পুরুবংশীয় পৌরবদের বিপদ শুধু শশবিন্দুর কারণেই হয়নি। তাদের আরেক বিপদ হলেন সূর্য বা ইস্ফাকু-বংশের মান্ধাতা, যিনি রামচন্দ্রের পূর্বপুরুষ। রাজা হিসেবে তিনিও ছিলেন বিরাট মাপের। মান্ধাতার বাবা দ্বিতীয় যুবনাশ্বের সময় থেকেই ইক্ষাকুবংশীয়দের রাজ্যবিস্তার শুরু হয়। এবং পূর্ণতা লাভ করে মান্ধাতার সময়ে। লক্ষণীয় বিষয় হল, শশবিন্দুর পক্ষে সরফুপারের সেই দেশটি অর্থাৎ অযোধ্যা জয় করা সম্ভব হয়নি এবং দুজনের স্ব-স্ব বংশের বিরাট পুরুষ বলে শত্রুতা বন্ধুত্বের পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ইস্ফাকু বংশের মান্ধাতা বিয়ে করেছিলেন শশবিন্দুর মেয়ে যাদবসুন্দরী বিন্দুমতাঁকে। বিন্দুমতীর আরেক নাম চিত্ররথী–তস্য চৈত্ররথী ভার্যা শশবিলোঃ সুতাভবৎ।
মান্ধাতার পর ইক্বাকুবংশের তেজ কিছুটা কমে বটে, তবে সব দিক থেকেই ধুন্ধুমার লাগিয়ে দিয়েছিলেন যাদবরা। একদিকে শশবিন্দু এবং তার ছেলেদের দুর্দান্ত অভিযান যেমন ভারতবর্ষের মধ্যদেশ থেকে পৌরবদের অবলুপ্তি ঘটিয়েছিল, তেমনি শশবিন্দুর পরেও সাম্রাজ্যজয়ের ধারাটি চালিয়ে যান যাদবদেরই জাত ভাই হৈহয় বংশের কার্তবীর্যাজুন। ভারতবর্ষের দক্ষিণে অবন্তী, মাহিষ্মতী, বিদর্ভ অঞ্চলে যাদব-হৈহয়রা একচ্ছত্র আধিপত্য স্থাপন করার পর তারা ভারতবর্ষের উত্তরপানে ধাওয়া করেছিলেন। যুবনাশ্ব-মান্ধাতার আমলে অযোধ্যার রাজবংশের যে মর্যাদা স্থাপিত হয়েছিল, সেই মর্যাদা ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল হৈহয়-যাদবদের আক্রমণে। অযোধ্যায় তখন রাজা ছিলেন বাহু। তিনি ইস্ফাকুবংশীয় দানবীর মহারাজ হরিশ্চন্দ্রের বেশ কয়েক পুরুষ পরের মানুষ। হৈহয়রা অন্যান্য যদুবংশীয়দের সঙ্গে নিয়ে অযোধ্যার রাজা বাহুকে রাজ্যছাড়া করে ছেড়েছিলেন–হৈহয়ৈস্তালজঘৈশ্চ নিরস্তো ব্যসনী নৃপঃ।
লক্ষণীয় বিষয় হল, যাদব-হৈহয়দের এই সাম্রাজ্যবাদী অভিযান অযোধ্যার পার্শ্ববর্তী বৈশালী এবং বিদেহরাজ্যের কাছে এসে থেমে যায়। আগেই বলেছি–বৈশালীতে, আধুনিক মধ্যপ্রদেশের সাতনা-রেওয়া অঞ্চলে তখন রাজত্ব করতেন তুর্ক বংশের রাজারা। শোনা যায়, তুৰ্ববংশের করন্ধম রাজা যখন বৈশালীতে রাজত্ব করছেন তখন তিনি বিপক্ষীয় রাজাদের দ্বারা ভীষণভাবে আক্রান্ত হন। শেষ পর্যন্ত তিনি যুদ্ধে জয়ী হন এবং তার পুত্রও তাকে সর্বতোভাবে রক্ষা করতে থাকেন। এই পুত্রের নাম অবীক্ষিত। মার্কণ্ডেয় পুরাণ লিখেছে বিদিশার রাজার মেয়ের স্বয়ংবর সংক্রান্ত ঘটনা নিয়ে সমবেত রাজমণ্ডলী এবং অবীক্ষিতের মধ্যে প্রচণ্ড লড়াই বাধে। এই যুদ্ধে অবীক্ষিত শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করে পরাজিত হন এবং বিদিশার রাজবাড়িতে বন্দি হিসেবে তাকে ঢুকতে হয়। অবীক্ষিতের পিতা করন্ধম বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে পুত্রের মুক্তির জন্য বিদিশা আক্রমণ করেন এবং পুত্রকে মুক্ত করে নিয়ে যান।
