কোনও এক সংস্কৃত কবি বলেছিলেন-প্রেমিক পুরুষ নাকি নিজের মতো করে দুনিয়াকে দেখে এবং দুনিয়াকে সাজিয়েও নেয় নিজের মতো করে। বিশ্বামিত্র ক্ষত্রিয় রাজা ছিলেন, তপোবলে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেছেন। সে এক বিরাট ইতিহাস। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে এবং সঠিকভাবে ভাবলে বিশ্বামিত্রকে ব্রাহ্মণ এবং শকুন্তলাকে ব্রাহ্মণকন্যাই ভাবা উচিত। কিন্তু স্বয়ং রাজা দুষ্যন্ত নিজে এবং ব্রাহ্মণ্য-জাত্যাভিমানী মহাভারতের টীকাকারেরা বিশ্বামিত্রের সম্বন্ধে প্রথম সুযোগেই বলেছেন–রুপোর গয়নার ওপর পারদলেপনের দ্বারা সোনার ভাবটুকু আসতে পারে বটে, কিন্তু রুপো রুপোর কাজই করে। এই দৃষ্টিতে তপস্যা-টপস্যা করে। বিশ্বামিত্র যতই ব্রাহ্মণ হোন, বিশ্বামিত্র আসলে ক্ষত্রিয়। টীকাকারের সামান্য কথাটার মধ্যে একটু জাতের গোঁড়ামি আছে বটে, কিন্তু আমরা টীকাকারের থেকে মহারাজের মন বেশি বুঝি। ব্রাহ্মণ্যবাদী টীকাকার যা বলেছেন, তার মধ্যে একটা ‘ডেলিবারে’ ব্যাপার আছে, কিন্তু মহারাজ দুষ্যন্ত যে মুগ্ধ হয়েছেন; মুগ্ধতাবশতই তিনি শকুন্তলার জাতি মিলিয়ে নিয়েছেন নিজের সঙ্গে।
জাত মেলার সঙ্গে সঙ্গে দুষ্যন্ত শকুন্তলাকে একটু লোভ দেখাতে আরম্ভ করেছেন। আসলে। ভোগ-সুখ-বিরক্ত মুনির আশ্রমে থেকে থেকে শকুন্তলাও ভোগবিমুখ। তিনি সোনা-রুপোর গয়নাও পরেন না, অপাঙ্গ শাণিত করার জন্য চোখে কাজলও লাগান না, গাল সাদা-ফরসা করার জন্য লোরেণুও দরকার হয় না তার। রাজা ভাবলেন তপস্বিনীকে লোভ দেখালে তার বিবাহের প্রস্তাব ত্বরান্বিত হবে। রাজা বললেন–তোমাকে সোনার হার দেব, কানের দুল দেব, হিরে-মণি-মুক্তো এনে দেব নানা দেশ খুঁজে-সুবর্ণমাল্যং বাসাংসি কুণ্ডলে পরিহাটকে–কত শাড়ি দেব, বুকের কাঁচুলি গড়ে দেব হিরে-মানিক বসিয়ে; আর শাড়ি পছন্দ না হলে মৃগচর্মও নিয়ে আসতে পারি নানারকম। সব চেয়ে বড় কথা–আমার সমস্ত রাজ্যটাই তোমাকে দিয়ে দেব, তুমি শুধু আমার স্ত্রী হও–সর্বং রাজ্যং তবাদ্যাস্ত ভার্যা মে ভব শোভনে।
তপোবনবাসিনী শকুন্তলা সামান্য একটু ভয় পেলেন। শাড়ি-গয়নার লোভে তিনি বিচলিত নন একটুও। কিন্তু দেশের রাজা তাকে এমন করে বিয়ে করতে চাইছেন, তিনি না বলেন কী করে? শকুন্তলা বললেন–একটু সবুর করো রাজা আমার। তোমাকে বললামই তো-পিতা গেছেন ফল কুড়োতে। তিনি এখনই এসে পড়বেন, তারপর আমাকে তুলে দেবেন তোমার হাতে-মুহূর্তং সংপ্রতীক্ষস্ব স মাং তুভ্যং প্রদাস্যতি। রাজা বললেন–বোকা মেয়ে! ভয় পায়! ভালবাসার বিয়েতে আবার এত বাবা-বাবা করে নাকি? আমরা ক্ষত্রিয়, ভালবাসলেই আমরা বিয়ে করতে পারি আর আমাদের পক্ষে সেই বিয়েটাই সবচেয়ে ভাল-বিবাহানাং হি রম্ভোরু গান্ধবঃ শ্রেষ্ঠ উচ্যতে। আমি তোমাকে ভালবাসি, তুমিও আমাকে ভালবাস; আমরা পরস্পর পরস্পরকে চাই–স ত্বাং মম সামস্য বরবর্ণিনী–এমন অবস্থায় গান্ধর্ব-প্রথায় বিয়ে হলেই তোমাকে আমার এখনই বিয়ে করা সম্ভব।
