আবীক্ষিত মরুত্ত যে অনেক বড় বড় যজ্ঞ করেছিলেন, সে কথা আমরা পূর্বে সাড়ম্বরে বলেছি। কিন্তু তিনি যে আয়োগব’ রাজা সে কথা বলিনি। মরুত্তর বিশেষণ হিসেবে আবীক্ষিত’ শব্দটি থাকার ফলে ইনি যে আমাদের পূর্বকথিত মরুত্ত রাজা যিনি দুষ্যন্তকে মানুষ করেছিলেন, এই আইডেনটিটি’ নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু তার আরেকটা বিশেষণ ‘আয়োগবো রাজা’, ‘আয়োগব’ শব্দের অর্থ কাত্যায়নের শ্রোতসূত্রের টীকায় যেমনটি দেখা যায়, তা হল–শূদ্রের ঔরসে বৈশ্যা রমণীর গর্ভজাত সন্তান। মরুন্তু যদি ঠিক এই রকমই এক আয়োগর রাজা হয়ে থাকেন, তবে সেই রাজার সুরক্ষায় এবং অন্নপ্রাণে মানুষ হয়ে দুষ্যন্তের মুখে কুল-শীলের প্রশ্ন মানায় না। পণ্ডিতেরা অবশ্য আশ্বাস দিয়ে বলেন যে, ধর্মসূত্রগুলির প্রণয়ন-কাল পর্যন্ত যেহেতু আয়োগব’ শব্দের কোনও নির্দিষ্ট সংজ্ঞার্থ চোখে পড়ে না, তাই মরুত্ত রাজাকে কোনও শূদ্র রাজা না ভেবে বরং কোনও অব্রাহ্মণ রাজাকে ব্রাহ্মণ্য রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় অলীকরণের উদাহরণ হিসেবে মেনে নেওয়াই ভাল। কিন্তু এই আশ্বাসবাণীর পরেও মরুত্ত। রাজার ঘরে পালিত দুষ্যন্তের কাছ থেকে শকুন্তলার সম্বন্ধে প্রশ্নগুলি মানায় না।
আশ্রমবাসিনী শকুন্তলার মনের মধ্যে অবশ্য এত জটিলতা নেই। তিনি নিশ্চিন্তে আগন্তুক রাজাকে নিজের জীবনের গল্প শোনাতে লাগলেন। শকুন্তলা বললেন–মহারাজ! আমি কেমন করে এখানে এলাম, কেমন করেই বা একদিন মহর্ষি করে মেয়ে হয়ে গেলাম, সে এক ইতিহাস, রাজা! শুনুন তাহলে। আপনি মহর্ষি বিশ্বামিত্রের নাম শুনে থাকবেন। এক সময় তিনি এমন সাংঘাতিক তপস্যা করেছিলেন যে, দেবরাজ ইন্দ্রও সেই তপস্যা দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। ভাবলেন–হয়তো তপস্যা করে শেষ পর্যন্ত স্বর্গের ইন্দ্ৰত্বই অধিকার করে নেবেন ঋষি বিশ্বমিত্র–তপসা দীপ্তবীর্যোয়ং স্থানান্মাং চ্যাবয়েদিতি।
ভীত পুরন্দর শেষ উপায় হিসেবে ডেকে পাঠালেন স্বর্গের অন্যতম প্রধানা অলরা মেনকাকে। ইন্দ্র তাকে বললেন–অপ্সরা-সমাজে তোমার মতো গুণী আর দ্বিতীয় কে আছে? তা তুমি বাপু আমার একটা উপকার করো। তুমি কি জান–বিশ্বামিত্র এমন তপস্যা করছেন যে আমার মনটা ভয়ে কাঁপছে সব সময়—মম কম্পয়তে মনঃ। তা এই বিশ্বামিত্রের ভার আমি তোমার হাতেই সঁপে দিলাম মেনকা– মেনকে তব ভারো’য়ং বিশ্বামিত্রঃ সুমধ্যমে। এই ভার। দেওয়ার অর্থ কী, মেনকা তা জানেন। ইন্দ্র অবশ্য সবিশদে বুঝিয়েও দিলেন–কী করতে হবে মেনকাকে। বললেন–আমার ইন্দ্ৰত্ব চলে যাবে, মেনকা! বিশ্বামিত্রের ঘোর তপস্যায় সব যাবে। আমার। তুমি এখনই যাও সেই উগ্রতপা তপস্বীর কাছে, তাকে প্রলোভিত করো-তং বৈ গত্ব প্রলোভয়। যেভাবে পারো, রূপ-যৌবনের মাধুর্য প্রকাশ করেই হোক, হাত-পায়ের ভঙ্গিমাতেই হোক অথবা মধুর হাসে, মধুর ভাষেরূপযৌবন-মাধুর্য- চেষ্টিত-স্মিত-ভাষণৈঃ–যেভাবেই হোক এই তপস্বীকে প্রলুব্ধ করে তাকে তপস্যা থেকে নিবৃত্ত করতে হবে।
