.
৪২.
দুষ্যন্ত তখনও মহারাজ দুষ্যন্ত হননি। হয়তো বৈশালী অথবা এখনকার সাতনা-রেওয়া অঞ্চলের রাজচক্রবর্তী মরুত্তের ঘরে মানুষ হচ্ছেন তিনি। সেই কবে যদু-তুর্বসুরা প্রতিষ্ঠানপুরে পুরুর রাজ্য ছেড়ে চলে গেছেন। আর আজ কত পুরুষ পরে পুরু রাজবংশ যখন প্রতিষ্ঠানপুর থেকে উচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, অযোধ্যার রাজা, আর যাদব-হৈহয়দের পর্যায়ক্রমিক আক্রমণে গঙ্গা-যমুনার এপার-ওপার এবং মধ্যদেশও যখন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত, ঠিক তখনই কোন পূর্বপুরুষের রক্তের টানে তুর্ববংশীয় পুত্রহীন মরুত্ত রাজা পুরুবংশীয় দুষ্যন্তকে নিজের কোলে টেনে নিলেন, তা বলা সহজ নয়। বংশজ’এক জ্ঞাতির আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য আরেক। আতিকে আশ্রয় দিলেন মরুত্ত। ঐতিহাসিকদের মতে দুষ্যন্ত যখন খুবই ছোট, তখন প্রতিষ্ঠানপুরে যাদব-হৈহয়দের অবস্থা খারাপ হয়ে এসেছে। কিন্তু তার আগে যদুবংশের যাদব-হৈহয়রা সমস্ত মধ্যদেশ দাপিয়ে বেড়িয়েছিলেন। তার ফলে মূল পুরুবংশটাই উচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
যদুবংশে, অথবা আরও পরিষ্কার করে বললে বলতে হয় হৈহয় বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা কার্তবীর্যাজুনের ছেলের নাম ছিল জয়ধ্বজ। তিনি রাজত্ব করতেন অবন্তীতে। নর্মদা নদী থেকে তাপ্তী নদী পর্যন্ত এই জায়গার ভৌগোলিক বিস্তার। হৈহয়বংশীয় কার্তবীর্য অর্জুন কৰ্কেটক নাগদের যুদ্ধে হারিয়ে প্রথমে মাহিষ্মতী দখল করেছিলেন। মাহিষ্মতীতে যে হৈহয়দের প্রচণ্ড প্রতাপ ছিল, সে কথা এই অঞ্চলের শিলালিপিগুলি থেকেও প্রমাণিত হবে। একটি শিলালিপিতে জনৈক হৈহয় রাজাকে ‘মাহিষ্মতীপুরবরেশ্বর’ বলে ডাকাও হয়েছে। বৌদ্ধ গ্রন্থে মাহিষ্মতী অবন্তীর রাজধানী। যদিও পরে নর্মদার দুই পার ধরে উত্তরে প্রায় রাজপুতনা পর্যন্ত এবং দক্ষিণে তাপ্তী পর্যন্ত অবস্তী রাজ্যের সীমানা ছড়িয়ে যাওয়ায় দক্ষিণ অবন্তীতেই মাহিষ্মতীর ভৌগোলিক অবস্থান চিহ্নিত করা যায়।
কার্তবীর্য অর্জুনের নাতি এবং জয়ধ্বজের ছেলের নাম হল তালজ। এই তালজ এতটাই শক্তিমান ছিলেন যে তার পাঁচটি পুত্রও তারই নামে বিখ্যাত ছিলেন। তাদের সবাইকে একসঙ্গে তালজ বলেই ডাকা হত। তালজঘের পাঁচ ছেলে। তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ হলেন রাজা বীতিহোত্র, যাঁকে বীতহব্যও বলেন অনেকে। মহাভারতের অনুশাসন পর্ব খুললে এক জায়গায় দেখবেন হৈহয় বীতিহোত্র কাশীর রাজা দিবোদাসের পিতামহ হ্যশ্বকে মেরে বংশ বংশ ধরে রাজ্য-ছাড়া করে রেখেছেন। তবে তাদের যুদ্ধটা যে শুধু কাশীতে গিয়েই হচ্ছে, তা মোটেই নয়। বীতিহোত্র এবং তার ছেলেপিলে আত্মীয়স্বজনেরা গঙ্গা-যমুনার অন্তর্বর্তী অঞ্চলে ধুন্ধুমার কাও লাগিয়ে দিয়েছিলেন–গঙ্গা যমুনয়ো মধ্যে সংগ্রামে বিনিপাতিতঃ। শেষ পর্যন্ত হর্যশ্বের নাতি হৈহয় তালজঘদের আক্রমণ থেকে বাঁচবার জন্য কাশী-নগরীর পত্তন করলেন।
