মহাভারতে শকুন্তলার সমস্যা এত সহজ নয়। পিতা কথ আশ্রমে নেই–সে এক সমস্যা। সহায়তার জন্য মহাভারতের কবি কোনও প্রিয়ংবদা-অনসূয়ারও ব্যবস্থা করেননি শকুন্তলার জন্য। ফলত বিবাহের মতো এক চরম সিদ্ধান্ত নেবার জন্য একাকিনী শকুন্তলাকে এখানে অনেক ভাবনা করে কথা বলতে হচ্ছে। একটি বিবাহের সুত্রে মহারাজ দুষ্যতের মতো একজন পাত্রের কাছে একজন কন্যা-পিতার কী কাম্য থাকতে পারে, সেকথা এখানে এই সুকুমারী তপস্বিকন্যাকে নিজেই ভাবতে হচ্ছে। নিজের দায়িত্ব যেখানে নিজেই নিতে হচ্ছে, সেখানে ভবিষ্যতের স্বার্থের কথাও চিন্তা করতে হচ্ছে স্বয়ং শকুন্তলাকে।
রাজা বলেছিলেন–তুমি নিজেই নিজের দায়িত্ব নিয়ে নিজেকে সঁপে দিতে পার আমার কাছে। রাজার এই কথা শুনে শকুন্তলা বললেন–ধর্মের নীতিনিয়ম যদি এইরকমই হয়, আর আমাকে যদি নিজেই বিয়ে করতে হয়– যদি ধর্মপথস্তু-এষ যদি চাত্মা প্রভুর্মম–তাহলে আমার একটা শর্ত আছে, মহারাজ! আমি কণ্বাশ্রমের এই নির্জন কুটির-প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে তোমার সামনে। যে কথা বলতে যাচ্ছি মহারাজ! তার কোনও সাক্ষী নেই। তোমাকে তাই প্রতিজ্ঞা করতে হবে, মহারাজ-সত্যং মে প্রতিজানীহি যথা বক্ষ্যাম্যহং রহঃ। তোমাকে কথা দিতে হবে–আমার গর্ভে তোমার যে পুত্র হবে, সেই হবে ভবিষ্যতের যুবরাজ, তোমার অবর্তমানে সেই হবে রাজা। যদি তুমি আমার এই কথাটি মেনে নাও, তবেই তোমার সঙ্গে আমার মিলন সম্ভব হবে জেনো-যদ্যেতদেবং দুষ্যন্ত অস্তু মে সঙ্গমস্বয়া।
রাজার পূর্বেকার কথাবার্তা, ভাবভঙ্গি এবং গান্ধর্ব বিবাহের উত্তেজনার মধ্যে আধুনিক অর্থে যাকে ‘প্রেম’ বলি তা কিছুই ছিল না। অন্যদিকে শকুন্তলাকেও যে রকম ভবিষ্যতের স্বার্থভাবনায় ভাবিত দেখছি এখানে, তাতে তার মনের মধ্যেও যে রাজার আগমনে ‘বাদলদিনের প্রথম কদম ফুল ফুটে উঠল, তা বলা যায় না। মহারাজ দুষ্যন্ত এখানে এক তপস্বিকন্যার রূপ-যৌবন-লাবণ্যের শারীরিক পরিভাষায় আন্দোলিত। অন্যদিকে শকুন্তলাও সেই যৌবনোচিত ভোগবাসনার কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন নিজের স্বার্থবুদ্ধি সম্পূর্ণ মাথায় রেখে। রাখাল ছেলের সঙ্গে রাজকুমারীর মিলন নাই হোক, চক্রবর্তী সম্রাটের সঙ্গে আরণ্যক তপস্বিনীর মিলন তো হল বটে, তবে কোনওভাবেই এই মিলনের মধ্যে আধুনিক সংজ্ঞায় প্রেম-ভালবাসার কোনও স্ফুরণ নেই। হয়তো দুষ্যন্ত-শকুন্তলার এই মিলন-কাহিনীর মধ্যে প্রেমের আধুনিক সংজ্ঞার অভাবটুকু পূরণ করার জন্য আমাদের আরও কয়েক শত বৎসর অপেক্ষা করতে হবে–যখন কালিদাস জন্মাবেন। তার লেখনীর অভিজ্ঞানে ফুল কীভাবে ফলে পরিণত হয়, মর্ত্য কীভাবে স্বর্গে পরিণত হয়–তা পরীক্ষা করার জন্যই যেন মহাভারতের কবি শকুন্তলা-দুষ্যন্তের মিলনের মধ্যে এক সুনির্দিষ্ট ফঁক রেখে দিলেন। আর সেই ফাঁকের মাঝখানটা ভরে রাখলেন মহারাজা দুষ্যন্তের অধৈর্য আর শকুন্তলার স্বার্থবুদ্ধি দিয়ে।