পণ্ডিতেরা মনে করেন, এই সময় বিদিশা (বেশনগর) হৈহয় রাজাদের রাজ্যভুক্ত ছিল–There can be little doubt that those enemies were the Haihayas, for Vidisa was in the Haihaya region, and that they were beaten off. তুর্বসুবংশীয় করহ্মম রীতিমতো বুড়ো হয়ে গেলেও তার পুত্র অবীক্ষিত পিতৃরাজ্য গ্রহণ করেননি। সেই যে একবার সমস্ত রাজা তাকে পরাস্ত করে বিদিশার রাজপথে বন্দি হিসেবে হাটিয়েছিল, সেই অপমান তিনি ভুলতে পারেননি। বিদিশার রাজকুমারী কিন্তু মনে মনে রাজমণ্ডল-মধ্যবর্তী সেই একক রাজবন্দিকেই আপন প্রাণেশ্বর হিসেবে অন্তরে স্থান দিয়েছিলেন। অবীক্ষিত বলেছিলেন- আমি যখন রাজকুমারীর সামনে অন্য রাজাদের দ্বারা পরাভূত হয়েছি, তখন সেই রাজকুমারীকে আমি আমার মুখ দেখাতে পারি না-সোহমস্যাঃ পুরো ভূমৌ পরৈর্ভূপৈঃ খিলীকৃতঃ। কথা শুনে রাজকুমারী পিতাকে বলেছিলেন–না, বাবা। আমি শুধু তার রূপ দেখে তাকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তুত হইনি। এত রাজার সঙ্গে একা যুদ্ধ করে তিনি যে অসাধারণ বিক্রম প্রকাশ করেছিলেন, সেই বিক্রমই আমার মন হরণ করেছে পিতা–শৌর্য বিক্রম-ধৈর্যানি হরস্ত্যস্য মনো মম।
অবীক্ষিতের সঙ্গে এই বিয়ে তখন-তখনই হয়নি। কিন্তু বিদিশার রাজকুমারীর অনুরাগ এবং অবীক্ষিতের পিতা করন্ধমের আগ্রহে এই বিয়ে শেষ পর্যন্ত ঘটেছিল, কিন্তু সেই পুরাতন যুদ্ধস্মৃতি এবং পরাজয়ের অভিমান হৃদয়ের বহনকরে অবীক্ষিত রাজ্যগ্রহণে অস্বীকৃত হন। বৃদ্ধ করম তথন পুত্রের বদলে নাতিকে রাজ্য দিয়ে বানপ্রস্থ অবলম্বন করেন। করন্ধমের এই নিতিই হলেন মরুত্ত-আবীক্ষিত মরুত্ত। পরবর্তী অধ্যায়ে মার্কণ্ডেয় পুরাণে যে বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ হয়েছে, তাতে পণ্ডিতদের মধ্যে সন্দেহ এসেছে। বস্তুত বেশিরভাগ পুরাণের সংক্ষিপ্ত বৃত্তান্ত ভাল করে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে–আবীক্ষিত মরুত্তের কোনও পুত্রসন্তান ছিল না। কিন্তু মার্কণ্ডেয় পুরাণের পৌরাণিক মরুত্তের একটি পুত্রসন্তানের ব্যবস্থা করেছেন, ফলত পণ্ডিতেরা বৈশালীর করন্ধম-অবীক্ষিত-মরুত্তকে তুর্বসু-বংশের করন্ধম-অবীক্ষিত-মরুত্ত থেকে আলাদা করে দিয়েছেন। যদিও এই সন্দেহের কারণ সৃষ্টি করেছেন স্বয়ং পৌরাণিকেরাই। অবশ্য, এই অকারণ ভয় বা সন্দেহের কোনও ঘটনাই ঘটা উচিত নয়। কারণ তুর্বসু বংশ বৈশালীতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং প্রায় সমস্ত প্রাচীন পুরাণেই দেখা যাবে আবীক্ষিত মরুত্তের কোনও পুত্রসন্তান ছিল না।
