দেখুন, আমাকে অনেকে প্রশ্ন করেছেন, আরে মশাই! কী যে আপনারা বলেন? তক্ষকের দংশনে নাকি পাণ্ডব-কুলের কনিষ্ঠ পুরুষ পরীক্ষিতের মৃত্যু হল। বলি, সাপের ব্যাপারে খবর রাখেন কিছু? এই যে তক্ষক সাপ বলছেন, সর্পতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতেরা তক্ষকের কোনও বিষই নেই বলে রায় দিয়েছেন। আর আপনারা মহাভারত খুলে, ভাগবত পুরাণ খুলে বারবার বলতে থাকবেন তারপর সেই ফলের ভিতরে থাকা তক্ষক সাপের বিষের জ্বালায় পরীক্ষিত মরলেন। এটা কী কোনও যুক্তি হল?
আমরা বলি, আপনারা হাজার হাজার বছর আগের লেখা পূরাণ কথা শুনছেন, মহাভারত শুনছেন। সেটাকে কি ওইভাবে বিচার করলে চলবে? পৌরাণিকদের কথাবার্তা, ভাব-মর্ম শুধু কি এক জায়গা থেকে বুঝলেই হবে? পূর্বাপর বিচার করতে হবে না? তার ওপরে কাহিনীর খোলস আছে, আছে পৌরাণিকদের নানা আবরণ। এই তো এই উতঙ্কের কাহিনীতে এখনই শুনবেন- তক্ষক গর্তে ঢুকে পড়ার পর উতঙ্ক লাঠি-খোস্তা দিয়ে গর্তটাকে বড় করার চেষ্টা করলেন। নিজে পারলেন না, তখন দেবরাজ ইন্দ্র তার বজ্র ফাটিয়ে সেই গর্তটাকে বড় করলেন। আর সেই বিস্তৃত গর্তপথে প্রবেশ করে উতঙ্ক যখন পাতালে এসে পৌঁছলেন, তখন তার চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল। তিনি দেখলেন- নাগলোকের কোনও সীমা-পরিসীমা নেই। সেখানে মন্দির আছে, রাজভবন আছে, বড় বড় বিল্ডিং আছে, চিলে কোঠা আছে, এবং নাগেদের বড় বড় বাড়িতে নানারকমের ‘হুক’ পর্যন্ত সাটা আছে, এমনকি খেলার মাঠও আছে–অনেকবিধ-প্রাসাদ- হর্ম্য-বলভী-নির্যূহ-শত-সঙ্কুলম-উচ্চাবচ-ক্রীড়াশ্চর্য- স্থানাবকীর্ণমপশ্যৎ।
তক্ষকের বিষে আপনার বিশ্বাস নাই থাকতে পারি, কিন্তু সর্পরাজ্যে যে রকম ঘর-বাড়ি আর প্রাসাদ-হ-বলভী দেখলাম তক্ষককে সাপের দৃষ্টিতে দেখলে এগুলিও তাহলে বিশ্বাস করা যায় না। তাই বলছিলাম, পুরাণকারদের কথা-বার্তা, ভাবনা-চিন্তা অত হঠাৎ সিদ্ধান্তের জিনিস নয়। তার পিছনে আমাদেরও একটু ভাবনা-চিন্তা করতে হবে। যে কথাটা প্রথমেই মনে রাখা দরকার, সেটা হল– দেবতা, অসুর, যক্ষ-রক্ষ, গন্ধর্ব-কিন্নর, হনুমান, জাম্ববান অথবা সৰ্পনাগ–এঁদের অন্তরীক্ষ লোকের কোনও বাসিন্দা ভাবার কোনও কারণ নেই। আমি অবশ্যই পরম ঈশ্বর, ব্ৰহ্ম বা অন্তর্যামী পরমাত্মা সম্বন্ধে কোনও কথা বলছি না। কিন্তু মহাভারত-পুরাণ এবং ভারতীয় দর্শন শাস্ত্র থেকেও দেবতা-রাক্ষস অথবা নাগ-সর্পদের সামাজিক অবস্থান নির্ণয় করা যাবে। এঁদের ঠিকানার জন্য অলৌকিক কোনও স্বর্গ অথবা পৃথিবীর গভীরে কোনও পাতাল-প্রবেশের দরকার নেই– এঁরা সবাই এই সুন্দরী পৃথিবীর চিরকালের বাসিন্দা। স্বর্গ, নরক, গন্ধর্বলোক, নাগলোক- এগুলির ভৌগোলিক অবস্থান, পরে সময়মতো নির্ণয় করে দেখাব। কিন্তু এখন জেনে নিন তক্ষক এবং অন্যান্য নাগের কথা।