তপস্বিনী শকুন্তলার মুখে শারীরিক মিলনের শর্ত শোনা মাত্রই দুষ্যন্ত কোনও কথা না ভেবে–প্রত্যুবাচাবিচারয়ন্”জবাব দিলেন”আমি তোমাকে আমার রাজধানীতে নিয়ে যাব, সুন্দরী! সেটাই তোমার উপযুক্ত জায়গা। শকুন্তলাকে রাজধানীতে নিয়ে যাবার আশ্বাস দিয়েই দুষ্যন্ত গান্ধর্ব বিবাহের বিধি নিয়ম মেনে শকুন্তলার পাণিগ্রহণ করলেন। এই গান্ধর্ব-বিবাহের নিয়মে–তুমি আমার স্ত্রী হও–এই প্রতিজ্ঞার সঙ্গে পাণিগ্রহণমাত্রেই বিবাহ সম্পন্ন হয়। মহর্ষি কণ্ব তখনও ফিরে আসেননি। নির্জন বনস্থলীর মধ্যে দুষ্যন্তের সঙ্গে সহবাসে অনুমতা হলেন শকুন্তলা–জগ্রাহ বিধিবং পাণৌ উবাস চ তয়া সহ।
যুবতী-তপস্বিনীর মিলন-হৃষ্ট দুষ্যন্ত কণ্বমুনির আশ্রম ছেড়ে চলে যাবার সময় বারবার, শকুন্তলাকে আশ্বাস দিয়ে গেলেন–আমি রাজধানীতে ফিরে যাচ্ছি বটে। কিন্তু গিয়েই তোমাকে নিয়ে যাবার জন্য চতুরঙ্গিনী সেনা পাঠাব। রাজার রথ আসবে তোমাকে নিয়ে যাবার জন্য। অনেক সান্ত্বনা বাক্য অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজা শুধু মহর্ষি কন্ধের কথা চিন্তা করতে করতে আশ্রম ছেড়ে চলে গেলেন। সুখ-সহবাসের পর আশ্রম-যুবতী শকুন্তলার সুখস্মৃতি মহারাজ দুষ্যন্তকে ততখানি উদ্বেলিত করল না, যতখানি উদ্বেলিত করল মহর্ষি কম্বের ভয়। আশ্রমে ফিরে এসে শকুন্তলার সঙ্গে দুষ্যন্তের গান্ধর্ব-মিলনের কথা শুনে মহর্ষি কণ্ব কী। ভাববেন, কী করবেন–এই চিন্তায় আকুলিত হয়ে দুষ্যন্ত রাজধানীতে ফিরে গেলেন– ভগবাংশুপসা যুক্তো ত্বা কিং’নু করিষ্যতি।
দুষ্যন্তও আশ্রম থেকে বেরলেন, মহর্ষি কণ্বও অমনি ফিরে এলেন আশ্রমে। রাজার সঙ্গে গোপন মিলন-হেতু শকুন্তলার মনে যুবতী-সুলভ লজ্জার অন্ত ছিল না। মহর্ষিকে তিনি এড়িয়ে এড়িয়ে চলতে লাগলেন এবং এই ব্যবহার তার পক্ষে স্বাভাবিক ছিল না। শকুন্তলা চ পিতরং হিয়া নোপজগাম তম্। অন্য সময় ফলের বোঝা নিয়ে মহর্ষি বাড়ি ফিরলে শকুন্তলা যা যা করেন মহর্ষির ফল-ভার গ্রহণ করা থেকে আরম্ভ করে তালপত্রের ব্যজন–সে সব কিছুই করলেন না শকুন্তলা। নিজেকে তিনি লুকিয়ে রাখতে এতই ব্যস্ত হলেন যে, মহর্ষির মনে সন্দেহের উদয় হতে দেরি হল না। দিব্যজ্ঞানে ধ্যাননেত্রে মহর্ষি কণ্ব দুষ্যন্তকে দেখতে পেলেন কিনা জানি না–মহাভারত অবশ্য তাই বলেছে-কিন্তু লৌকিক বুদ্ধিতে আশ্রমের সর্বত্র খবর নিয়ে এবং সেই সঙ্গে শকুন্তলার লজ্জা-বিহ্বল ব্যবহার একত্র মিলিয়ে মহর্ষির বুঝতে দেরি হল না যে, দুষ্যন্ত এসেছিলেন এবং তিনি শকুন্তলার পাণিগ্রহণ করেছেন মহর্ষির অসাক্ষাতে।
