বনের পশু-পক্ষী, বাঘসিংহ শিকার করার জন্য মহারাজ দুষ্যন্তের এই বিরাট উদ্যোগ মশা মারতে কামান দাগার মতো শোনাতে পারে, কিন্তু সেকালের রাজনৈতিক এবং সমাজনৈতিক পটভূমির কথা টেনে আনলে একটা গেরেমভারি শব্দও এখানে ব্যবহার করা যায়। বলা যায়–সেকালের সামন্ততন্ত্রের রেওয়াজই এইরকম। রাজা মৃগয়ায় যাবেন, তার জন্য ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য-শূদ্র সমস্ত বর্ণের লোকেরা তাকে বিদায় অভিনন্দন জানাতে এসেছে নির্যামনুজগিরে। তারা আশীর্বাদ আর জয়শব্দ উচ্চারণ করে চলে গেলে, জনপদবাসীরা দুষ্যন্তকে অনুগমন করার জন্য প্রস্তুত হল। অন্যদিকে রাজধানীর সমস্ত গৃহের উপরিতলে ভিড় উপচে পড়ল পুরনারীদের–প্রাসাদবরশৃঙ্গস্থাঃ পরয়া নৃপ শোভয়া। দদৃশ্যস্তং স্ত্রিয়স্তত্র…।
মহারাজ দুষ্যন্তকে দেখে পুরনারীরা ভাবছিলেন যেন বজ্র হাতে স্বর্গের দেবরাজ নেমে এসেছেন ভঁয়ে। মহারাজের বীরত্বের কথা সপ্রেমে আলোচনা করতে করতে তারা প্রাসাদশৃঙ্গ থেকে ফুল ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন দুষ্যন্তের মাথায়–সজুস্তস্য মূর্ধনি। প্রশস্ত রাজপথের মধ্যে উপরিপ্রাসাদতলগতা রমণীদের সানুরাগ কথাবার্তা উদ্ধার করে মহাভারতের কবি দেখালেন– উত্তমা নাগরিকদের কাছেও দুষ্যন্ত কত কাম্য পুরুষ। সমস্ত জনপদবাসী দুষ্যন্তের পিছন পিছন অনেক দূর পর্যন্ত চলে এল। শেষে দুষ্যন্তই তাদের পাঠিয়ে দিলেন রাজধানীতে। বনের পথ আরম্ভ হয়ে গেছে।
বনের মধ্যে এবার মৃগয়ার প্রস্তুতি আরম্ভ হল। নির্জন বন দুষ্যন্তের হস্তি-অশ্ব-পদাতিকে আলোড়িত হয়ে উঠল। কোথায় সিংহ, কোথায় বাঘ, কোথায় বন্যশুকর–হাঁকে-ডাকে, হত্যায় নির্মনুষ্য বনভূমি যুদ্ধক্ষেত্রের চেহারা নিল। যারা ধনুক-বাণ চালায় তাদের লক্ষ্যভেদ করার ক্ষমতা, যারা গদা চালায় তাদের রিফ্লেক্স’, সব কিছুর পরীক্ষা হতে থাকল বন্য পশুদের ওপর। শব্দ-আঘাত-রক্তপাতে সমস্ত বনভূমি একেবারে ঘাঁটিয়ে তুললেন দুষ্যন্ত–লোড়য়ামাস দুষ্যন্তঃ সূদয় বিবিধা মৃগান্। এই বিশাল মৃগয়া-অভিযানে দুষ্যন্তের বাহিনীর বেশ কিছু লোক মারাও পড়ল। আবার অন্যদিকে এত পশুপাখি মারা পড়ায় বনবাসী কিরাত-শবরদের কিছু সুবিধেও হল। তারা আগুন তৈরি করে মৃত পশুপাখি পুড়িয়ে ভূরি-ভোজনের সুযোগ পেল। বলা বাহুল্য, এই বনের মৃগ-পশু শেষ হয়ে গেলে দুষ্যন্ত মৃগয়া-ব্যসনী হয়ে অন্য বনে প্রবেশ করলেন। মহাভারতের মৃগয়ার বর্ণনা সুচতুর কালিদাস ব্যঞ্জনার অঙ্গুলি সংকেতে সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন দ্বিতীয় অঙ্কে, বিদূষকের মুখে।
