বায়ুপুরাণ এবং হরিবংশ তুর্ববংশের পরিচয় দেবার সময় বলেছে–তুবসুর পুত্র হলেন বহ্নি, বহ্নির পুত্র গোভানু। গোভানুর পুত্রের নাম জিসানু, ত্রিসানুর পুত্র করন্ধম এবং তাঁর পুত্র মরুত্ত–মাঝখানে অবীক্ষিত নেই–করন্ধমস্ত্রিযানোস্তু মরুত্তস্তস্য চাত্মজঃ। মরুত্তর নামটি বলার সঙ্গে সঙ্গেই বায়ুপুরাণ এবং হরিবংশ বলে উঠেছে–আমরা আরও একজন মরুত্তের কথা শুনেছি, তিনি অবীক্ষিতের পুত্র মরুত্ত–অন্যস্তু আবীক্ষিতো রাজা মরুঃ কথিতঃ পুরা। সেই মরুত্তের কোনও পুত্র সন্তান ছিল না–অনপত্যো মরুক্তস্তু। পুরাণকারেরা এক কথা বলেছেন আর অমনি পারজিটার সাহেবও সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছেন–They must be carefully distinguished.
আমাদের নিবেদন–এখানে মার্কণ্ডেয় পুরাণের বিবরণ মাথায় রেখে বুঝে নিতে হবে অবীক্ষিত এক সময় নিজের অভিমানে পিতার রাজ্য গ্রহণে অস্বীকৃত হয়েছিলেন–নাহংতাত করিষ্যামি পৃথিব্যাঃ পরিপালন। এই রাজ্যগ্রহণের অস্বীকৃতিই পরবর্তীকালে পৌরাণিকদের কীর্তিত তুর্কসু রাজবংশের পরম্পরায় অবীক্ষিতের নাম মুছে দিয়েছে। অবীক্ষিতের পুত্র মরুত্তকে করন্ধম সোজাসুজি রাজ্য দিয়েছিলেন–স পিত্রা সমনুজ্ঞাতং রাজ্য প্রাপ্য পিতামহাৎ। এই কারণেই তুর্ব রাজবংশের তালিকায় অবীক্ষিতের নাম ওঠেনি এবং পৌরাণিকেরা মরুত্তের নাম শুনলেই বলে ওঠেন আমরা অবীক্ষিতের ছেলে বলে আরও একজন মরু রাজার নাম শুনেছি–অন্যস্তু আবীক্ষিতে রাজা মরুও কথিতম্ভব। আসলে এই মরুই সেই মরুত্ত। এদের আলাদা করে ‘carefully’ দেখার কোনও কারণ নেই।
অবশ্য মার্কণ্ডেয়র অন্য বিবরণ মিথ্যে করে দিয়ে এ কথা আমাদের স্বীকার করে নিতেই হবে যে মরুত্তের কোনও পুত্রসন্তান ছিল না। প্রধান পুরাণগুলির এই তথ্য অবিসংবাদিত অনপত্যো’ভব রাজা যক্ষ্মা বিপুলদক্ষিণঃ-রুত্ত রাজা ভূরি দক্ষিশাযুক্ত বহু বহু যজ্ঞ করেছেন, কিন্তু তিনি অপুত্রক ছিলেন। এইবারে আবার রাজনৈতিক চিত্রে ফিরে আসি। তুর্ববংশীয় করম, অবীক্ষিত এবং মরুত্তের চেষ্টায় যাদব-হৈহয় রাজবংশের পূর্বোক্তরী গতি খানিকটা থেমে ছিল বটে কিন্তু যযাতির মূল রাজ্য প্রতিষ্ঠানপুর–যেখানে যযাতির কনিষ্ঠ পুত্র পুরুর বংশপরম্পরা চলছিল, সেখানে কখনও হৈহয়রা কখনও বা অযোধ্যার ইন্ড্রাকুবংশীয় রাজারা ধুন্ধুমার কাণ্ড চালিয়ে পৌরব রাজবংশকে প্রায় মুছে দিয়েছিলেন। রাজবংশের অর্ধেক রাজার নাম পৌরাণিকদের বংশতালিকায় লুপ্ত। এমনকি পৌরব দুষ্যন্তের ঔরস পিতার নামও আমরা ভাল করে জানি না। জানি না মায়ের নামও। এরই মধ্যে হঠাৎই পুরাণে শুনতে পাই পুরুবংশীয় দুষ্যন্তকেই বৈশালীর পুরবাসীরা মরুত্তের পুত্ররূপে স্বীকার করে নেন–দুষ্যন্তং পৌরবং চাপি সর্বে পুত্রমকল্পয়৷ (বায়ুপুরাণের পাঠে দুষ্যন্তের নাম ভুল করে ‘দুষ্কৃতং পৌরবঞ্চাপি’ করা হয়েছে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে–তুৰ্ববংশীয় মরুত্ত দুষ্যন্তকে পেলে-পুষে বড় করেন।