দুষ্যন্ত মাঝখানে সামান্য একটু বক্তৃতাও দিয়েছিলেন। তপস্বিনীর মনে ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলার জন্য তিনি বিবাহের রকমফের নিয়ে বেশ একটু স্মৃতিশাস্ত্রীয় বক্তৃতাও দিয়েছিলেন। বলেছিলেন–আমি যে এতক্ষণ এখানে রয়ে গেছি, সে শুধু তোমার জন্যই; তোমার জন্য আমার মনটাই পড়ে আছে এখানে-দর্থং মাং স্থিতং বিদ্ধি তগতং হি মনো মম। তাছাড়া বিবাহের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে তোমার পিতা কী বলছেন, সেটা বড় কথা নয়, তুমি কী বলছ সেটাই বড় কথা। এখানে তুমিই তোমার সবচেয়ে বড় বন্ধু। তোমার যদি ইচ্ছে থাকে তবে তুমি নিজেই নিজেকে তুলে দিতে পার আমার হাতে–আত্মনৈবাত্মনো দানং কর্তুমহসি ধর্মতঃ। দুষ্যন্ত এরপর আট রকমের বিয়ে নিয়ে ব্রাহ্ম বিবাহ, দৈব, প্রাজাপত্য, রাক্ষস-ইত্যাদি নানা বিয়ের কথা বলে, ভালবেসে নিজে নিজে গান্ধর্ব বিবাহ করাই যে ক্ষত্রিয়ের পক্ষে সবচেয়ে সুবিধেজনক, সেটা সরলা তপস্বিনীর কাছে প্রমাণ করে ছাড়লেন।
শকুন্তলা দেখলেন, রাজা তাকে ছাড়বেন না। আর রাজার দিক থেকে তাড়া শুধু মহর্ষি কম্বের জন্য। তিনি ফিরে এলে কী বলবেন, কোনও বাধা দেবেন কিনা, এমনকি শেষ পর্যন্ত অভিশাপের ঘটনাও যে ঘটে যেতে পারে–এত সব ভেবেই তিনি সরলা বালিকাকে মানসিক চাপে একেবারে বিপর্যস্ত করে তুললেন। শকুন্তলা বুঝলেন, তাকে কিছু একটা করতে হবে। নইলে, রাজা তাকে ছাড়বেন না। এদিকে পিতা ক এসে তাকে কী বলবেন–সে চিন্তা তারও রয়েছে। সামনে প্রেমিক পুরুষের হাতছানি, আড়ালে পিতার শুভৈষণা–দুয়ের দ্বৈরথে যুবতী রমণী যা করে শকুন্তলাও তাই করলেন। তবে রাজা যখন শকুন্তলাকে–তুমি নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় বন্ধু বলে উত্তেজিত করেছিলেন, তখন এক লহমার মধ্যে শকুন্তলার মনে সেই ব্যক্তিত্ব এবং সেই ভবিষ্যদ-যুক্তি খেলে গিয়েছিল, যা এক অভিভাবক পিতার মধ্যে থাকে।
কালিদাসের অভিজ্ঞানে কবি-প্রতিভার চরম অভিব্যক্তির মধ্যে আমরা অনসূয়া প্রিয়ংবদাকে প্রিয়সখীর জন্য চিন্তামগ্ন দেখেছি। দুষ্যন্ত-শকুন্তলার বিয়ে তখন হয়ে গেছে। প্রিয়ংবদা বলেছিলেন–পিতা কথ এখন এই বিয়ে মেনে নেন কিনা, সেটাই এখন ভাবনার। বিষয়। অনসূয়া বলেছিলেন–মহর্ষির আপত্তি হবে না। কেন না, একটি গুণবান মানুষের হাতে কন্যাদান করতে হবে–এই বাসনা যে কোনও পিতারই থাকে। তো সেই গুণবান পাত্র মেলার ঘটনা যদি ভাগ্যই ঘটিয়ে দেয়, তবে বিনা পরিশ্রমে গুরুজনের ঈঙ্গিত কাজটাই তো হয়ে গেল–ত যদি দৈবমেব সম্পাদয়তি, ননু অপ্রয়াসেন কৃতার্থো গুরুজনঃ। অতএব পিতা ঠিক রাজি হবেন।
