মহাভারতের কবি লিখেছেন-মহারাজ দুষ্যন্ত এই চতুরন্তা পৃথিবীর রাজা ছিলেন। পৃথিবী মানে যদি ভারতবর্ষও বুঝি, তাহলেও বলব দুষ্যন্ত সমস্ত ভারতবর্ষের রাজা ছিলেন না। আবার আধুনিক বুদ্ধিতে যদি আমরা মহারাজ দুষ্যতকে সম্পূর্ণ ভারতবর্ষের রাজত্ব নাও দিই, তবু কিন্তু মহাভারতের কবির আশয়টুকুও বুঝতে হবে। বুঝতে হবে, দুষ্যন্ত যথেষ্ট বড় রাজা। তিনি তার হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করেছেন, এ কথা খুব বড় নয়। তার সাম্রাজ্য গঙ্গা-যমুনার মধ্যদেশ ছাড়িয়ে উত্তর-পশ্চিমে আরও দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। মহাভারত বলেছে–ম্লেচ্ছ রাজ্য পর্যন্ত ছিল দুষ্যন্তের রাজ্যের সীমা এবং সীমাটা উত্তর পশ্চিমেই মনে হয়–আম্লেচ্ছাবধিকা সর্বান স ভূক্তে রিপুমর্দনঃ–কারণ, দুষ্যত্তের সময়ের আগে থেকেই ভারতের উত্তরে এবং উত্তর-পশ্চিমে ম্লেচ্ছ বা আর্যেতর জনজাতির বসতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে ভারতবর্ষের দক্ষিণে দুষ্যত্তের রাজ্য বিস্তারের কোনও প্রমাণ আমরা পাই না এবং ঐতিহাসিকদের মতে, দুষ্যত্তের সময়েও যেসব রাজ্যের স্বাধীন অবস্থিতির পরিচয় পাওয়া যায়, সেগুলি হল বিদেহ (মিথিলার উপকণ্ঠে), বৈশালী (সাতনা-রেওয়া), কাশী, বিদর্ভ বেরার)। বিদর্ভে কিন্তু তখনও হৈহয়দের অথবা যাদবদের রাজত্বই চলছে।
আশ্চর্যের বিষয় হল, দুষ্যন্তের প্রসঙ্গে আমরা প্রতিষ্ঠানপুরের নামটি আর শুনতে পাচ্ছি না। হয়তো দুষ্যন্ত পূর্বপুরুষের রাজধানী ছেড়ে সরে এসেছিলেন উত্তরের দিকে। মহাভারতে শকুন্তলার পতিগৃহযাত্রার সময়ে তার স্বামীর রাজধানীকে হস্তিনাপুর বলা হয়েছে–শকুন্তলাং পুরস্কৃত্য সপুত্ৰাং গজসায়। শ্লোকোক্ত ‘গজসায়’ হস্তিনাপুরের অন্য নাম। কিন্তু মজা হল, হস্তিনাপুর তখন কোথায়? দুষ্যতের পাঁচ পুরুষ পরে তারই বংশজ রাজা হস্তীর নামে হস্তিনাপুরের প্রতিষ্ঠা হবে। কাজেই আর যেখানেই হোক দুষ্যন্ত হস্তিনাপুরে রাজত্ব করতেন না। তবে প্রতিষ্ঠানপুর ছেড়ে এসে তিনি হস্তিনাপুরের কোনও অঞ্চলে বসবাস করেই থাকতে পারেন এবং সেটা কোনও অস্বাভাবিক ব্যাপারও নয়। তবে কোনও অবস্থাতেই তখনও সে রাজধানীর নাম হস্তিনাপুর ছিল না।
ইতিহাসের তথ্যানুমান ছেড়ে এবার আমরা একটু মহাকাব্যে আসি। মহাকাব্যে আসতেই হবে কারণ, মহাভারতের দুষ্যন্ত-শকুন্তলার কাহিনী অবলম্বন করেই গুপ্তযুগের কালিদাস তার অবিস্মরণীয় নাটকখানি রচনা করেছেন। শুধু কালিদাস লিখেছিলেন বলেই নয়, দুষ্যন্ত-শকুন্তলার কাহিনী মহাভারতের পূর্বযুগেই ইতিহাসের গণ্ডি ছেড়ে মহাকব্যের সরসতায় ধরা পড়েছিল; অথবা বলা যেতে পারে