আমরা আগে মরুত্ত রাজার যজ্ঞে বৃহস্পতির ভাই সংবর্তকে পৌরোহিত্য করতে দেখেছি। হরিবংশ বলেছে–মরুত্ত রাজা সংবর্তের পৌরোহিত্য কর্মে এতটাই সুখী হয়েছিলেন যে, অপুত্রক রাজা তার কন্যা সম্মতাকে সংবর্তের হাতেই তুলে দেন। হরিবংশের ভাষাটা এইরকম–দক্ষিণা হিসেবে নিজের মেয়ে সম্মতাকে সংবর্তের হাতে তুলে দিয়ে মরুত্ত রাজা পৌরব দুষ্যন্তকে পুত্র হিসেবে পেলেন–
দক্ষিণার্থং স্ম বৈ দত্ত্বা সংবর্তায় মহাত্মনে।
দুষ্যন্ত পৌরবং চাপি লেভে পুত্রমকল্মষ৷
মহাভারতে আদিপর্বের দ্বিতীয় বংশলতিকায় কোনও এক ইলিন’র নাম করা হয়েছে, যাকে দুষ্যন্তের পিতা বলা হয়েছে। কিন্তু এই ইলিন স্ত্রী না পুরুষ, দুষ্যন্ত তার ছেলে না নাতি সে সব নিয়ে প্রচুর বিবাদ আছে। তার ওপরে মহাভারতের ওই বংশলতিকা অন্যান্য পুরাণে পাওয়া। যায় না। কাজেই বেশির ভাগ পুরাণে মরুন্তু রাজার ঘরে দুষ্যন্তকে বাড়তে দেখে আমরা ধারণা করি–হৈহয়-যাদবরা যখন মধ্যদেশের প্রায় সবটাই দখল করে নিজেদের করায়ত্ত করেছিলেন, সেই সময় কোনও একজন পুরুবংশীয় ব্যক্তির ঔরসে দুষ্যন্ত জন্মেছিলেন। পুরোহিত সংবর্ত মরুত্তের কন্যা সম্মতাকে দানে পেয়েছিলেন বটে, তবে তাঁরই গর্ভে দুষ্যন্ত সংবর্তের ঔরসে জন্মেছিলেন কি না, তা খুব স্পষ্ট নয়। তবে আমাদের ধারণা, প্রতিষ্ঠানপুর থেকে ছিন্নমূল কোনও পুরুবংশীয় ব্যক্তির সঙ্গে সম্মতার বিয়ে দিয়ে দেন সংবর্ত এবং রাজা মরুন্তু তা জানতেন। এই বিবাহের ফলেই হয়তো দুষ্যভের জম্ম, কিন্তু জন্মলগ্নেই তিনি পৌরব বা পুরবংশীয় বলে চিহ্নিত। মরুত্ত নির্বিচারে দুষ্যতকে নিজের বাড়িতে স্থান দেন এবং দুষ্যতের প্রতি তার স্নেহ-ভালবাসা এতটাই ছিল যে তুর বংশ মরুরে পরে স্তব্ধ হয়ে যায় এবং তা মিশে যায় সুপ্রসিদ্ধ পুরুবংশে–পৌরবং তুর্বাসোর্বংশঃ পবিবেশ নৃপোত্তম। যদুবংশীয় যাদব হৈহয়দের নাশকতায় পুরুবংশের মূল স্তম্ভটাই যখন নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল তখন যযাতিপুত্রের অন্য এক ধারায় পুরুবংশের শিবরাত্রির সলতে দুষ্যন্ত মানুষ হতে লাগলেন। পুরুবংশের কীয়মাণ ধারা পৌরব দুষ্যতের মাধ্যমেই রক্ষিত হয়েছে মহাভারতে তাকে পৌরবদের বংশকর’ বলে অভিহিত করা হয়েছে–পৌরবাণাং বংশকরা দুষ্যন্তো নাম বীর্যবান্।
