেও বিবাহের পরক্ষণেই স্বামীর রাজধর্মের কর্তব্যে নিজেকে স্থাপন করার মধ্যেই সেকালের এক রমণীর চরম সার্থকতা ফুটে উঠছে। রাজা দুষ্যন্তের অর্থ নয়, শাড়ি-গয়না নয়, তিনি সামগ্রিক পৌরববংশের গৌরব কামনা করেন, ব্যক্তি দুষ্যন্তকে উপলক্ষ করে–ব্যাপকহিতবরণে ব্যাপ্যহিতবরণ আপনিই সিদ্ধ হয়ে যায়–শকুন্তলা পৌরবাণাং (ধর্মিষ্ঠতাং) বব্রে দুষ্যন্ত-হিতকাম্যয়া।
দুষ্যন্ত-শকুন্তলার ইন্দ্রিয় চরিতার্থতার বিষয় মহাভারতের কবির কাছে গৌণ হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। দুষ্যন্তের হিতকামনা, সমগ্র পৌরববংশের হিতকামনার সমস্ত তাৎপর্য আস্তে আস্তে পর্যবসিত হয়েছে শকুন্তলার মাতৃত্বে। পৌরববংশের বীজ শকুন্তলার গর্ভে আহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্থলিতা যুবতী থেকে জননীতে পরিণত হয়েছেন। এমন মহিলা আমরাও যে দেখিনি, এমন নয়। সেকালে এমন মহিলা অনেক দেখেছি, যাঁদের মধ্যে ইউরোপীয় রোম্যান্টিসিজমের কোনও বালাই ছিল না, প্রেম-ভালবাসা বলতে কাব্যিক অর্থে যা বোঝায়, তাও খুব ভাল করে বোঝা যেত না তাদের দাম্পত্য ব্যবহারে; কিন্তু যেটা খুব বেশি করে বোঝা যেত, সেটা হল মাতৃত্ব। একটি পুত্র-কন্যা জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে নিজের পুত্রকন্যার সাজাত্যে সমস্ত জগতের মানুষই তার কাছে পুত্র-কন্যায় পরিণত হত। এক বৎসর আগে যাঁর যুবতী-সুলভ, শরম-বিজড়িত, আটোসাটো ব্যবহারে কুণ্ঠিত বোধ করতে হত, একটি পুত্র-কন্যার জন্মের সঙ্গে সঙ্গে সেই মানুষই এমন আলুথালু, মুখরা এবং আঁচল-খোলা হয়ে যেতেন যে, তাকে জননী ছাড়া আর কিছু ভাবা যেত না।