বীতিহোত্রের ছেলেরা অবশ্য কাশীতে গিয়েও সংগ্রাম চালিয়েছিলেন, কিন্তু কথাটা এখানে নয়। গঙ্গা-যমুনার মধ্যবর্তী অঞ্চলে যাদব-হৈহয়রা যে আক্রমণ চালিয়েছিলেন, তাতে পণ্ডিতেরা অনুমান করেন প্রতিষ্ঠানপুরে আর পুরুবংশের চিহ্ন কিছু ছিল না। মহাভারতে পুরুর পরে দুষ্যন্ত পর্যন্ত পুরুবংশের একটা রাজতালিকা সাজানো আছে বটে, তবে সে সব রাজা নিতান্তই এলেবেলে। বিশেষত বিভিন্ন রাজবংশ এবং সেইসব রাজার সম্বন্ধে যথাসম্ভব তথ্য পরিবেশনের জন্য যেসব পুরাণ বিখ্যাত, সেই পুরাণগুলির সঙ্গে মহাভারতের বংশতালিকা মেলে না এবং বহু জায়গায় বংশের ছেদ পড়ে গেছে। এতসব দেখে পণ্ডিতেরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, পুরুবংশ কোনওমতে টিকে ছিল। কীর্তিহীন, অবলম্বনহীন, বীরের সদগতি থেকে সম্পূর্ণ ভ্রষ্ট। হয়তো এইরকমই একু উচ্ছিন্ন পৌরুব-পুরুষের ছেলের নাম দুষ্যন্ত–যিনি মরুত্ত রাজার ঘরে মানুষ হচ্ছিলেন।
মরুত্ত রাজার ঘরে দুষ্যন্ত তখনও মানুষ হতে আসেননি, হয়তো বা তিনি তখনও জন্মানওনি; সেই সময়ে একটা বিরাট সুবিধে হয়ে গিয়েছিল। কাশীর রাজা হর্যশ্ব থেকে আরম্ভ করে দিবোদাস পর্যন্ত সকলেই যাদব-হৈয়েদের হাতে খুব মার খেয়েছিলেন বটে, কিন্তু দিবোদাসের ছেলে প্রতর্দন হৈয়েদের উচিত শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং হৈহয় বীতিহোত্র শেষ পর্যন্ত নিজের কুল-শীল জাতি ত্যাগ করে ব্রাহ্মণ হয়ে যাবার চেষ্টা করেন এবং ব্রাহ্মণের বৃত্তি গ্রহণ করে নিজেকে কোনওমতে টিকিয়ে রাখেন।
হৈহয়দের আরও ক্ষতি হয়ে গেল অযোধ্যায় ইক্ষাকু বংশের নবতর এক সমৃদ্ধির ফলে। হৈহয়রা অযোধ্যা দখল করেছিলেন অনেক আগে। অযোধ্যার রাজা বাহুকে তাড়িত হয়ে বনে ঘুরে বেড়াতে হয়েছিল। সেখানেই এক বনে তিনি তার পত্নীদের নিয়ে তপস্যা করে দিন কাটাচ্ছিলেন–বনং প্রবিশ্য ধর্মাত্মা সহ পত্না পোচরৎ। হৈহয়রা বাহুর রাজ্য কেড়ে নিয়েই শুধু ক্ষান্ত হননি। রাজ্য জয় করে তারা অযোধ্যায় আর্যেতর জনজাতি শক, যবন, পহুবদের। বসিয়ে দিয়েছিলেন। তারা অযোধ্যায় এসে ভারতবর্ষীয় ক্ষত্রিয়দের মতোই দিন কাটাচ্ছিলেন– শাদীনাং ক্ষত্রিয়াণা। অরণ্যাশ্রিত বাহু বনে থাকতে থাকতেই বুড়ো হয়ে গেলেন। এর মধ্যে একদিন নদী থেকে সন্ধ্যা-আহ্নিকের জন্য জল আনতে গিয়ে তিনি মরেই গেলেন। তার স্ত্রী-লক্ষণীয় বিষয় হল, তিনি যাদবী অর্থাৎ যাদবদের মেয়ে।
