মহাভারতের দুষ্যন্ত আশ্রমের কুটীর প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে কথ মুনিকে দেখতে পেলেন না। তখন রাজার মতই হেঁকে-ডেকে–ওরে কে কোথায় আছিস, সাড়া দে, আমাকে তোরা দেখ–এইভাবে সমস্ত পোবনভূমি একেবারে কাঁপিয়ে তুললেন–উবাদ ক ইহেতুচ্চৈঃ বনং সংন্নদয়বি। হাঁক-ডাক শুনে একটি কন্যা বেরিয়ে এলেন আশ্রম থেকে, ভারি সুন্দরী আর লক্ষ্মীমতী। গায়ে তপস্বিনীর বেশ। কোনও সংকোচ নেই, লজ্জা নেই, ডাগর আঁখি মেলে কন্যা রাজাকে স্বাগত জানিয়ে বললেন–আপনার রাজ্যের কুশল তো রাজা? কোনও প্রতিকূলতা নেই তো? কন্যা রাজাকে পা ধোয়ার জল দিলেন, আসন দিলেন বসতে। হেসে বললেন–বিশেষ কোনও কাজ আছে নাকি আপনার?
রাজা অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন ধীরমধুরভাষিণী রমণীর দিকে। বললেন–আমি মহর্ষি কণ্বকে প্রণাম জানানোর জন্য এখানে এসেছিলাম। কোথায় গেছেন তিনি? সুন্দরী রমণী হেসে বললেন–এই তো কাছেই গেছেন পিতা কণ্ব। বন থেকে কিছু ফল কুড়িয়েই ফিরে আসবেন। আপনি একটু বসুন, এই তিনি এলেন বলে–মুহুর্তং সম্প্রতীক্ষস্ব দ্রষ্টাস্যেনমুপাগত।
কালিদাসের অভিজ্ঞানে রাজার হাতে অনেক সময় ছিল। নায়ক-নায়িকাকে প্রেমের অনুকূল সরস পরিস্থিতি দেওয়ার জন্য পিতা কণ্বের বহু দূরে থাকাই শুধু নয়, লজ্জাশীলা শকুন্তলাকে দিয়ে রীতিমতো প্রেম করিয়ে দেওয়ার জন্য অনসূয়া-প্রিয়ংবদার মতো দুই সখী ছিলেন কালিদাসের হাতে। রাজার খবর, শকুন্তলার খবর সবই নায়ক-নায়িকার কাছে সঞ্চারিত হয়েছে দুই সখীর মাধ্যমে। কিন্তু মহাভারতে অনসূয়া-প্রিয়ংবদার মতো সুযোগা সখীও নেই। এখানে সুন্দরী মধুরহাসিনী শকুন্তলা রাজার সামনে দাঁড়িয়ে, একা। এখানে রাজার হাতেও কোনও সময় নেই, কখন না জানি কণ্বমুনি ফল কুড়িয়ে এসে পড়েন। অতএব কণ্বমুনির গতিস্থিতি জানামাত্রই রাজার অবধারিত প্রতিক্রিয়া-প্রেম নিবেদন করা–যত কম সময়ে পারা যায়, প্রেম নিবেদন করা।
আশ্রমবাসিনী শকুন্তলার পরনে ছিল চীরবাস, যা তার অপার যৌবনরাশির তুলনায় ছিল নিতান্তই অপ্রতুল। তার মধ্যে আশ্রমসুলভ শম-দমের সাধনে শকুন্তলার শরীরে ছিল সেই অদ্ভুত দীপ্তি যা নাগরিকার মধ্যে মেলে না–বিভ্ৰাজমানাং বপুষা তপসা চ দমেন চ। নাগরিক। রাজা মুগ্ধ হলেন আশ্রমবাসিনীকে দেখে। অথচ হাতে সময় নেই, মহর্ষি কণ্ব এসে পড়বেন কখন? রাজা সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করলেন–তুমি কে রমণী? কার মেয়ে? এই বনে এসেছ কী করতে, এমন সুন্দর যার চেহারা, সে কোথা থেকে এসে এই বনের মধ্যে জুটল এবংরূপগুলোপেতা কুতত্ত্বমসি শোভনে? তোমাকে দেখামাত্রই আমি মুগ্ধ হয়েছি কন্যে। তুমি তোমার সমস্ত কথা আমায় খুলে বল।