মহাভারতে দুষ্যন্ত বনান্তরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই একটা পরিবেশগত পার্থক্য আমাদের চোখে পড়ে। কালিদাসে ছুটন্ত ভয়ার্ত হরিণ এসে প্রবেশ করেছিল তপোবনে। ঋষিবালক হাত তুলে দুষ্যন্তকে বারণ করেছিলেন–এটি আশ্রমের মৃগ, একে হত্যা কোরো না–আশ্রম মৃগোয়ং ন হন্তব্যঃ, ন হন্তব্যঃ। রবিঠাকুরের কালিদাস-অনুবাদ-মৃদু এ মৃগদেহে মেরো না। শর, আগুন দেবে কে গো ফুলের পর। দুষ্যন্ত থামেন, রথ থেকে নামেন, অভিবাদন করেন ঋষিবালককে।
মহাভারতে যে বনে মৃগয়া হল, সেই বন থেকে এ বন একেবারেই আলাদা। যে বনে শেষ পর্যন্ত আশ্রমলোমভূতা’ শকুন্তলার দেখা পাওয়া যাবে, সেই বনের আবহ তৈরি হয়েছে নতুন সরসতায়। বনের পরিবেশে শীতল সমীরণের সঙ্গে বিহঙ্গের আলাপ যুক্ত হয়েছে। বিস্তীর্ণ তৃণভূমির মধ্যে বিশাল বিশাল বটের ছায়া, বিচিত্র বন্য লতা, ফুল আর কোকিলের শব্দ। সহৃদয় পাঠক! দুষ্যন্তের সঙ্গে আশ্রমবাসিনী শকুন্তলার দেখা হবে, এ তারই প্রস্তুতি। পাগল সমীরণে, ফুলের গন্ধে, পাখির ডাকে পাঠকের মনে প্রিয়মিলনের সঙ্গীত বাজতে থাকে। যাঁরা ভট্টিকাব্যের শরবর্ণনার শেষ শ্লোকটি শুনে মোহিত হন, তারা জানবেন ভট্টির কাব্যে মহাভারতের কবির শব্দস্পর্শ লেগেছে–দুষ্যন্ত এইমাত্র যেখানে এসে পৌঁছলেন, সেখানে এমন কোনও গাছই ছিল না, যে গাছে ফুল ফোটেনি,-নাপুষ্প পাদপঃ কশ্চিৎ। এমন কোনও ফুলও ছিল না, যেখানে অনুপস্থিত মধুকরের অব্যক্ত গুঞ্জন-বল্পদৈর্নাপ্যপাকীর্ণং ন তস্মিন্ কাননে’ভব।
কালিদাসে কণ্বমুনির আশ্রমে প্রবেশ করার সময় দুষ্যন্তের মুখে একখানিই শব্দ–শামিদ আশ্রমপদ। কিন্তু মহাকাব্যের কবির অনেক সমারোহ। তার আশ্রমপদ কালিদাসের মতো পূর্বপরিকল্পিত শুন্য নয়। কালিদাসের দুটি ঋষিবালক, সে দুজনও বুঝি দুষ্যন্তকে সুযোগ দেওয়ার জন্য সমিদাহরণ করতে চলে গেল, আর কণ্বমুনি তো আশ্রমেই নেই। দুষ্যন্তের কত সুবিধে। কালিদাসেরও বা কম কী? কিন্তু মহাভারতের দুষ্যন্ত নদীর তীর ঘেঁষা আশ্রমের মধ্যে কত ঋষি-মুনি দেখলেন, কত মৃগ-পক্ষী, কত ঋষিবালক সিদ্ধ-চারণ-গন্ধর্ব, কেউ বাদ নেই। সমবেত ঋষিমুনির ওঙ্কারধ্বনি শোনা যাচ্ছে। জায়গায় জায়গায় অগ্নিস্থাপনের বেদি পুষ্পস্তর দিয়ে সাজানো। কালিদাসের শান্ত আশ্রমপদের এক মজা, এখানে ওষ্কার-সামগানে মুখরিত আরেক পরিবেশ। এরই মধ্যে মহাভারতের কবি অতি সংক্ষেপে একটি কথা বলে দিলেন–সুখশীতল সমীরণ পুষ্পরেণু বহন করে আশ্রমের বৃক্ষচুড়ার মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছিল যেন রিরংসায় ভালবেসে ছুঁয়ে যাচ্ছিল আশ্রমবৃক্ষের পুষ্পগুলিকে।–পরিক্রামন বনে বৃক্ষানুপৈতীব রিরংসয়া। এর মধ্যে কোনও ইঙ্গিত আছে কি না জানি না, তবে দুষ্যন্তও ওই সুখশীতল বায়ুর মতোই ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন করে আশ্রমে; পৌরববংশের পুষ্পরেণুর কণা তিনি বহন করে এনেছিলেন, তবে তা নিষিক্ত করার জন্য কথাশ্রমের সেই যৌবনবিকশিত পুস্পটির দেখা তিনি এখনও পাননি। মহাকাব্যের সমারোহভারে এখনও তিনি দাঁড়িয়ে আছেন মালিনীর তীরে-মালিনীমভিতো রাজন্ নদীং পুণ্যাং সুখোদকাম।