দুষ্যন্ত-শকুন্তলার প্রেম-কাহিনী ইতিহাস হয়ে গিয়েছিল বলেই সেই ইতিহাস থেকে মহাকাব্যের সৃষ্টি হয়েছে। একটা স্বীকার করতেই হবে যে, কালিদাস তার নাটকের উপকরণ সংগ্রহ করেছিলেন প্রধানত মহাভারত থেকেই। কিন্তু নাটক লিখবার সময় কালিদাসের একান্ত আপন কবি-হৃদয়ের কাব্যময়তা এমনভাবেই কাজ করেছে যে, মহাভারতের কাহিনী সেখানে রূপান্তরিত হয়েছে চুড়ান্ত কাব্যিক মহিমায়। রবীন্দ্রনাথের শ্যামা, বিদায় অভিশাপ-এর কচ-দেবযানী অথবা কর্ণ-কুন্তীর রাবীন্দ্রিক চরিত্রায়ণের মধ্যে যে শিল্পীজনোচিত বেদনাবোধ পরিস্ফুট হয়েছে, কালিদাসের শকুন্তলা-দুষ্যন্তের কাহিনী সেইরকম মহাভারতের কাব্যশরীর অতিক্রম করে নতুন এক দুষ্যন্ত অথবা নতুন এক শকুন্তলার জন্ম দিয়েছে।
কালিদাসের নাটকে আরম্ভেই নাটক–একটি হরিণ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে, আর তার পিছন-পিছন ছুটছেন মৃগয়াবিহারী দুষ্যন্ত। হাতে ধনুকবাণ, একা। পাত্রমিত্রের পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। মহাকাব্যের বিশাল পটভূমি থেকে শুধু মৃগয়ার ইঙ্গিতটুকু ব্যবহার করে কালিদাস তার নায়ক দুষ্যত্তকে হরিণের পিছন পিছন ছোটাতে ছোটাতে একা এনে ফেলেছেন কণ্বমুনির আশ্রমে, কারণ রাজাকে প্রথম থেকেই একাকিত্বের প্রশ্রয় দিলে আশ্রমবাসিনী শকুন্তলার সঙ্গে তাকে মিলিয়ে দিতে সুবিধে হয়।
কিন্তু মহাভারতের কবির বিশেষণ যে ‘বিশালবুদ্ধি’-ব্যাসস্য বিশালবুদ্ধেঃ, যিনি নানারকম সামাজিক, রাজনৈতিক ধারার পরিণতি ঘটিয়ে কুরুক্ষেত্রের বিরাট যুদ্ধ সংঘটিত করবেন, তিনি তো আর দু-পাঁচটি শ্লোকে দুষ্যন্তের রথচক্রের বর্ণনা দিয়ে তাকে তপোবনে এনে ফেলতে পারেন না। তাঁর ভঙ্গিটা সব সময়ই এক বিশাল একান্নবর্তী পরিবারের ঠাকুরদাদার মতো। শূন্যতা, নির্জনতা, দুহু-দোঁহার অপাঙ্গ-ইঙ্গিত–এসব ক্ষুদ্র উদ্দীপন মহাকাব্যের কবিকে মানায় না। বনপথে দুষ্যন্ত কণ্বমুনির আশ্রমে এসে পৌঁছবেন এর জন্য তাকে পরিবেশ প্রস্তুত করতে হয়েছে প্রায় দুই অধ্যায় ধরে। মহাভারতের দুষ্যন্ত, পৌরব বংশের বংশকর’ রাজা। তিনি হাজারো সৈন্যবাহিনী নিয়ে মৃগয়ায় বেরোবেন, সে তো দুটি-চারটি শ্লোকে হয় না। রাজা। মৃগয়ায় যাবেন, তার একটা উদ্যোগপর্ব আছে রীতিমতো। সেই মৃগয়ায় হাতি-ঘোড়া পদাতিকের সমন্বিত পদশব্দের সঙ্গে রথচক্রের ঘর্ঘর, অস্ত্র-শস্ত্রের বিপুল ঝনঝনানির সঙ্গে রথী পুরুষের শঙ্খনাদ-সিংহনাদৈশ্চ যোধানাং শস্যদুন্দুভিনিঃস্বনৈ, হাতি-ঘোড়ার বৃংহণ-হ্রেষিত শব্দের সঙ্গে মজা দেখতে আসা সমবেত জনতার চিৎকার-সব কিছু মিলিয়ে রাজবাড়ির পথ এবং প্রাঙ্গণ একেবারে মুখরিত হয়ে উঠল।
