উতলা হাওয়া, বনস্থলীর পুষ্প-পরিমল এবং হঠাৎ ঝড়ে উড়ে যাওয়া বসনের বিপন্নতার মধ্যে তপস্যা-ক্লান্ত বিশ্বামিত্র মেনকাকে দেখতে পেলেন সম্পূর্ণ অনাবৃতা অনির্দেশ্যবহোরূপাম্ অপশ্য বিবৃতাং তদা। মেনকার অলোকসামান্য রূপ দেখে শুষ্ক-রুক্ষ্ম মুনির কঠিন হৃদয় একেবারেই গলে গেল। মহাকাব্যের কবি লিখেছেন-মেনকার রূপ-গুণ দেখে–তস্যা রূপগুণান্ দৃষ্টা, এখানে গুণ কিছু দেখেননি ঋষি। আসলে এই সমাসের ব্যাসবাক্য রূপ এবং ‘গুণ’ নয়, হবে ‘রূপের গুণ’! সেই অমর্ত্য রূপের মোহে মুগ্ধ হয়ে বিশ্বামিত্র মিলনের আহ্বান জানালেন মেনকাকে, যে মিলন দেবরাজ ইন্দ্রের চক্রান্তে একান্ত কাক্ষিত ছিল মেনকারওন্যমন্ত্ৰয়ত চাপেনাং সা চাপ্যৈচ্ছদনিন্দিতা।
শকুন্তলা এতক্ষণে যে রাজাকে নিজের জীবন-কাহিনী শোনাচ্ছিলেন তা নিজের জবানীতে নয়। রাজাকে তিনি বলেছিলেন–এক ব্রাহ্মণ ঋষি পিতা কথকে আমার কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন ঠিক আপনার মতো করেই। আমি নিভৃতে সে কথা পিতা করে মুখে যেমন শুনেছি, তাই আপনাকে জানাচ্ছি। শুধু পিতা কণ্বের জবানী হলেও বিশ্বামিত্র-মেনকার মিলন কাহিনী শোনাতে শকুন্তলার একটুও লজ্জা হল না। কালিদাসে দুষ্যন্ত একই প্রশ্ন করেছিলেন শকুন্তলার সখীর কাছে। সেখানে শকুন্তলার জীবনকাহিনী বলতে গিয়ে-বসন্তকালে উদার প্রকৃতির মধ্যে মেনকার পাগল-করা রূপ দেখে বিশ্বামিত্র-এইটুকু মাত্র বলে, অর্ধবাক্য শেষ না করেই প্রিয়ংবদাকে লজ্জায় থামতে হয়েছে। নাগরিক রাজাও আর শুনতে চাননি। কিন্তু মহাকাব্যের নায়িকা কণ্বের জবানীতে নিজের কাহিনী শোনাচ্ছেন অনুপুঙ্খভাবে, রাজাও শুনছেন উৎকর্ণ হয়ে। আসলে মহাকাব্যের উদার-অপার পরিবেশের মধ্যে কোনও কাহিনীই অসম্পূর্ণ থাকে না, কথা-সুন্দরী সলজ্জে স্তম্ভিত হন না অর্ধপথে।
শকুন্তলা বললেন– রমমান বিশ্বামিত্রের ঔরসে মেনকার গর্ভে একটি মেয়ের সম্ভাবনা হল। তারপর একদিন এই হিমালয়ের কোলে মালিনী-নদীর তীরভূমিতে অঙ্গরা সুন্দরী মেনকা আপন স্বভাবে গর্ভমুক্ত হয়ে চলে গেলেন স্বর্গরাজ্যে ইন্দ্রের কাছে নিজের সাফল্য জ্ঞাপন করার জন্য। মালিনীর তীরে উন্মুক্ত আকাশের নীচে পড়ে রইল একটি শিশুকন্যা। বনের মধ্যে বাঘ-সিংহ ঘুরে বেড়াচ্ছে, হিংস্র শ্বাপদের আনাগোনা পদে পদে। ছোট্ট শিশুটিকে দেখে বনের যত পাখি ছিল, তারা অজাতপক্ষ পক্ষিশাবকের মতো ঘিরে রইল শিশুটিকে–দৃষ্টা শয়ানং শকুনাঃ সমন্তাৎ পর্যবারয়ন। ইতিমধ্যে মহর্ষি কণ্ব মালিনী নদীতে এলেন স্নান-আহ্নিক করতে। দেখলেন–পাখিরা একটি শিশুকে ঘিরে কিচির-মিচির করছে। অসহায় শিশুকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই যেন তাদের এই কিচির-মিচির আর্তনাদ। মহর্ষি কণ্ব পরিত্যক্তা শিশুকন্যাকে সযত্নে কোলে তুলে নিয়ে এলেন আশ্রমে। আশ্রমবাসী সকলকে জানালেন–এই আমার মেয়ে। নির্জন বনের মধ্যে শকুনেরা (পাখি শকুন্ত। শকুন মানে ‘শকুন’ নয়) পাখিরা যেহেতু একে রক্ষা করেছিল, আজ থেকে এই মেয়ের নাম তাই শকুন্তলা–যস্মাচ্ছকুন্তৈঃ পরিবারিতা/শকুন্তলেতি নামাস্যাঃ কৃতঞ্চাপি ততো ময়া।