মহাভারতে যেখানে সংক্ষিপ্ত ভাষণ, কালিদাসের সুযোগ সেখানে। এমন রূপ নিয়ে তুমি বনের মধ্যে এলে কেমন করে–শুধু এই সামান্য পংক্তিটির ইঙ্গিত কালিদাসে অসাধারণ কয়েকটি শ্লোকে এসেছে। আশ্রমের মধ্যে গাছে জল দেওয়ার কাজটুকু করার যে পরিশ্রম, সেই পরিশ্রমও যেন শকুন্তলার মতো কোমলাঙ্গী সুন্দরীর যোগ্য নয় এবং মহর্ষি কথ যে তাকে এই কঠিন কাজে নিয়োগ করে পদ্মফুলের পাতা দিয়ে মোটা মোটা গাছ কাটার চেষ্টা করছেন এই সব অসাধারণ আক্ষেপও রাজা দুষ্যন্তের মুগ্ধতা জ্ঞাপন করেছে কালিদাসে। শকুন্তলার কুল-শীল জন্ম নিয়েও রাজার মনে যা কিছু সংশয় ছিল, সেগুলো অবশ্য সবই রাজার কানে এসেছে অনসূয়া-প্রিয়ংবদার সঙ্গে রাজার কথোপকথনের সূত্রে। কিন্তু কুল-শীলের জিজ্ঞাসা কালিদাসেও আছে।
মহাভারতের শকুন্তলা নিজেই নিজের সহায়। মহারাজ দুষ্যন্তের মুখে নিজের শারীরিক স্তুতি-প্রশংসা শুনেও তার লজ্জা পাবার অবকাশ নেই কোনও। তাকে নিজেই বলতে হচ্ছে নিজের জীবনের কাহিনী। তপস্বী কণ্বের আশ্রমে শকুন্তলা ঋষি-বালক আর ঋষিদের ছাড়া এমন আর কাউকে এ পর্যন্ত দেখেননি, যিনি এমন হঠাৎ করে প্রণয় প্রকাশ করতে পারেন। তাপসীবেশধারিণী এক তথাকথিত ঋষিকন্যাও যে দেশের রাজার মনোহরণ করতে পারেন–এ ধারণা শকুন্তলার ছিল না। কিন্তু রাজার মুখে অমন দুর্বাধ প্রণয়োজ্জাস শুনেও সমস্ত সুস্থিরতা নিয়ে শকুন্তলা যে প্রত্যুত্তর দিতে পেরেছেন, তাতে মহাভারতের শকুন্তলার ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠেছে মহাকাব্যের অন্যতমা নায়িকার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাল রেখে। নিজের কথা তিনি নিজেই বলতে পারেন নির্দ্বিধায়।
মহারাজ দুষ্যন্তের প্রণয় আকুতি এবং প্রশ্ন শুনে কাশ্রমের অধিবাসিনী একটু মধুর স্বরে হাসলেন, তারপর প্রথম পরিচয় জ্ঞাপন করলেন নিজের–মহারাজ! আমি ধর্ম তপস্বী করে মেয়ে। রাজা পালটা প্রশ্ন করলেন—মুহাত্মা কণ্বকে আমরা উর্দ্ধরেতা ব্রহ্মচারী তপস্বী বলেই তো জানি। সেই জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তির এমন চরিত্রস্খলন হতে পারে–এ তো ভাবাই যায় না। তুমি কেমন করে সেই ব্রহ্মচারী মহর্ষির মেয়ে হলে তা শুনতে আমার কৌতূহল হচ্ছে রীতিমতো–কথং ত্বং তস্য দুহিতা সস্তৃতা বরবৰ্ণিনী?
শকুন্তলার স্পষ্ট উত্তরের আগে দুষ্যন্তের প্রশ্ন শুনে আমাদের যে কিছু আশ্চর্য হবার আছে, সেটা জানাই। যে দুষ্যন্ত উচ্ছিন্ন পৌরববংশের এক অনামা অখ্যাত মানুষের ঔরসে জন্মেছিলেন এবং যিনি মানুষ হয়েছিলেন তুর্বসু-বংশীয় মরুত্ত রাজার ঘরে, তিনি এক রমণীর কুলশীল জিজ্ঞাসা করছেন–এটা ভাবতে বিপরীত লাগে। এমন প্রশ্ন শুনলে, যে কথা এতক্ষণ বলিনি, তাও বলতে হয়। আগে বলেছি–দুষ্যন্ত আবীক্ষিত মরুত্তের ঘরে মানুষ হয়েছেন। পুরাণে-ইতিহাসে তুর্ক বংশের পরম্পরায় তার নাম পাই বলে আমরা সসম্মানে সে কথা মেনেও নিয়েছি। কিন্তু দুষ্যন্তের এই প্রশ্নের নিরিখে আবারও আমাদের নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। শতপথ ব্রাহ্মণের মতো প্রাচীন এবং বিখ্যাত ব্রাহ্মণ গ্রন্থে আমরা দেখছি–মরুপ্ত। আবীক্ষিত নামে এক আয়োগব’ রাজা অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন–মহাব্রতুমতিরাত্রনে হ মরুত্ত আবীক্ষিত ইজে আয়োগবো রাজা।