ইন্দ্রের কথা শুনে মেনকা জবাব দিলেন–ওরে বাবা বিশ্বামিত্র। তিনি যে কেমন রাগী মুনি, সে তো আপনি নিজেও জানেন দেবরাজ-কেপনশ্চ তথা হ্যেনং জানাতি ভগবানপি। মেনকা এক এক করে বিশ্বামিত্রের জীবনের দশ-বারোটি ঘটনা উল্লেখ করলেন ইন্দ্রের কাছে, যাতে বোঝা যায় বিশ্বামিত্র কত অসাধ্য সাধন করেছেন। বশিষ্ঠ মুনির সঙ্গে বিবাদের সময়, ত্রিশঙ্কুর স্থিতিনির্ণয় করার সময়, ক্ষত্রিয়-জন্ম থেকে ব্রাহ্মণ্য লাভের ঘটনায়, এবং আরও বেশ কয়েকটা উদাহরণ দিলেন মেনকা যে সব সময় বিশ্বামিত্র মুনির অসম্ভব সম্ভব করার ক্ষমতা দেখে স্তম্ভিত হয়েছেন সকলে। মেনকা বলেছিলেন–আপনি স্বয়ং যাকে দেখে ভয় পান, দেবরাজ আমি তাকে ভয় পাব না–মপুদ্বিজসে যস্য নোদ্বিজেয়মহং কথম্? যিনি রাগলে সবাইকে ভস্ম করে দিতে পারেন, তপস্যার তেজে যিনি সবাইকে কম্পিত করে তোলেন-সেই আগুনের মুখে, সেই কালজিহ্বার করাল গ্রাসের মধ্যে আমার মতো এক রমণী কী করে প্রবেশ করবে–হুঁতাশনমুখং দীপ্তং কথমস্মবিধা স্পৃশেৎ?
মুশকিল হল, দেবরাজ ইন্দ্র মেনকার স্মরণাপন্ন হয়েছেন, স্বর্গরাজ্যের নিয়ন্তা এক রমণীর উপকারপ্রার্থী। মেনকা তাই যত ভয়ই পান, অথবা যত অনিচ্ছাই তার থাকুক, তার পক্ষে দেবরাজকে ‘না’ বলার উপায় নেই। মেনকা তাই বললেন–আপনি বলছেন যখন, তখন আর না বলি কী করে? কিন্তু আপনি আমার বেঁচে ফেরার রাস্তাগুলো ঠিকঠাক খোলা রাখুন। আমি যখন বিশ্বামিত্রের সাৰ্ণ্যমনে আমার রূপ-যৌবন এবং মাধুর্যের বিলোভন সৃষ্টি করব, তখন বায়ুদেবতা যেন উতল হাওয়ায় আমার লজ্জাবস্তু উড়িয়ে নেন–কামং তু মে মারুতস্তত্র বাসঃ/প্রীড়িতায়া বিবৃণোতু দেব। ভালবাসার দেবতা অঙ্গহীন অনঙ্গ যেন আমার কাজে সহায় হন, যেন সহায় হন ঋতুরাজ বসন্ত। ঋষিকে প্রলুব্ধ করার সময় বনফুলের সুগন্ধ যেন আমোদিত করে দেয় সমস্ত বনস্থলী-বনাচ্চ বায়ুঃ সুরভিঃ প্রবায়াৎ।
বলা বাহুল্য, দেবরাজ রাজি হলেন মেনকার প্রস্তাবে। সদাগতি সমীরণ সাথী হলেন মেনকার। সর্বচিত্তহর মনমথন কামদেব এলেন বিশ্বামিত্রর মনে বাসনা তৈরি করার জন্য। (কালিদাসের কুমারসম্ভবে অকালবসন্তের উৎস কি এইখানে?) ইন্দ্রের যোজনায় সমস্ত ব্যবস্থা পাকা হয়ে গেল। স্বর্গসুন্দরী মেনকা সভায় এসে উপস্থিত হলেন তপস্যাপ্ত বিশ্বামিত্রের সামনে। তার গায়ে জ্যোৎস্নার মতো সূক্ষ্ম বসন, চলনে নটন, বলনে গান। মেনকা ঋষিকে অভিবাদন করেই নানা নৃত্যভঙ্গিমায় আকর্ষণ করতে লাগলেন মুনিকে। এমন সময় উতাল হাওয়া বনস্থলীর সমস্ত সুগন্ধ চুরি করে এমনভাবে বইতে লাগল যে, তাতে মেনকার চাঁদচুয়ান পরিধেয় বসন একেবারেই উড়ে গেল–অপোবাহ চ বাসোস্যাঃ মারুতঃ শশিসন্নিভ। হাওয়ার তাড়নাতেই যেন মেনকার ফুলের ঘায়ে মুচ্ছো যাওয়া শরীরখানি লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। এতে যে তার একটুও দায় নেই, এ দোষ যেন তার নিজের নয়, এই ভাবেই মেনা যেন তার উড়ে-যাওয়া পরিধেয় বসনখানি ধরতে চাইলেন বারবার। বসন সংগ্রহ করার এই ভয়ংকর অভিনয়-চেষ্টার মধ্যেও কল্পলোকের নায়িকার মতো মেনকার মুখের হাসিটুকু কিন্তু তার ঠোঁটে লেগে রইল, অম্লান–স্ময়মানে সব্রীড়।
