.
৪৩.
মালিনীর জল বড় স্থির। আয়নার মত,–এমন করে যিনি ছবি লিখেছিলেন, তার কল্পচিত্র এই মহাভারত থেকেই উঠে এসেছে। কণ্বমুনির আশ্রমকে বেড় দিয়ে এমনভাবেই মালিনী নদী চলে গেছে যে, কণের আশ্রমটিকে মনে হচ্ছে ঠিক একটি দ্বীপের মতো–অলংকৃতং দ্বীপবত্যা মালিন্যা রম্যতীরয়া–অথবা নদীটি আশ্রমের মালার মতো বলেই নামটি হয়তো মালিনী। মালিনীর পারে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির মাধুর্যে মুগ্ধ রাজা সিদ্ধান্ত নিলেন মহর্ষি কণ্বের সঙ্গে দেখা করেই যাবেন।
কালিদাসে যেমনটি আছে–রাজা ঋষিকুমারদের কাছে যখনই জানতে পারলেন–ওটি করে আশ্রম, অমনই বললেন–তাহলে মহর্ষির সঙ্গে দেখা করে একটু প্রণাম জানিয়ে যাই। ঋষিকুমারেরা বললেন–তিনি তো আশ্রমে নেই। তাঁর মেয়ে শকুন্তলাকে অতিথি-সৎকারের ভার দিয়ে তার দুর্ভাগ্য প্রশমন করার জন্য সোমতীর্থে গেছেন। রাজা বললেন–ঠিক আছে। তাহলে তার মেয়ের সঙ্গেই দেখা করে যাই। আমি যে এখানে এসেছিলাম, আমি যে তাকে প্রণাম জানিয়ে গিয়েছি, সেটা অন্তত তিনি বলে দেবেন মহর্ষিকে–সা খলু বিদিতভক্তিং মাং মহর্ষে কথায়িষ্যতি। রাজা আশ্রমের ভিতরে ঢুকলেন।
সেকালের দিনে এটা প্রায় নিয়মের মতো ছিল। ধরুন আপনি কোনও দেবস্থানে গেছেন, অথবা বেড়াতেই গেছেন এমন কোনও জায়গায়, যেখানে এক মহাপুরুষ আছেন অথবা এসেছেন। এমন জায়গায় গিয়ে স্থানীয় দেবতা বা প্রসিদ্ধ মহাপুরুষের দর্শন না করে শুধু বেড়িয়ে আসাটা সেকালের দিনের লোকের ধাতে ছিল না। তারা মনে করতেন–পূজনীয় ব্যক্তিকে সামান্য সম্মান না দেখিয়ে চলে এলে ধৃষ্টতা হয়, তাতে গৃহস্থের অকল্যাণ হবে। অতএব মন্দিরের দেবতা হোক, আর মহাপুরুষই হোক, প্রণাম করেই আসতেন তারা। বৃদ্ধদের মুখে আরও একটা কথা শুনেছি। বৃদ্ধ বলেছিলেন–এখনও চিঠির শেষে ‘প্রণামান্তে প্রণতঃ– এই সব শব্দ ব্যবহার করে কেন জানিস? বলেছিলাম-জানি না। বৃদ্ধ বলেছিলেন–সে যুগে এমন মিথ্যাচার করা যেত না। পাঁচ লাইন চিঠি লিখে, শেষে খশখ করে প্রণতঃকথাটা লিখে দিলাম, আর হয়ে গেল? পূজনীয় স্থানে পত্র প্রেরণ করার আগে পত্রদাতা পূজনীয় ব্যক্তির উদ্দেশে গড় করে প্রণাম করতেন মাটিতে। তারপর লিখতেন–প্রণামান্তে অথবা প্রণতঃ অমুক চন্দ্র অমুক।
কালিদাসের নাটকে দুষ্যন্তের উক্তি থেকে বুঝি–দুষ্যন্তও আশ্রমে ঢুকলেন কণ্বমুনিকে দর্শন করে প্রণাম করে যাবার জন্যই। এই পর্যন্ত কোনও সমস্যাই নেই, কারণ মহাভারতেও প্রায় একই রকম। কিন্তু তফাৎ আছে স্বভাবে। কালিদাসের দুষ্যন্ত যতখানি নায়ক-স্বভাবের, রাজোচিত ততটা নন। আর মহাভারতের দুষ্যন্ত বড় বেশি রকমের রাজগুণসমন্বিত বলেই মহাকবিকে তার চারধারের সমস্ত পরিবেশের মধ্যে গম্ভীর সমারোহের ব্যবস্থা করতে হয়। যাই হোক, রাজা স্থির করলেন-কথের আশ্রমে প্রবেশ করবেন-চারাভিপ্রবেশায় মতিং স নৃপতিস্তদা। কিন্তু রাজার প্রবেশ তো আর সোজা কথা নয়। হিংসাবৃত্তির পরিচায়ক অস্ত্রশস্ত্র ত্যাগ করে, সৈন্যসামন্তদের তপোবনের এলাকার বাইরে রেখে রাজা প্রবেশ করলেন তপোবনে। মহাভারতের দুষ্যন্তের এই বিনীত ব্যবহার কালিদাসেও আছে। কিন্তু কালিদাসে দু-তিনটি শ্লোকের রেখায় গাছের ডালে মুনি-ঋষিদের কাপড় শুকনোর ব্যবস্থা দেখে, ইদুদীর ফল-বাটা তৈল-চিকন পাথর দেখে, অপিচ পক্ষী আর হরিণ শিশুর মুখোদগীর্ণ নীবার ধান্যের মুষ্ঠিতে আশ্রম-পরিচয় করেই মহারাজ দুষ্যন্ত শকুন্তলার কাছাকাছি চলে যেতে পেরেছেন। কিন্তু মহাভারতের রাজা দুষ্যন্তকে তপোবনে ঢুকতে হয়েছে নিজের পুরোহিতকে সঙ্গে নিয়ে–পুরোহিতসহায় জগামাশ্রম। এই পুরোহিতকে অবশ্য এখনকার দিনের পুরুতঠাকুর ভাবার কোনও কারণ নেই। পুরোহিত মহাজ্ঞানী, মহাপণ্ডিত ব্যক্তি। সেকালের যে কোনও বড় রাজা তার রাজ্য-সংক্রান্ত এবং জীবন সংক্রান্ত সমস্ত গভীর আলোচনা করতেন পুরোহিতের সঙ্গে এবং সব ব্যাপারে তার নির্দেশের মূল্য ছিল প্রায় শেষ সিদ্ধান্তের মতো অনেক ক্ষেত্রেই তিনি রাজসভায় মন্ত্রী, কখনও বা প্রধানমন্ত্রীর কাজও করতেন। অবশ্য এখানে পুরোহিতের সঙ্গে রাজার অমাত্যও ছিলেন।
অমাত্য-পুরোহিতকে নিয়ে রাজা কথাশ্রমে প্রবেশ করলেন বটে, তবে সেখানে মহর্ষি কণের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়ের আগেই তার আশ্রমের পরিচয় পেলেন আরও গভীরভাবে। আশ্রমে ঋগবেদের মন্ত্রে দেবতার আহ্বান চলছে, সামগান করছেন সামবেদী ঋষিরা, যজুর্বেদী পুরোহিত আহুতি দিচ্ছেন আগুনে। মন্ত্রে-গানে সমস্ত আশ্রমের পরিবেশটা এমন স্বর্গীয় হয়ে উঠেছে যে, রাজার মনে হল যেন ব্রহ্মলোকে এসে উপস্থিত হয়েছেন–ব্রহ্মলোকস্থমাত্মানং মেনে স নৃপসত্তমঃ। রাজা কণ্বমুনির আশ্রম-কুটিরের প্রান্তদেশে এসে অমাত্য-পুরোহিত সবাইকে বাইরে রেখে আশ্রম কুটীরের সামনে এসে দাঁড়ালেন। :ভাবে বুঝি, অমাত্য পুরোহিতকে বসিয়ে রেখে গেলেন মন্ত্র-গানের যজ্ঞীয় আসরে।
দুষ্ট নায়ক ছিলেন বটে কালিদাসের দুষ্যন্ত। আশ্রমের উঠোনে তিন সখী শকুন্তলা, অনসূয়া, প্রিয়ংবদা যখন বৃক্ষতলায় জলসেচন করছিলেন, রাজা তখন নিজের পরিচয় না দিয়ে লুকিয়ে রইলেন লতাবিতানের অন্তরালে। তিন সখী নিজেদের মধ্যে নানারকম ঠাট্টা-ইয়ার্কি করছিলেন, রাজা প্রাণ ভরে সেসব কথা শুনছিলেন। এমন সব কথা, যা মেয়েরা নিজেদের মধ্যেই শুধু বলে। বৃক্ষের অন্তরাল থেকে সুন্দরী সখী-সমাজের একান্তে উচ্চারিত কথাগুলি শুনে দুষ্যন্তের নানা স্বগত মন্তব্যেও বোঝা যায় তিনি যতখানি নায়ক রাজা ততটা নন। এমনকি সখী-সমাজে নিজের আসল পরিচয়টি পর্যন্ত তিনি দেননি। শকুন্তলার সুঙ্গে পরিচয় হবার পর থেকে রাজাকে প্রথম প্রেমের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট মানুষটির মতো দেখতে পাচ্ছি। সারা প্রথম অংক জুড়ে রাজার সঙ্গে শকুন্তলার কোনও কথাই নেই প্রায়–প্রথম পুরুষের প্রথম সপ্রেম অভিধানে মাঝে মাঝে তাকে শৃঙ্গার-লজ্জায় লজ্জিত হতে দেখছি। কথা যা বলছেন, তা সখীরাই বলছেন। রাজার সঙ্গে।