কণ্বের জবানীতে নিজের জন্ম-বিবরণ সম্পূর্ণ ব্যক্ত করে মহর্ষি কণ্ব ব্রহ্মচারী হওয়া সত্ত্বেও কেন তার পিতা হলেন, সে সম্বন্ধে শকুন্তলা রাজাকে শাস্ত্র কথা শুনিয়েছেন কন্তের জবানীতেই। কণ্ব আশ্রমের সকলকে বলেছিলেন– জন্মদাতা পুরুষ যেমন পিতা, তেমনই যিনি প্রাণ রক্ষা করেন, যিনি ক্ষুধার অন্ন দেন, তারাও একভাবে পিতার সংজ্ঞা লাভ করেন–শরীরকৃৎ প্রাণদাতা যস্য চান্নানি ভুঞ্জতে। শকুন্তলা এই কথার অন্য কোনও অর্থ করেননি। রাজাকে তিনি জানিয়ে দিলেন–জন্মদাতা পিতাকে আমি চোখে দেখিনি কখনও। তাই অন্তত দুটি কারণে, প্রাণ-রক্ষা এবং পালন-পোষণের গৌরবে আমি মহর্ষি কথকেই আমার পিতা বলে মনে করি–কং হি পিতরং মন্যে পিতরং স্বমজানতী।
হয়তো ‘আয়োগব’ মরুত্ত রাজার ঘরে প্রতিপালিত মানুষটি এতদিনে নিজেরই মতো এক রমণী খুঁজে পেলেন, যিনি তারই মতো পিতৃ-মাতৃ মুখ দেখেননি কখনও। অন্নে, প্রাণের সুরক্ষায় যে রমণী তারই মতো কাশ্রমে প্রতিপালিতা, হয়তো সেই রমণীর মধ্যে নিজের পূর্বজীবনের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলেন দুষ্যন্ত। দুষ্যন্ত দাঁড়িয়ে উঠলেন কথা-কাহিনীর জগৎ থেকে। মহর্ষি কণ্ব ফল কুড়োতে গেছেন। তিনি ফেরার আগেই বিখ্যাত পৌরববংশের ধুরন্দর রাজা হৃদয় উন্মোচন করতে চান মহাতেজস্বী বিশ্বামিত্রের কন্যা শকুন্তলার কাছে। এই হৃদয় উন্মোচনে অন্তর্ধারায় আছে একাত্মতা-আমরা দুজনেই সমদুঃখদুঃখী, পরান্ন-প্রতিপালিত, বহির্ধারায় আছে তথাকথিত বংশগৌরব-আমি পৌরববংশ-ধুরন্ধর, তুমি বিশ্বামিত্রের ঔরসে স্বর্গসুন্দরী মেনকার কন্যা। এই হৃদয়-উন্মোচনের ফল প্রসুপ্ত আছে দূর-ভবিষ্যতের গর্ভে। সেই কারণেই বুঝি দিন বেছে বেছে আজকেই কন্বমুনি ফল কুড়োতে আশ্রমের বাইরে গেছেন দুরে!
.
৪৪.
এখনকার দিনেও আমি অনেক যুবক-যুবতাঁকে দেখেছি, যারা জাত মিলিয়ে প্রেম করেন। এই যুবক-যুবতীরা অবশ্যই বড় জাতের শিল্পী। নইলে ঝোড়ো হাওয়া আর পোডড়া বাড়ির ভাঙা দরজাটা মিলিয়ে দেবার ভার যার ওপরে ছিল, তিনিও বুঝি চিন্তিত হতেন এই প্রেম এবং জাত একসঙ্গে মেলাতে। লক্ষণীয়, এই ট্র্যাডিশন আজকের নয়। শকুন্তলার মুখে আপন জন্মবৃত্তান্ত শোনার সঙ্গে সঙ্গে মহারাজ দুষ্যন্তের উচ্ছ্বাস শোনা যাচ্ছে। তিনি বলছেন–সুন্দরী! পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, তুমি ক্ষত্রিয়ের মেয়ে–সুব্যক্তং রাজপুত্রী ত্ব–অর্থাৎ দ্বিগুণ উচ্ছ্বাস। রূপ দেখে ভীষণ পছন্দ হয়েছে, আবার জাতেও মিলেছে। অতএব তুমি যখন ক্ষত্রিয়ের মেয়ে, রাজপুত্রী, তাহলে অবশ্যই আমার মতো ক্ষত্রিয় রাজার স্ত্রী হবার উপযুক্ত তুমি। তুমি আমার স্ত্রী হও, তোমার জন্য আমি সব করতে পারি–ভার্যা মে ভব সুশ্রোণি ঐহি কিং করণি তে।