আর্যায়ণের প্রথম কল্পে যাদের আমরা দেবতাদের বিরোধী গোষ্ঠী হিসেবে পেয়েছি। ঋগবেদে তাদের নাম দাস বা দস্য। মহাকাব্যের পূর্ব যুগ থেকেই এই বিরোধী গোষ্ঠীকে আমরা অসুর-রাক্ষস নাম দিয়েছি এবং দেবতাদের সঙ্গে তাদের চিরন্তনী শত্রুতা সর্বজনবিদিত। মহাকাব্যের যুগে প্রধানত মহাভারতের যুগেই অসুর-রাক্ষসদের আর তত দেখতে পাবেন না, আস্তে আস্তে চতুবর্ণ-বিভাগে তারা স্থান করে নিতে পেরেছেন। আর্যরা যখন সুপরিকল্পিতভাবে ভারতের উত্তরখণ্ডে ছড়িয়ে পড়তে থাকলেন, তখন এই নাগদের সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। নাগেরা অবশ্যই আরণ্যক গোষ্ঠী, বনে-জঙ্গলেই তাদের বাস ছিল, গঙ্গা, যমুনা, নর্মদার মতো নদীর ধারেও তাদের বসতি দেখা যাচ্ছে।
প্রথম দিকে নাগ জন-জাতিরা তাদের এই নতুন শত্রুদের তত আমল দেননি, কিন্তু আর্যরা যখন শহর গড়ার দিকে মন দিলেন, তখন এদের বসতির ওপর আর্যদের হাত পড়ল, আর সেই থেকেই শত্রুতার শুরু। মহাভারত আলোচনার পরবর্তী সময়ে দেখবেন– অর্জুন যখন পাণ্ডবদের রাজধানী বানানোর জন্য খাণ্ডব-বন পুড়িয়ে দিলেন, তখন সেখান থেকে তক্ষক-নাগকে প্রাণ নিয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল। এই তক্ষক আর কেউ নয়, কোনও সাপ তো নয়ই, প্রাচীন নাগগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান। পণ্ডিতদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলি- ওই যে হস্তিনাপুর, ইন্দ্রপ্রস্থ, মথুরা, তক্ষশিলার নাম শোনেন-কুরু-পাণ্ডবদের রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের রমরমা হওয়ার আগে এইসব জায়গায় নাগ-জনজাতিরই রাজত্ব ছিল। যমুনার মধ্যে বিষধর কালীয়-নাগের মাথায় কৃষ্ণের নন-কুর্দন নাগ-জনজাতির পরাজয় যতটুকু সূচনা করে, তার চেয়ে অনেক বেশি সূচনা করে তার পূর্বাধিপত্য।
ভাগবত পুরাণ অথবা ২য়/৩য় শতাব্দীর বিখ্যাত ভাসের নাটক- যাই খুলুন, দেখবেন যমুনার জল কেউ স্পর্শ করে না, তাতে নাকি কালীয়-নাগের বিষ মেশানো আছে। আসলে এখানে যমুনা বলতে আমরা যমুনা নদী বুঝি না, যমুনার উপকূলবর্তী অঞ্চল বুঝি। ঠিক যেমন ‘আমি দক্ষিণেশ্বরে থাকি’ বললে দক্ষিণেশ্বরের কালীমন্দির বোঝায় না, তার কাছাকাছি অঞ্চল বোঝায়, তেমনই এইসব জায়গাতেও মুখ্যার্থের বাধা হয়। আসলে কালীয় কিংবা বাসুকি কেউই যমুনার জলে বা সাগরের জলে থাকেন না; তাদের জায়গা পণ্ডিতদের মতে জলা জায়গা, বন-জঙ্গল অরণ্যভূমি। কৃষ্ণ কালীয়কে তাড়িয়ে দিয়ে যমুনার জলকে বিষমুক্ত করেছিলেন বলে যে মাহাত্ম আছে, তা আসলে নাগ জন-জাতির আরেক প্রধানকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা।
